শতবর্ষ আগে কে তুমি লিখলে বসি বাঙালির জাগরণমন্ত্র-বল বীর, বল উন্নত মম শির

Home ফিচার শতবর্ষ আগে কে তুমি লিখলে বসি বাঙালির জাগরণমন্ত্র-বল বীর, বল উন্নত মম শির

তিয়াষা গুপ্ত: কলকাতার তালতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটি এখন ইতিহাস। যাঁর সৌজন্যে আজও এই বাড়ি কৌতূহলের কারণ তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। ১৯২১ সালের কোনও এক ডিসেম্বরে এই দ্বিতল বাড়িতে বসে কবি লিখলেন বল বীর বল উন্নত মম শির….। আজ এই নিয়ে এত আলোচনার রব কেন?

শতবর্ষ পরে এই কবিতার প্রাসঙ্গিকতা কতখানি, এই বিতর্কে নাই বা গেল বাঙালি। এর প্রকাশ কাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নজরুল গবেষকদের লেখা থেকে যতদূর জানা যায় তা হল, বর্ষশেষে এই কবিতা নজরুলের কলম থেকে বেরালেও মুদ্রণ হয় ১৯২২ সালের জানুয়ারি থেকে অগাস্টের মাঝামাঝি সময়কালে। তাই এই নিয়ে আলোচনার অবকাশ আছে। সেইসঙ্গে আরও একটা কথা বলা প্রয়োজন, বাঙালির জীবনে যদি সত্যিই ঝড় তুলে থাকে কোনও কবিতা এবং স্বদেশ চেতনার সর্বব্যাপী বিপুল স্পন্দনে আজও যদি ঝংকৃত হয় আমাদের শিরা-স্নায়ু, তার কারণ অবশ্যই বিদ্রোহীর জাগানিয়ামন্ত্র।

বিদ্রোহী কবিতা রচনাকাল এবং সময় নিয়ে যদিও বিস্তর বিতর্ক আছে। কিংবা বিদ্রোহী কবিতা প্রথম কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল সে বিষয়েও মতভেদ আছে আজও। তবে বিতর্ক যাই থাকুক, কলকাতার তলতলা লেনের ৩/৪ সি বাড়িটির কোনও এক অন্ধকার ঘরে লণ্ঠন জ্বালিয়ে কবি তাঁর চিন্তার ভ্রূণ কলমের কালির মধ্য দিয়ে সাদা পৃষ্ঠায় ঢেলে গিয়েছিলেন, কালি ও কলমে লিপিবদ্ধ হল বাঙালির জাগানিয়া মন্ত্র। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের নজরুল গবেষক আহমদ কবিরের একটি প্রবন্ধে বিদ্রোহী কবিতা নিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য পাওয়া গিয়েছে ২০১১ সালে। মুজফফর আহমদের দেওয়া তথ্যে জানা যাচ্ছে, বিদ্রোহী কবিতা কলকাতার ৩/৪ সি তালতলা লেন বাড়িতে রচিত হয়েছিল। ১৯২০ সালে ঊনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালি পল্টন ভেঙে গেলে নজরুল প্রথমে তাঁর সতীর্থ কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে ওঠেন, সেখানে কয়েক দিন থেকে আরেকটি বাসস্থানে, পরে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে উঠলেন। সেখানে তাঁর বন্ধু মুজফফর আহমদ থাকেন। তাঁর সঙ্গে নজরুল একত্র বসবাস করেছেন আরও কয়েকটি বাড়িতে। শেষে ৩/৪ সি তালতলা লেনে। এখানেই বিদ্রোহীর জন্ম।

নজরুলের বয়স তখন ২২। ১৯২২ সালের জানুয়ারিতে প্রায় একই সময়ে বিদ্রোহী প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিজলী ও মাসিক মোসলেম ভারত-এ। ওই জানুয়ারিতেই পুনর্মুদ্রিত হয় প্রবাসীর মাঘ সংখ্যায় এবং সাধনার বৈশাখ সংখ্যায় (এপ্রিল ১৯২২)। এরপর ধুমকেতুতেও প্রকাশিত হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী কবিতার শব্দ নির্বাচন ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে নির্বিচারী ছিলেন। কবিতার প্রতিটি পঙক্তি যেন শরীরের রক্ত শুদ্ধ করে আওয়াজ তোলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

কবির কলমে লেখা হয়-আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি/আমি পথ-সমুখে যাহা পাই; যাই চূর্ণি/ আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ/ আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ/ আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল/ আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি ছমকি/পথে যেতে যেতে চকিত চমকি-ফিং দিয়া দিই তিন দোল।

এই কবিতার প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, কবির নিরাশ্রয়ী জীবনে তখন অন্যতম সহায় সমাজতন্ত্রী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ মুজফফর আহমদ (১৮৮৯-১৯৭৩)। তাঁরই হাত ধরে আসেন সাংবাদিকতায়ও। বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিবেশে জনমানসে সে সময় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্খা প্রবল। ১৯২০-এর সেপ্টেম্বরে কলকাতায় ভারতীয় কংগ্রেসের যে অধিবেশনে অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হয়, তাতে সাংবাদিক হিসেবে এই দুইজনই ছিলেন উপস্থিত। এরপর অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে স্বরাজের দাবিতে যখন কেঁপে ওঠে সারা ভারত, তখন কবিও তার সঙ্গে একাত্ম হন।

বিদ্রোহী রচনার মাসটিতেই গ্রেপ্তার হন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ; তাঁর পত্রিকার জন্য পরের মাসেই এক বৈঠকে লিখে ফেলেন সাড়াজাগানো গান -কারার ঐ লৌহ কপাট। বিদ্রোহী রচনার মাসটিতেই মুজফফর আহমদ ও তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা নজরুলকে সঙ্গে নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কথা ভাবেন। নজরুল অবশ্য পার্টিতে সক্রিয় হননি; তবে বৈপ্লবিক সমাজ রূপান্তরের চেতনায় ছিলেন দারুণভাবে আন্দোলিত ও উজ্জীবিত।
এই শতবর্ষে দাঁড়িয়ে আমরা গভীরভাবে উপলব্ধি করি বিদ্রোহী কবিতার প্রাসঙ্গিকতা ও তার অম্লান তাৎপর্যের কথা। উপনিবেশবাদের অবসান ঘটলেও বিশ্বায়নের শৃঙ্খল আর ধনতন্ত্রের শোষণ বঞ্চনা অত্যাচার নির্যাতনসহ আর্থসামাজিক বৈষম্য সবকিছুই বলবৎ আছে আজও। ‘অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণে’র তলে ‘উৎপীড়িতের ক্রন্দন রোল’ এই বাংলার আকাশে-বাতাসে আজও প্রতিনিয়ত ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়।
এক সময় মনে হয়, দীর্ঘ মন্ত্রোচ্চারণ শেষে কবি কণ্ঠে নেমে আসে শান্তির আমেজ। কবি উচ্চারণ করেন,
মহা-বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের
ক্রন্দন-রোল, আকাশে বাতাসে
ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ
ভীম রণ-ভূমে রণিবে না…।

Leave a Reply

Your email address will not be published.