এসএসসি’র (SSC) দুর্নীতি মামলায় এবার সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপের দাবি!

এসএসসি’র (SSC) দুর্নীতি মামলায় এবার সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপের দাবি!

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: এসএসসি শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলা নিল নতুন মোড়। এই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপের দাবি করলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। এসএসসি’র (SSC) শিক্ষক নিয়োগ সহ শিক্ষাকর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চারটি মামলায় সিবিআই (CBI) তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল সিঙ্গল বেঞ্চ। সেই চারটি নির্দেশের ওপরই স্থগিতাদেশ জারি করেছে বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন এবং বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ সামন্তের ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এদিন প্রশ্ন তোলেন, কেন তাঁর দেওয়া নির্দেশের ওপর বারে বারে স্থগিতাদেশ দিচ্ছে ডিভিসন বেঞ্চ। তিনি মনে করেন  স্কুলে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগ নিয়ে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এসএসসি’র দুর্নীতি। তাই এইক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলেই মনে করছেন তিনি।

এদিন কলকাতা হাইকোর্টের (Kolkata High Court) বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এসএসসি’র শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চারটি মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিলেন তার সঙ্গেই এসএসসি’র (SSC) এক আধিকারিকের সম্পত্তি সংক্রান্ত রায় সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এনভি রামানা এবং কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি প্রকাশ শ্রীবাস্তবের কাছে পাঠানোরও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। জানা যাচ্ছে হাইকোর্টের প্রশাসনিক বিভাগ এই দায়িত্ব নিয়েছে। এই নির্দেশের পর সিঙ্গল বেঞ্চ মন্তব্য করে বলে, ‘কাদের সুবিধা পাইয়ে দিতে ডিভিশন বেঞ্চ হাত বেঁধে দিচ্ছে এটা পরিষ্কার হওয়া খুব প্রয়োজন।’ ফলত, শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির মামলায় ক্ষুব্ধ বিচারপতি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন। যদিও কলকাতা হাইকোর্টে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা প্রায় নজিরবিহীন।

এই মামলায় রাজ্যের শাসকদলের তরফ থেকে বিচারপতিদের যে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে সেই ঘটনাই সামনে এসেছে বলে মনে করছেন বিচার বিভাগের ‌অনেকেই। নিয়োগ সংক্রান্ত যে তদন্তকারী দল রাজ্য সরকার গঠন করেছে তাঁদেরই আদালতে সাক্ষ্য দিতে হচ্ছে। এই বিষয় নিয়ে  বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় মন্তব্য করে বলেন, শীর্ষ আদালতের উচিত এই বিষয়টিও ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা। সূত্রের খবর, এসএসসি মামলার বিষয়ে জানতে চেয়ে হাইকোর্টের ডেপুটি রেজিস্টারের কাছে আরটিআই করেন আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি। এই আরটিআই’র উত্তরে ডেপুটি রেজিস্ট্রার জানিয়েছিলেন, এই তথ্য সরবরাহ করা যাবে না। 

বুধবারের কলকাতা হাইকোর্টের এই নির্দেশকে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী ও কলকাতা প্রাক্তন মেয়র বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘আদালতের উচিত বিচার ব্যবস্থাকে সংবিধান মেনে পরিচালন করা। সরকারের তরফ থেকে কোনও মামলাকে বাইরে থেকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়ে থাকলে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আদালত এ ব্যাপারে নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করতে পারে।’ আইনজীবী রবিশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ও বলেন, ‘কোনও আইনজীবী বা কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তি বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে চাইলে আদালতের উচিত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করা।’ এদিন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় জানান, ‘একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির হয়ে এক আইনজীবী আমার কাছে এসেছিলেন এই বিষয়ে আলোচনা করতে। তবে আমি তাঁর কথায় কান দিইনি। বিচারব্যবস্থা আইন মেনেই চলবে। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ওই আইনজীবীর নাম জানতে চাইলে আমি বলে দেব।’

গণিত বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি বিরুদ্ধে মামলা করেন আবদুল গণি আনসারি। এই মামলার শুনানির সময় সিঙ্গল বেঞ্চ বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় এসএসসি-র শিক্ষক নিয়োগের মনিটরিং কমিটির কনভেনর শান্তিপ্রসাদ সিনহার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব আদালতে জমা দিতে নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের বিরোধিতা করে শান্তিপ্রসাদ সিনহা ডিভিসন বেঞ্চে আপিল করেন। বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডনের ডিভিসন বেঞ্চ এই মামলার নির্দেশে বলেন, ‘সম্পত্তির হিসাব মুখবন্ধ খামে আদালতে জমা করতে হবে। মামলার নিষ্পত্তির আগে সেই খাম কোনওভাবেই খোলা যাবে না। বুধবার বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায় ডিভিসন বেঞ্চের এই নির্দেশের বিরোধীতা করে বলেন, মামলার শুনানির জন্য এই সম্পত্তির হিসাব অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মামলার শুনানি হয়ে গেলে এই সম্পত্তির হিসাব আর কোনও কাজে লাগবে না। তাছাড়া মামলাকারীর আইনজীবীরা এই সম্পত্তির হিসাব নিয়ে তাঁদের শুনানির সময় কোন বক্তব্যও আদালতকে জানাতে পারবেন না। 

রাজ্যে টেটের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছিল ২০১৬ সালে। এরপর বিভিন্ন সময় মেধা তালিকা তৈরি নিয়ে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। মেধাতালিকা তৈরির পর নিয়োগের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২০১৯ সালেই সেই মেধাতালিকার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এই তালিকা থেকে শিক্ষক নিয়োগের জন্য রাজ্য সরকার ৫ সদস্যের একটি মনিটরিং টিম তৈরি করে দেয়। করোনা সংক্রমণের সময় লকডাউনের শুরুতে মূলত ২০২১ সালে দেখা যায় মেয়াদ উত্তীর্ণ মেধাতালিকা থেকে নিয়োগের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। মেয়াদ উত্তীর্ণ তালিকা থেকে বেছে বেছে নবম-দশম শ্রেণির জন্য শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। মেধাতালিকায় প্রথমদিকে যাঁদের নাম ছিল তাঁরা কোনও সুযোগই পাননি। এই অভিযোগ নিয়ে আদালতে দ্বারস্থ হয়েছেন বহু চাকরিপ্রার্থী। এরপরই অভিযোগ ওঠে মেধাতালিকায় নাম নেই এমন বহু প্রার্থীকেও শিক্ষক পদে নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলা, ইতিহাস এবং গণিত বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগে এই দুর্নীতি সকলের সামনে আসে। শিক্ষক পদে নিয়োগ দুর্নীতির মামলা চলার সময়েই সামনে আসে মেয়াদ উত্তীর্ণ তালিকা থেকে স্কুলগুলিতে গ্রুপ-ডি এবং গ্রুপ-সি পদে শিক্ষাকর্মী নিয়োগের ঘটনাও। আদালতে এই মামলা চলার সময়েই এসএসসি’র (SSC) তরফে জানানো হয় এই নিয়োগ করেছে পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ। অন্য দিকে আদালতে পর্ষদের পক্ষ থেকে বলা হয় তারা এসএসসি-র (SSC) সুপারিশের ভিত্তিতেই নিয়োগপত্র পাঠিয়েছে। কলকাতা হাইকোর্ট শিক্ষক নিয়োগ মামলায় রাজ্য সরকারের গঠিত মনিটরিং টিমের সদস্যদের বক্তব্য শুনেছে।

মামলাকারীদের আইনজীবী ফিরদৌস শামিম বলেন, এসএসসি’র (SSC) শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাকর্মী নিয়োগ নিয়ে ভয়ঙ্কর দুর্নীতি প্রকাশ্যে এসেছে। কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ সিঙ্গল বেঞ্চের সিবিআই তদন্তের  নির্দেশের ওপর আপাতত স্থগিতাদেশের নির্দেশ দিয়েছে। তবে এই স্থগিতাদেশ দেবার সময়ই বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডনের ডিভিসন বেঞ্চ এসএসসি-কে সতর্ক করে বলে সমস্ত প্রশ্নের সঠিক উত্তর তাঁদের দিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে অস্বচ্ছতা রয়েছে তার প্রমাণ মিলেছে। কেন এই অস্বচ্ছতা তা অবশ্যই জানাতে হবে এসএসসিকে। বুধবারও জীবনবিজ্ঞান বিভাগে অস্বচ্ছভাবে নিয়োগ হয়েছে এমন এক শিক্ষকের নিয়োগপত্র এবং অন্যান্য তথ্য বিচার করে বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বেতন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এমনকি, আদালত নির্দেশ দিয়েছে অভিযুক্ত শিক্ষক স্কুলের কোনও খাতায় সই করতে পারবেন না বলে নির্দেশ দিয়েছ কলকাতা উচ্চ আদালত। এসএসসি’র (SSC) মামলা নিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে। সুবিচারের আশায় লক্ষ লক্ষ চাকরিপ্রার্থীর নজর থাকবে কলকাতা হাইকোর্ট শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয় তার উপর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.