বিদ্যারূপেন সংস্থিতা!‌

Home কলকাতা বিদ্যারূপেন সংস্থিতা!‌
বিদ্যারূপেন সংস্থিতা!‌

প্রিয়ম সেনগুপ্ত:‌ রাত পোহালেই বিয়ে। সাতপাকে বাঁধা পড়ার আগের রাতে বোনের কাছে কথায় কথায় কনেটি জানিয়ে ফেলল তার মনের কথা। পরিবারের পছন্দ করা পাত্রটি নয়, আসলে সে ভালবাসে পাড়ার বাঙালি গায়কটিকে। যদি প্রেম–ভালবাসার পাকাপাকি কোনও সম্পর্কে তারা ছিল না কোনওদিনই। তবু.‌.‌.‌
ইউফোরিয়া তখন খ্যাতির শিখরে। পলাশ সেনরা লাখো তরুণ–তরুণীদের হার্টথ্রব। তুলনায় আসমুদ্রহিমাচল বিদ্যা বালনকে সেভাবে চেনেই না। তিনি বিখ্যাত হবেন আরও অনেক পরে। ‘‌পরিণীতা’‌ ফিল্মের হাত ধরে। তবুও ইউফোরিয়ার ‘‌কভি আনা তু মেরি গলি’‌ গানটার মিউজিক ভিডিওর টিকোলো নাকের হাসিখুশি মেয়েটার শেষ অবধি কী হল, জানার জন্য নড়েচড়ে বসেননি, এমন একজনও ছিলেন কি?‌ বোধহয় না।
গ্ল্যামারাস কিন্তু ঘরোয়া। কী আশ্চর্য, আবেদনময়ীর চরিত্রেও তাঁকে যতটা মানায়, ততটাই তিনি খাপ খেয়ে যান ‘‌দ্য গার্ল নেক্সট ডোর’‌ ইমেজেও। তামিল পরিবারের সন্তান। সেই অর্থে কোনও ‘‌বং কানেকশন’‌ তখনও নেই। অথচ কলকাতায় এসে সাংবাদিকের বুমের সামনে বাংলা বলেন ঝরঝর করে।
উল্কার গতিতে বাঙালির মনে ঘরের মেয়ে হিসেবেই জায়গা করে নিলেন বিদ্যা বালন।
নায়িকাদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর চোখ কার?‌ কার চুল সবচেয়ে সুন্দর?‌ এরকম নানা ‘‌চটপটা’‌ সমীক্ষা বলিউডি নানা ওয়েবসাইট অহরহ চালিয়ে থাকে। মুম্বইয়ের একটি খ্যাতনামা বলিউডি গসিপ পত্রিকা একবার সমীক্ষা চালাল, বলি–নায়িকাদের মধ্যে সবচেয়ে আবেদনময়ী কণ্ঠস্বর কার?‌ সবাইকে চমকে দিয়ে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতলেন বিদ্যা। মনে রাখতে হবে, তখনও তিনি সিলভার স্ক্রিনে নায়িকাদের দৌড়ে নিজের আসন পাকাপোক্ত করে উঠতে পারেননি। এর অনেক পরে, ২০১৭ সালে মুক্তি পাবে ‘‌তুমহারি সুল্লু’‌। যেখানে সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারের গৃহবধূ স্রেফ কণ্ঠস্বরের আবেদনেই হইচই ফেলে দেবেন রেডিওজগতে। শরীরী আবেদন কিংবা রূপের ছটায় স্ক্রিনে আগুন তো জ্বালিয়েছেন অনেকেই। কিন্তু বিদ্যার কণ্ঠের আবেদন এমনই যে। লগে রহো মুন্নাভাই হোক কিংবা তুমহারি সুল্লু— বারবার তাঁকে দেখা দেখা গিয়েছে রেডিও জকির ভূমিকায়।
আজকাল সিনেমার আলোচনায় প্রায়শই শোনা যায় ‘‌সাহসী দৃশ্য’‌ কথাটা। সাধারণত নায়িকারা ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে বা স্বল্পপোশাকে ক্যামেরার সামনে এলেই সেটায় গায়ে পড়ে যায় সাহসী দৃশ্য কথাটা। কিন্তু বিদ্যার কাছে সাহসী দৃশ্যর সংজ্ঞাটা একটু অন্যরকম। ‘‌অভিনেত্রী হিসেবে আপনার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট কী’‌?‌ এক সাক্ষাৎকারে এই প্রশ্নের উত্তরে বিদ্যা হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘‌আমি কখনও ভয় পাই না। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে পরিচালক আমাকে যেমন দেখাতে চান, আমি সেভাবেই ক্যামেরার সামনে আসতে রাজি।’‌
ঘনিষ্ঠ দৃশ্য কিংবা স্বল্প পোশাকে অভিনয়ে বিদ্যা যে ভয় পান না সেটা ‘‌ডার্টি পিকচার’‌–এই প্রমাণ করে দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি রেখেছেন আরও এক সাহসের পরিচয়। প্রায় কোনও অভিনেত্রীই চান না, ক্যামেরায় তাঁকে স্থূলকায়া কিংবা কুরূপা দেখাক। বিদ্যা অবশ্য সেসবের তোয়াক্কা করেন না। একটি তামিল পত্রিকার দাবি, ডার্টি পিকচারের শ্যুটিংয়ের সময় যে দৃশ্যগুলোতি সিল্ক স্মিতার বিখ্যাত হওয়ার আগের চরিত্রের একটি দৃশ্যে নাকি বিদ্যা প্রসাধন শিল্পীর কাছে গোঁ ধরেছিলেন, দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করা চরিত্রটি ঠিক করে ফুটিয়ে তোলার জন্য তাঁকে আরও বিধ্বস্ত চেহারার মেকআপ করে দিতে হবে। দেখাতে হবে আরও কুরূপা হিসেবে!‌
ভাবা যায়!‌
জিরো ফিগার নায়িকাদের দৌড়েও কোনওদিন নিজের শারীরিক গঠন নিয়ে সমালোচনাকে পাত্তাই দেননি বিদ্যা। বলেছেন, ‘‌যেদিন দরকার হবে, রাতারাতি দশ কেজি ওজন ঝরিয়ে নেবো। আমার যখন যেমন থাকতে ভাল লাগে, তখন তেমনই থাকি। যা খেতে ইচ্ছা করে তাই খাই। কারণ, আমি এতেই আনন্দে থাকি। নিজে যদি খুশি না থাকা যায়, তাহলে আমি আমার কাছের মানুষগুলোকে ভাল রাখব কী করে। আজকাল অনেক মহিলাকেই দেখি নিজের শারীরিক গঠন বা হীনমন্যতায় ভুগতে। ওঁদের মনে হয়, ওজন বেড়ে গেলে নাকি তাঁদের প্রেমিক কিংবা স্বামী আর ভালবাসবেন না। তাঁদের আমি বলব, নারীর আসল সৌন্দর্য তাঁদের মাথার ভিতরটায়। যাঁরা আপনার মাথার বাইরেটা সুন্দর না হলে আর আপনাকে ভালবাসবেন না, তাঁরা আসলে আপনার শরীরটাকে ভালবাসে। মনটাকে নয়।’‌
কাহানি এবং ডার্টি পিকচার— সম্ভবত এদুটোই বিদ্যার কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল দুই মাইলফলক। দর্শকমাত্রেই জানেন, কীভাবে এই দু’‌টি ছবিতেই নিজেকে বারবার ভেঙেছেন বিদ্যা। তবে শ্রীদেবীর ভক্ত বিদ্যার কাছে তাঁর স্বপ্নের চরিত্রটি কিন্তু এখনও অধরা। জীবনে অন্তত একবার চার্লি চ্যাপলিনের ভূমিকায় অভিনয় করতে চান বিদ্যা। ‘‌মিস্টার ইন্ডিয়া’‌ ছবিতে চার্লির অবতারে দেখা গিয়েছিল শ্রীদেবীকে। সেই থেকে অন্তত একবার চার্লি চ্যাপলিনের সাজে ক্যামেরার সামনে আসতে চান বিদ্যা।
শ্যুটিংয়ের বাইরে প্রচুর আড্ডা আর অনেক বইপড়াই বিদ্যার নেশা। তিনি মনে করেন, আড্ডা মারলে আর বই পড়লে নানা চরিত্রের মানুষের কথা জানা যায়। অভিনেত্রী হিসেবে নাকি এই দুটোই তাঁকে আরও সমৃদ্ধ করে। যদি বলিউডে এক নাম্বার নায়িকা হওয়ার দৌড়টায় তিনি বিশ্বাস করেন না। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য নিজেকে ভাল অভিনেত্রী হিসেবে গড়ে তোলা। বিদ্যার কথায়, ‘‌যদি আপনি সত্যিসত্যিই মন থেকে কিছু চান, তাহলে সেটাকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য করে তোলার কোনও দরকার নেই। আপনি যদি কাজের প্রতি সৎ থাকেন এবং কাঙ্খিত লক্ষ্যের প্রতি আপনার ভালবাসাটা যদি খাঁটি হয়, তাহলে আপনার স্বপ্ন একদিন না একদিন সফল হবেই।
শুভজন্মদিন বিদ্যা!‌ আপনার সব স্বপ্ন সত্যি হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.