ভেঙে পড়া পোস্তা উড়ালপুলের (POSTA FLYOVER) ক্ষত এখনও দগদগে

ভেঙে পড়া পোস্তা উড়ালপুলের (POSTA FLYOVER) ক্ষত এখনও দগদগে

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ, দুপুর ১২:৩২। উত্তর কলকাতার বিবেকানন্দ রোড তখন জমজমাট রোজকার ব্যস্ততায়। গণেশ টকিজের কাছে পোস্তার নির্মীয়মান সেই উড়ালপুল-এর একাংশ যখন ভেঙে পড়ে, মুহূর্তে উলটেপালটে গিয়েছিল অনেক জীবন। সরকারি হিসাবে মৃত্যু ২৮ জনের, আহত ৮০জন।

২০০৮ সালে অর্থাৎ বাম আমলে পোস্তা উড়ালপুল (POSTA FLYOVER) তৈরির প্রস্তাব ছাড়পত্র পায়। হায়দরাবাদের সংস্থা আইভিআরসিএল-এর সঙ্গে হল নির্মাণের চুক্তি সাক্ষর।

দুর্ঘটনার (ACCIDENT) কারণ হিসাবে উঠে আসে নানা দোষত্রুটি। কেউ কেউ মনে করেন, ভোটের আগে তৃণমূল সরকারের তাড়াহুড়ো করে উদ্বোধন না করালে এ দুর্ঘটনা হতোই না। আবার কারও মতে, ত্রুটিপূর্ণ নকশাই পোস্তা উড়ালপুল (POSTA FLYOVER) ভেঙে পড়ার নেপথ্যের কারণ। আজও প্রশ্ন ওঠে, নির্মাণকাজ শেষ করার এত তাড়াহুড়ো কী ছিল? শুধুই ভোটপুজো?

মুখ্যমন্ত্রীর (MAMATA BANERJEE) নির্দেশে মুখ্যসচিব তাঁর নেতৃত্বে তড়িঘড়ি তৈরি করলেন কমিটি। প্রথমে ভগ্ন উড়ালপুলের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করেন খড়গপুর আইআইটি-র বিশেষজ্ঞরা। সেই রিপোর্টের স্পষ্টতার প্রয়োজনে সরকারের পক্ষ থেকে সেতুবিশেষজ্ঞ ভি কে রায়নাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাঁর পরামর্শেই সেতু ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার। ভাঙনকার্যের সময় যাতে কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে সেই বিষয়ে বিশেষ নজর রাখা হবে বলেও জানান তৎকালীন কলকাতা পুরসভার প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারপার্সন এবং বর্তমান কলকাতা মেয়র ফিরহাদ হাকিম।

তিন বছর পরেই ২০১৮ সালে আবারও সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল মাঝেরহাট উড়ালপুলের হাত ধরে। আবারও কলকাতার বুকে উড়ালপুল ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয় তিন জনের। সরকারের (WEST BENGAL GOVERNMENT) তরফে দাবি করা হয়, মাঝেরহাট ব্রিজের কাছে মেট্রো রেলের কাজই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে দায়ী এই দুর্ঘটনায়।

ভেঙে পড়া পোস্তা উড়ালপুল

রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ঘোষণাও হয় লক্ষাধিক টাকার ক্ষতিপূরণ। নিয়ম মেনে টাকাও আসে মানুষের হাতে।

কিন্তু মন থেকে কি মুছে গেছে সেই দগদগে ইতিহাসের স্মৃতি? কলকাতার মতো অতিপ্রাচীন শহরে উড়ালপুলের সংখ্যা নেহাত কম নয়।

বালিগঞ্জ জংশন রেলওয়ে স্টেশনের ওপর রয়েছে বিজন সেতু যা কসবা হয়ে গড়িয়াহাট ও ইএম বাইপাসকে জোড়ে। ২০১৮-তে উদ্বোধন হয় চার লেনের গার্ডেনরিচ উড়ালপুল। খিদিরপুর ও গার্ডেন রিচের মতো জনবহুল এলাকা জুড়ে থাকা এই উড়ালপুলই যে উল্টোডাঙা, শিয়ালদহ, ঢাকুরিয়া, সাঁতরাগাছি (হাওড়া) ও কলকাতার ব্যস্ততম উড়ালপুল, তা আর বলে দিতে হয় না। যানচলাচলের চাপও থাকে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই। মা উড়ালপুল, হাওড়া-কলকাতা সংযোগকারী বিদ্যাসাগর সেতু (দ্বিতীয় হুগলী সেতু), হাওড়া সেতু কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত উড়ালপুল।

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণত ভূমিকম্প, হাওয়ার গতি এবং ভারি ও বহু চাকার যানবাহন চলাচলের ওপর নির্ভর করে উড়ালপুলের স্বাস্থ্যের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়। সেই বুঝে তৈরি হয় নকশা, বিচার করা হয় উড়ালপুলের স্থানও। তাই যদি হয়, প্রশ্ন তো খুব স্বাভাবিকভাবেই আসবে তাহলে কি নির্মাণের সময় ‘তাড়াহুড়োয়’ এইসব বিষয় ‘জেনে বুঝেই’ এড়িয়ে গিয়ে ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়েছিল পোস্তা উড়ালপুলের (POSTA FLYOVER) নির্মাণকে। সময়ের সঙ্গে চাপা পড়েছে সেই প্রশ্নও।

এখন কী পরিস্থিতি কলকাতার বিভিন্ন উড়ালপুলগুলোর?

বর্তমানে বিদ্যাসাগর সেতুতে চলছে দীর্ঘদিনব্যাপী স্বাস্থ্যপরীক্ষা। সম্প্রতি কিছুদিন আগেই চারদিন লোড টেস্টিং-এর জন্য বন্ধ ছিল গড়িয়াহাট উড়ালপুল। ওভারলোডিং-এর সমস্যার ওপরও রাখা হচ্ছে নজর। অর্থাৎ নড়েচড়ে বসেছে রাজ্য সরকার।

পোস্তা উড়ালপুল (POSTA FLYOVER) তৈরির সময় থেকেই তা নিয়ে যথেষ্ট আপত্তি ছিল পোস্তার বাসিন্দাদের। ২০১৬ সালের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছিল ‘উড়ালপুল হঠাও কমিটি’। কমিটির সম্পাদক বাপি দাস তাঁর অভিযোগে জানিয়েছিলেন আতঙ্ক সঙ্গে নিয়ে জীবনযাপনের কথা। যত দ্রুত সম্ভব উড়ালপুল যেন ভেঙে ফেলা হয়।

কেএমডিএ অর্থাৎ কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি(KMDA), পুরসভা ও কলকাতা পুলিসের প্রতিনিধিদের তত্ত্বাবধানে  অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ভেঙে ফেলা হবে পোস্তা উড়ালপুলের ধ্বংসাবশেষ। পোস্তার আশেপাশে রয়েছে প্রচুর পুরনো আমলের বাড়ি। উড়ালপুল ভেঙে ফেলার পাশাপাশি সেগুলোর অস্তিত্ব রক্ষাও একটা বড় চ্যালেঞ্জ কলকাতা পুরসভার কাছে। সেই কারণেই মুম্বই থেকে আনানো হয়েছে বিশেষ যন্ত্র ‘রোবোটিক ব্রেকার’। এই যন্ত্র ব্যবহারে কম্পন কম তাই ক্ষতির সম্ভাবনাও সামান্যই। সূত্রের খবর উড়ালপুলের কিছু অংশের ভাঙনকার্যে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হবে, তাতে বেশকিছু জায়গা ভাঙার প্রয়োজন পড়বে না, দাবি কেএমডিএ কর্তৃপক্ষের। গোটা ফ্লাইওভার ভাঙতে খরচ ধার্য হয়েছে ১৫.৭৫ কোটি টাকা।

পোস্তার উড়ালপুল (POSTA FLYOVER) নিয়ে চলছে নয়া পরিকল্পনা। সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ভেঙে পড়া পোস্তা উড়ালপুলের জায়গায় তৈরি হবে নতুন চার লেনের একটি উড়ালপুল। তবে তার আগে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে পেশ করতে হবে তাদের রিপোর্ট।

এদিকে কেএমডিএ সূত্রের খবর, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা রাইটস ইতিমধ্যেই তাদের কাজ শুরু করে দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা ভালো করে খতিয়ে দেখে তবেই কাজ শুরু হবে। যদিও উড়ালপুলের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে এখনও কিছু জানা যায়নি।

আশেপাশের বাসিন্দারাও  যত তাড়াতাড়ি সম্ভব  ভুলে যেতে চান  অভিশপ্ত এই উড়ালপুলের অস্তিত্ব। সরকার পালটালেও দায়টা কার? প্রশ্ন পোস্তাবাসীর। এখনও মানুষের মন থেকে সেই যন্ত্রণার দিন, সেই ভয়াবহতা মুছে যায়নি পুরোপুরি। এখনও যে কোনও উড়ালপুলের নীচ দিয়ে যেতে গেলে একবারও কি মনে পড়ে না কলকাতাবাসীর সেই অভিশপ্ত দিন?

পোস্তার (POSTA FLYOVER) ঘটনাই প্রথম নয়, তার আগেও ২০১৩ সালের মার্চ মাসেই ভেঙে পড়েছিল উল্টোডাঙা উড়ালপুলের একাংশ। তারপরেও  গুণমানের নিরিখে টনক যে নড়েনি প্রশাসনের, তারই প্রমাণ নির্মীয়মান পোস্তা বা তার পরের মাঝেরহাট দুর্ঘটনা। প্রশ্ন একটাই, আর ক’টা পোস্তা বা মাঝেরহাট ঘটলে ঘুম ভাঙবে সরকারের?

Leave a Reply

Your email address will not be published.