আঁউলগ্ল্যাগ থেকে ইরক! বাংলাভাষাকে যে সব ধ্বনিবাচক অব্যয় দিয়ে গেলেন‌ নারায়ণ

Home কলকাতা আঁউলগ্ল্যাগ থেকে ইরক! বাংলাভাষাকে যে সব ধ্বনিবাচক অব্যয় দিয়ে গেলেন‌ নারায়ণ
আঁউলগ্ল্যাগ থেকে ইরক! বাংলাভাষাকে যে সব ধ্বনিবাচক অব্যয় দিয়ে গেলেন‌ নারায়ণ

অরিজিৎ পাল: ধরা যাক, আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। হঠাৎ করে কোনও একটা পাথরের টুকরোয় হোঁচট খেয়ে রাস্তায় পড়ে গেলেন। আকস্মিক এই ঘটনার প্রতিঘাতে আপনার মুখ থেকে যে বিচিত্র শব্দটি বের হবে, তাকে কি বাংলা অভিধানে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে? না পাওয়াই স্বাভাবিক, কারণ প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় আমাদের মুখ থেকে যে অদ্ভুত শব্দগুলো বেরোয়, সেগুলোর অর্থ তাবড় তাবড় ভাষাবিজ্ঞানীরাও বের করতে পারেননি। অথচ কী অবলীলায় সেই দুরূহ কাজটি দিনের পর দিন করে গিয়েছিলেন প্রবাদপ্রতিম কমিকস স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ। তাঁর সৃষ্ট কমিকস চরিত্র বাঁটুল দি গ্রেট, হাঁদা-ভোঁদা কিংবা নন্টে ফন্টের মুখে তিনি বসিয়েছেন এমন এমন শব্দ, যা পড়লে শিশুরা তো বটেই, বড়রাও অনুভব করতে পারবেন যে ওই নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিক্রিয়া যেন ওই শব্দটা ছাড়া প্রকাশই করা যায় না। তুলির জীবন্ত টানের সঙ্গে সঠিক শব্দচয়নের এক মূর্ত প্রতীক নারায়ণ দেবনাথ। চলুন, ফিরে দেখা যাক তাঁর সৃষ্ট সেইসব অদ্ভুত শব্দভাণ্ডারের দিকে।

১) অ্যাগস: হঠাৎ করে কোনও কিছুর আঘাতের পর বা কোনও কিছুতে ধাক্কা খেলে এই প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করেছে নারায়ণ দেবনাথের চরিত্রগুলি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই শব্দের ব্যবহারকারী হলো হাঁদা, কেল্টুদা এবং বাঁটুল দি গ্রেটের বাচ্চু ও বিচ্ছু।

২) ওয়াফ: প্রবল আঘাতের পর কিংবা মার খাওয়ার পরের প্রতিক্রিয়া হল এটি। সাধারণত মারধোরের ঘটনার পর এই প্রতিক্রিয়া দেয় হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে ও কেল্টুদা।

৩) মড়াৎ/দড়াম: সাধারণত কাঠ নির্মিত কোনও জিনিস ভাঙার পর এই আওয়াজটি হয়। এই শব্দটিকেও সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন নারায়ণ দেবনাথ। বাঁটুল দি গ্রেট কমিকসে এই শব্দের সংখ্যা বেশি, কারণ বাঁটুলের ঘুষিতে মাঝেমাঝেই প্রচুর জিনিস ভাঙে, যার মধ্যে কাঠের জিনিসের সংখ্যাও অসংখ্য।

৪) ঢপাক: কোনও জিনিস ছুঁড়লে তা যদি ফাঁপা কোনও জায়গায় ধাক্কা লেগে ফিরে আসে, তখন ‘ঢপাক’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বাঁটুল দি গ্রেটের একটি কমিকসে রয়েছে, রবার নির্মিত কোনও দেওয়ালে বাঁটুল ফুটবল দিয়ে ধাক্কা মারে, তখন এই শব্দটি শোনা যায়। বাহাদুর বেড়ালের দু-একটি কমিকসেও এই শব্দটি রয়েছে।

৫)ইরক: নারায়ণ দেবনাথের কমিকসগুলির মধ্যে সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে এই শব্দটি। আকস্মিক আঘাতে এই প্রতিক্রিয়া বেশি দিয়েছে তাঁর চরিত্রগুলি। প্রচণ্ড আঘাতে, পা পিছলে পড়ে গেলে, ধাক্কা খেলে এই প্রতিক্রিয়া দিয়েছে হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টেরা।

৬) থ্যাপাস: নারায়ণ দেবনাথের চরিত্রগুলি কোনও কিছুতে হোঁচট খেয়ে বা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলে এই বিচিত্র শব্দ হয়েছে। বিশেষ করে কাদায় পড়ে গেলে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে বেশি। নন্টে ফন্টের একটি কমিকসে সুপারিটেন্ডেন্ট স্যার কাদায় পড়লে এই শব্দ শুনতে পাওয়া গিয়েছে।

৭) গ্ল্যাবাউল: বড় বিচিত্র এই শব্দটি হঠাৎ জলের মধ্যে পড়ে যাওয়ার পরের প্রতিক্রিয়া হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে। জলে ডুবে নাকানিচোবানি খাওয়ার প্রতিক্রিয়া হিসাবেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

৮) ব্রুররর: জিভ ভেঙানোর শব্দ। হাঁদা-ভোঁদার কমিকসে বেশি দেখা যায়। হাঁদাকে হারিয়ে প্রায়শই ভোঁদা এই বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতো।

৯) আলগ/ক্ল্যাক: মুখের মধ্যে কোনও কিছু আটকে গেলে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন নারায়ণ দেবনাথ। হাঁদার মুখে বোতলের ছিপি আটকে যাওয়া থেকে ফন্টের মুখে স্টিকিং প্লাস্টার লাগানোর ঘটনায় এই শব্দই ব্যবহৃত হয়েছে।

১০) ফরর ফোঁৎ: সুপারিটেন্ডেন্ট, পিসেমশাই কিংবা কেল্টুদার ঘুমোনোর সময় নাক ডাকার শব্দ। অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ততার সাহায্যে এই শব্দ ব্যবহার করেছেন প্রবাদপ্রতিম এই শিল্পী।

১১)দুড়ুম: বোমা বিস্ফোরণের শব্দ। বাঁটুল দি গ্রেটের কমিকসে এই শব্দ বেশি পাওয়া যায়।

১২) গররর: বাঘ সিংহ বা অন্যান্য হিংস্র প্রাণীর গর্জনের শব্দ। বাঁটুল দি গ্রেট কমিকসে এই শব্দের ব্যবহার বেশি। বাঁটুল তার প্রবল শক্তিতে একের পর এক বন্য জন্তুজানোয়ারকে কাবু করার সময় এই শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।

১৩) সপাৎ: লাঠি/ছড়ি মারার শব্দ। সুপারিটেন্ডেন্ট নন্টে ফন্টে কিংবা কেল্টুদাকে অবাধ্যতার শাস্তি দেওয়ার সময় এবং পিসেমশাই হাঁদা ভোঁদাকে শাস্তি দেওয়ার সময় এই শব্দ পাঠকের কানে প্রবেশ করতো।

১৪) আ-আ-হাঁই: হাই তোলার শব্দ হিসাবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে।

১৫) খনাৎ খনাৎ: ধাতব কোনও কিছু জিনিসের আওয়াজ হিসাবে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। হাঁদা-ভোঁদা কমিকসে এই শব্দটি বেশি দেখা যায়।

১৬) ব্রুয়াস: দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। হাঁদা ভোঁদার কমিকসে ভোঁদার কাছে বারবার হারার পর হাঁদার মুখ থেকে এই শব্দ পাঠক প্রায়শই শুনে থাকবেন। গলদা চিংড়ি সংক্রান্ত একটি কমিকসে হাঁদারই ছোঁড়া ঝিনুকের দৌলতে ভোঁদা মুক্তো সংগ্রহ করে তা একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করে। বিক্রয়ের টাকায় ভোঁদা একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে নানাবিধ খাবার খায়। সেই দৃশ্য থেকে হাঁদার মুখ থেকে বের হয়েছিল এই বিচিত্র শব্দটি।

১৭) সুইস: হাঁদা যত গর্জায়, তত বর্ষায় না। ফলে এক বন্ধুর দাদাকে ‘দেখে নেওয়ার’ দাবি জানিয়েছিলো সে। কিন্তু সেই দাদা যে প্রবল বলশালী, তা জানা ছিল না হাঁদার। ফলে সেই দাদা প্রায় ধোপাদের কাপড় কাচার মতো করে হাঁদাকে উত্তমমধ্যম দেয়। সেখানেই পাওয়া যায় এই শব্দটি।

১৮) গ্লোউক: এই শব্দটিও পাওয়া যায় হাঁদা-ভোঁদা ও নন্টে-ফন্টের কমিকসে। হাঁদাকে জোর করে ডাক্তারের তেতো জোলাপ গেলানো থেকে কেল্টুদার নন্টে ও ফন্টেকে ‘অখাদ্য’ কোনও খাবার খাওয়ানো-সবেতেই এই শব্দটি পাঠকের পরিচিত হয়ে থাকবে।

১৯) গ্রদাস: এই শব্দটি একান্তভাবেই বাঁটুলের নিজের মুখ থুবড়ে পড়ার শব্দ। অন্যরা হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লে ‘গদাস’ বা ‘গদাম’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও বাঁটুলের পড়ে যাওয়াকে খানিক আলাদা করতেই নারায়ণ দেবনাথ এই শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

২০)আঁউলগ্ল্যাগ: জলে পড়ে হাবুডুবু খাওয়ার এই অসামান্য শব্দ ব্যবহারে নারায়ণ দেবনাথ এক ও অদ্বিতীয়।

নারায়ণ দেবনাথের অসামান্য কীর্তি থেকে ২০টি মণিমুক্তো তুলে আনা হলো। গতকাল সকালে প্রয়াত হয়েছেন এই অসীম প্রতিভাধর মানুষটি। তিনি চলে গেলেও বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা, নন্টে-ফন্টে, শুঁটকি-মুটকি, পটলচাঁদ দ্য ম্যাজিশিয়ান, ডানপিটে খাদু ও কেমিক্যাল দাদুর মতো চরিত্রগুলি আমাদের হৃদয়ে থেকে যাবে অনন্তকাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.