‘‌তুমি কেমন দেখতে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কী করো, সেটাই বেশি জরুরি’‌:‌ নানা পাটেকর

Home জলসাঘর ‘‌তুমি কেমন দেখতে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কী করো, সেটাই বেশি জরুরি’‌:‌ নানা পাটেকর
‘‌তুমি কেমন দেখতে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কী করো, সেটাই বেশি জরুরি’‌:‌ নানা পাটেকর

প্রিয়ম সেনগুপ্ত:‌ ‘‌আপনি নাকি নিজের সংলাপ নিজেই লেখেন?‌’‌

মুম্বইকর এক সাংবাদিকের প্রশ্নে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। বিশ্বনাথ নামটা ততদিনে অবশ্য অনেকটা পিছনে ফেলে এসেছেন পাঁচ ফিট আট ইঞ্চির অভিনেতা। হাসতে হাসতেই জবাব দিয়েছিলেন, ‘‌না, এরকম কোনও ব্যাপার নেই। হয়তো আমি যে সংলাপ বলি, তা দর্শকদের কাছে এতটাই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে, যে তাঁরা ধরে নেন, ওটা আমারই লেখা।’‌

কথাটা বোধহয় খুব একটা ভুল নয়। নানা পাটেকর সম্পর্কে এই গুঞ্জন একসময় সত্যিই টিনসেল টাউনের বাতাসে উড়ে বেড়াত, নানার মুখের সংলাপগুলো আসলে ওঁর নিজেরই লেখা। নইলে এত সাবলীলভাবে কোনও অভিনেতা কী করেই বা সংলাপ উগরে দেন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে?‌ যদি বা দেন, সেটা দর্শকদের কাছে এত জনপ্রিয় হয় কী করে?‌ ‘‌খামোশি’‌,‌ ‘‌প্রহার’‌ কিংবা ‘‌ক্রান্তিবীর’‌–এর মতো কয়েকটা সিনেমা বাদ দিলে বেশিরভাগ সিনেমাতেই সাইড রোল। তবুও কী করে নানা পাটেকর কোনও ফিল্মে থাকা মানেই হিরো কিংবা হিরোইনকে পিছনে ফেলে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য স্পটলাইট কেড়ে নেন নানা?‌ তা সে শাহরুখ খানের ‘‌রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’‌ হোক কিংবা অক্ষয়কুমারের ‘‌ওয়েলকাম’!‌
নানা বলেন, ‘‌সারল্য আর সংগ্রাম’‌। এই দুটোই নাকি তাঁর অভিনয়ের সাফল্যের চাবিকাঠি।
সংগ্রাম করেছেন বটে নানা। সেই ছোট থেকেই.‌.‌.‌
ছোটবেলায় ভীষণ দুরন্ত ছিলেন। সহবত শেখানোর জন্য নানার মা তাঁকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর মাসির কাছে। মাসি ছিলেন শিক্ষিকা এবং ভীষণ রাগী মহিলা। একবছরও কাটল না। যাতে মাসতুতো ভাই–বোনরা নানার সাহচর্যে বিগড়ে না যায়, তাই তাঁকেই মায়ের কাছে ফেরত পাঠালেন মাসি!‌
নানার মনে ততদিনে এ ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে, তাঁর বাবা–মা বোধহয় তাঁকে ভালবাসেন না। ছোট থেকেই নিজের চেহারা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতেন তিনি। কারণ, তাঁর ভাইবোনেরা তাঁর তুলনায় ভাল দেখতে ছিলেন। তাই অভিনয়কে পেশা করবেন, একথা স্বপ্নেও ভাবেননি তিনি।

ছবিটা পাল্টেই গেল একদিন। গ্রামে পাড়ার নাটকে একবার নেহাতই খেয়ালের বশেই অভিনয় করার কথা ভেবেছিলেন নানা। ছেলে নাটকে অভিনয় করবে খবর পেয়েই ছুটি নিয়ে মুম্বই থেকে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছিলেন নানার বাবা। নানার তো আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা!‌ সামান্য একটা অভিনয় দেখার জন্য বাবা চলে এসেছেন!‌ নানা ভেবে নিলেন, যদি এভাবেই তাঁর মা–বাবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, তাহলে অভিনই করবেন।
শুরুটা সেখান থেকেই।

জীবনের মোড় ঘুরে নানার। যে শ্যামবর্ণ রোগা চেহারার যে কিশোরটি এতদিন নিজেকে ছোট ভেবে এসেছিল, সে আবিষ্কার করল, মঞ্চে ওঠার পরে জোড়ায় জোড়ায় চোখ তার দিকেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে। যার মানে, তার মধ্যেও রয়েছে কোনও না কোনও সম্মোহনী ক্ষমতা।
নানা ঠিক করে ফেললেন, চলো অভিনয়ই করা যাক। এবং ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করলেন, ‘‌তুমি কেমন দেখতে, সেটা মানুষ তোমার সঙ্গে আলাপ হওয়ার পরে বড়জোর দু’‌মিনিট সেটা নিয়ে ভাববে। তারপরে যতদিন সে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, ততদিন সে গুরুত্ব দেবে তুমি কী কাজ করো, তার ওপরে। তাই তুমি কী করো, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। তুমি কেমন দেখতে, সেটার বিশেষ কোনও মূল্য নেই।’‌
শৈশবেই বাবার ব্যবসা লাটে ওঠে। মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে কাজ করা শুরু করেন নানা। ১৬ কিলোমিটার রাস্তা পায়ে হেঁটে সিনেমার পোস্টার সেঁটে বেড়াতেন। মাসের শেষে বেতন পেতেন ২৩টাকা। নানা বলেন, ‘‌ওই সময়ের পরিশ্রমটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। তেমন শিক্ষা আর কোনওদিন পেলাম না।’‌ সেখান থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজেই একটা ব্র্যান্ড হয়ে ওঠেন।
নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?‌ এক সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, ‘‌আজও যখন মুম্বইয়ের রাস্তা দিয়ে আমার গাড়ি ছোটে এবং জানলা দিয়ে দেখতে পাই, কেউ সিনেমার পোস্টার সাঁটছে, আমার নিজের সংগ্রামের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। মনে মনে ভাবি, হয়তো এদের মধ্যেও কেউ কোনও দিন নিজেদের সিনেমার পোস্টারে দেখতে পাবে।’‌

সিনেমার জগতে আসন পোক্ত করে ফেলার পরেও লড়াই শেষ হয়নি নানার। ‘‌পরিন্দা’‌ ফিল্মে অভিনয় করতে গিয়ে আগুনো হাত পুড়ে গেছিল। যেভাবে একবার টানলেই দস্তানা খুলে আসে, সেভাবেই উঠে আসতো চামড়া। একবছর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে পারেননি। তার জন্য অবশ্য কোনও আক্ষেপও নেই তাঁর। বলেন, ‘‌এসব তো জীবনেরই অঙ্গ।’‌ আবার ‘‌ক্রান্তিবীর’‌ ফিল্মে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে শয্যাশায়ী। সেদিনই ক্লাইম্যাক্স দৃশ্য শ্যুট করার কথা। যে দৃশ্যে রয়েছে নানার মুখে সেই অবিস্মরণীয় ‘‌আ গয়ে মেরে মৌত কা তামাশা দেখনে.‌.‌.‌’‌ সংলাপ। খবর পেলেন, জনতার ভূমিকায় অভিনয় করানোর জন্য দেড়–দু’‌হাজার ‘‌এক্সট্রা’‌–কে নিয়ে এসেছেন পরিচালক। নানা গেলে যদি শ্যুট বাতিল হয়, তাহলে পুরো পয়সাটাই নষ্ট হবে। দু’‌বার ভাবেননি নানা। হাসপাতালের বিছানা থেকে উঠে এসে সম্ভবত জীবনের সেরা দৃশ্যটার অভিনয় করে ফেলেছিলেন। কে বলবে, তার কয়েক ঘণ্টা আগেও বিছানায় শুয়ে রোগযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি।
হ্যাঁ, সেই একটা দৃশ্যে সংলাপ মুখস্থ করার সময় পাননি তিনি। নিজের সংলাপ ঠিক করেছিলেন নিজেই। প্রায় পাঁচমিনিট একটানা কথা বলতে হতো তাঁকে। পরিচালক বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ঠিক কেমন সংলাপ চান। মনে যা এসেছিল, সেটাই গড়গড়িয়ে বলে গিয়েছিলেন নানা। সেটাই কি না হয়ে দাঁড়াল একটা হিন্দি সিনেমার ইতিহাস এবং নানার কেরিয়ারের ‘‌আইকনিক সিন’‌।

প্রহার ফিল্মে কম্যান্ডোর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন নানা। দর্শকদের কাছে দারুণ বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল নানার ফৌজি অবতার। আর হবে না–ই বা কেন?‌ সত্যিই ন’‌য়ের দশকের গোড়ার দিকে সেনায় যোগ দিয়েছিলেন নানা। ক্যাপ্টেন পদ পর্যন্ত উঠেছিলেন তিনি। আর সেই নানাই একসময় ধূমপানে চরম আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। দিনে প্রায় ৬০টি সিগারেট খেতেন। সেই নানাই এখন ধূমপান থেকে শতহস্ত দূরে। বলেন, ‘‌ইচ্ছা থাকলে সবই সম্ভব।’‌

সিনেমায় কাজ চলছে। পাশাপাশি নিজের খামারবাড়িও রয়েছে তাঁর। নিজে চাষ করেন। এবং নিজের খামারে উৎপাদিত শস্য বিক্রির টাকা দেন করে মহারাষ্ট্রের অভাবী কৃষকদের মধ্যে।
খ্যাতির তুঙ্গে থেকেও অপার সারল্য নিয়ে মাটিতে পা, এমন করে বোধহয় শুধু নানা পাটেকরের পক্ষেই সম্ভব।

Leave a Reply

Your email address will not be published.