মধুর মধুর ধ্বনি বাজে, কানে আসছে প্রেম-বসন্তের বন্দিশ

Home ফিচার মধুর মধুর ধ্বনি বাজে, কানে আসছে প্রেম-বসন্তের বন্দিশ
মধুর মধুর ধ্বনি বাজে, কানে আসছে প্রেম-বসন্তের বন্দিশ

তিয়াষা গুপ্ত: “For Gods sake, hold your tongue
and let me love! ”

দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর্‌।
ভালোবাসিবারে দে আমারে অবসর।

শীত যাই যাই করছে। আজ বসন্ত পঞ্চমী। সরস্বতী পুজোর হাত ধরে বসন্ত সমাগম। তাই মনের কোণে গুনগুন করে ওঠে প্রেমের বন্দিশ। সকাল থেকে রাস্তায় হলুদ পরীদের ভিড়। পুজো প্যান্ডেলে অঞ্জলীর ফাঁকে এক জোড়া চোখ খুঁজে নিচ্ছে কোনও প্রিয়তমাকে। কারণ সরস্বতী পুজো এনে দিয়েছে সেই ছাড়পত্র, যার হাত ধরে এই শহরের বুকে লেখা হবে কোনও প্রেমের আখ্যান- কারণ আজ তো প্রেমের জোয়ারে ভাসাবে দোঁহারে…।

বসন্ত পঞ্চমী থেকেই শীতের শেষ এবং বসন্তের শুরু। তার সাড়া পাওয়া যায় প্রকৃতিতেও। এই সময় উজ্জ্বল সূর্যালোকে চারপাশ ঝকঝক করে। বাস্তুমতে রঙের গুরুত্ব অপরিসীম। আমাদের জীবনে এক একটি রঙের বিশেষ প্রভাব রয়েছে। হলুদ রং আমাদের অন্তরাত্মাকে শান্ত ও নিয়ন্ত্রিত রাখে। বাস্তুমতে হলুদ রঙের অর্থ কোনও কিছু নতুন শুরু করা। যেহেতু এই সময় থেকেই শীত শেষ হয়ে বসন্তকাল শুরু হয়, তাই বসন্তপঞ্চমীতে হলুদ রঙের পোশাক পরার রীতি প্রচলিত। বাড়ির খুদে সদস্যের হাতেখড়ি থেকে সদ্য যুবতীর হলদে শাড়ির সাজ, সদ্য যুবাটির চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য বাসন্তী সাজ যথেষ্ট। আজ পাড়ার বহু চেনা মেয়েটিও যেন অচেনা সাজে অন্যরকম। খানিকক্ষণের জন্য যেন প্রেমিকের হার্টবিট থেমে যাওয়ার উপক্রম। কেমন যেন সব কথা হারিয়ে যেতে বসেছে। প্রেমের সঙ্গে মিশে থাকে বিরহের সুর। তবে সেতারের সুর কেটে যাওয়ার কথা আজ না বলাই ভালো। কারণ আজ লেখা হোক না কোনও প্রেম পর্যায়ের গীতবিতান। এই শহরের বুকে আজ রচিত হবে আবার মুছেও যাবে কোনও প্রেমের আখ্যান।

বসন্তের সঙ্গে প্রেমের যোগসাজশটা দীর্ঘদিনের। রবিঠাকুর বলে গিয়েছেন, মধুর বসন্ত এসেছে, মধুর মিলন ঘটাতে। ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইনস ডে কোনওদিনই আমাদের নিজস্ব উৎসব নয়। ভ্যাল ডে-তে কোনও তরুণীর তীক্ষ্ণ চাউনি হাই পাওয়ারের চশমার আড়ালে থাকা গম্ভীর চোখ দু’টোকে ক্য়াবলা করে দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু এই উৎসবের সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্যের কোনও সম্পর্ক নেই। তবে একথা চোখ বুজে বলা যায়, বসন্তের সঙ্গে প্রেমের যোগাযোগ বেশ পুরনো; পৌরাণিক!পুরাণে প্রেমের দেবতা হল কামদেব আর এই কামদেবের বৈশিষ্ট্যগুলো হল-কোকিল, পারাবত, বসন্ত ঋতু এবং মলয় বাতাস! কেন বসন্ত আর মলয় বাতাস কামদেবের বৈশিষ্ট্য তা যদিও ঠিকভাবে বোঝা যায় না। তবে শাহ আব্দুল করিম গেয়েছেন, বসন্ত বাতাসে, বন্ধুর বাড়ির ফুলের গন্ধ আমার বাড়ি আসে। এর মানে কি এই যে বসন্তের বাতাসে বন্ধুর বাড়ি থেকে ফুলের গন্ধ ভেসে আসে বলে মন উচাটন করে? অথবা এই বাতাসেই এমন কোন উপাদান রয়েছে যাতে মনে প্রেম ভাব জেগে ওঠে? কোকিলের কুহু ডাকে মন উদাস হয় না এমন বাঙালি কি পাওয়া যাবে? সুতরাং গোটা বসন্ত ঋতুতেই প্রেমের দেবতার স্পর্শ লেগে থাকে; বাতাসে, কোকিলের ডাকে, ফুলের গন্ধে।শীতকালে ঝরে পড়া পাতার ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে গাছে গাছে আবার নতুন পাতা গজায় , পাতার ফাঁকে বসে কুহু-কুহু গান ধরে কালো কোকিল এবং ফুলে ফুলে ভরে যায় গাছগাছালি। মনের আনন্দে পাখিরা গান গাইতে শুরু করে এই বসন্তে। চারিদিকে শুধু ফুলের মৌ মৌ সুগন্ধ। আর তাই ঋতুরাজকে স্বাগত জানাতে প্রকৃতির পাশাপাশি রঙিন সাজে সেজে উৎসবে মেতে ওঠে তরুণ-তরুণীরা।

আমাদের কাব্যে সাহিত্যে বসন্ত সমাগমে অনুরণিত হয় প্রেমের ধ্বনি। `মায়ার খেলা’ গীতিনাট্যে রবীন্দ্রনাথ বসন্তের আবহ তৈরি করে দিয়েছেন।
‘আহা আজি এই বসন্তে,
এতো ফুল ফোঁটে,
এতো বাঁশি বাজে এতো পাখি গায়।’
কবিগুরু ছাড়া যেমন বসন্ত অসম্পূর্ণ তেমনি প্রেমের কবি নজরুলও বসন্তকে তুলে এনেছেন কবিতা ও গানে| কাজী নজরুল ইসলাম বসন্ত নিয়ে লিখেছেন
‘বসন্ত আজ আসলো ধরায়,
ফুল ফুটেছে বনে বনে,
শীতের হাওয়া পালিয়ে বেড়ায়
ফাল্গুনী মোর মন বনে।’
অথবা
‘বসন্ত এলো এলো এলোরে,
পঞ্চম স্বরে কোকিল কুহুরে।’
ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দোলযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়, এই উৎসবের অপর নাম বসন্তোৎসব। শান্তিনিকেতনে বিশেষ নৃত্যগীতের মাধ্যমে বসন্তোৎসব পালনের রীতি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়কাল থেকেই চলে আসছে।
বসন্ত মানেই পূর্ণতা, বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের কলরব। বসন্ত মানেই একে অপরের হাত ধরে কিছুটা পথ হাঁটা। বসন্ত মানে পলাশ, শিমুলর সমাহার। তাই তো এই বসন্ত দিনে নীল দিগন্তে চেয়ে গলা ছেড়ে বলতে ইচ্ছে করে-
‘ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক
আজ বসন্ত’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.