‘নেশাড়ুদের গ্রাম’ এর তকমা ঝেড়ে ফেলে কেরলের এই গ্রাম এখন ‘দাবাড়ুদের গ্রাম'(Chess Village Of India), কাহিনীর নেপথ্যে এক যুবক

‘নেশাড়ুদের গ্রাম’ এর তকমা ঝেড়ে ফেলে কেরলের এই গ্রাম এখন ‘দাবাড়ুদের গ্রাম'(Chess Village Of India), কাহিনীর নেপথ্যে এক যুবক

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ইচ্ছে থাকলে কী না হয়! তাও আবার সম্পূর্ণ একার প্রচেষ্টায়। ছিল ‘নেশাড়ুদের গ্রাম’, হয়ে গেল ‘দাবাড়ুদের গ্রাম’ (Chess Village Of India)। অজস্র বদনাম থেকে বিপুল সুনামে প্রত্যাবর্তন! কেরলের থ্রিসুর জেলার নির্জন এক গ্রাম মারোত্তিচলের (Marottichal) উত্থান ও পতনের কাহিনী সত্যিই অবিশ্বাস্য। এক সময় যে গ্রাম ছিল মাতাল আর জুয়াড়িদের আখড়া, সেখানেই আজ ঘরে ঘরে দাবা (Chess) খেলা হয়৷ শুধু বাড়িতেই নয়, গ্রামের ক্লাব, দোকানপাট সহ মাঠে ঘাটেও একই ছবি লক্ষ্য করা যায়। আর এই ভোলবদলের কান্ডারি যিনি, তিনি এই গ্রামেরই এক যুবক। সি উন্নিকৃষ্ণন (C. Unnikrishnan), যিনি আমূল বদলে দিয়েছেন তাঁর জন্মভূমি মারোত্তিচলকে।

এই ঘটনার গোড়াপত্তন ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগে। ষাটের দশকের সময়কালে কেরলের উত্তরাঞ্চলের গ্রামগুলিতে অধিকাংশ পুরুষই বুঁদ হয়ে থাকতেন মদের নেশায়। আর সেখান থেকেই শুরু হতো নানাবিধ অসামাজিক কার্যকলাপ। নেশায় আসক্ত হয়ে বাড়ির মহিলাদের ওপর অত্যাচার করা থেকে শুরু করে অকথ্য গালিগালাজ, এটাই ছিল সেই সময়কার সংস্কৃতি। ধীরে ধীরে গ্রামবাসীরা বুঝতে পারেন মদের আসক্তির কারণে বিরূপ প্রভাব পড়ছে স্থানীয় মানুষদের ওপর। পাশাপাশি নাবালক ছেলেমেয়েরাও না বুঝেই সুরাপানের ফাঁদে পা দিচ্ছে। সেখান থেকেই ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু।

স্বপ্ন আর বাস্তব তো এক নয়, অতএব আয়ের পথ খুঁজতে বাড়ির কাছেই একটি চায়ের দোকানের ব্যবসা শুরু করেন উন্নিকৃষ্ণন৷ এখান থেকেই বিপ্লবের শুরু। স্থানীয়রা সেই দোকানে প্রায়শই চা খেতে আসতেন। এই সুযোগে দাবা (Chess) নিয়ে নানান মজার গল্প করতেন উন্নিকৃষ্ণন৷ এভাবেই গ্রামবাসীদের অজান্তে তাঁদের দাবা খেলা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে থাকেন৷ যদিও শুরুতে যুবক এই চা বিক্রেতাকে খুব একটা পাত্তা দেননি স্থানীয়রা৷ কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র নন উন্নিকৃষ্ণনও৷ মারোত্তিচল গ্রামকে অ্যালকোহল মুক্ত করতে উদ্যোগ নিলেন উন্নিকৃষ্ণন। স্থানীয় মানুষদেরও যুক্ত করলেন এই কাজে। কারণ যাঁরা নিজেরাই নেশাগ্রস্ত, যতক্ষণ না তাঁরা নিজেরা নেশার কবল থেকে বেড়িয়ে আসতে চাইছেন, ততক্ষণ অন্যরা বুঝিয়েও কোনও লাভ হবে না। কিন্তু নেশা মুক্তির এই প্রয়াস বাস্তবায়িত করা এতটাও সহজ ছিল না। উপায় হিসেবে নিজের দোকানেই উন্নিকৃষ্ণন শুরু করলেন দাবা (Chess) খেলার বন্দোবস্ত। নিজেই উদ্যোগ নিয়ে গ্রামবাসীদের শেখাতে থাকলেন। আর এখানেই দিন বদলের শুরু। গ্রামের মানুষ দাবা খেলাকে এতটাই আপন করে নিলেন, যে মদের নেশা ছেড়ে দাবার নেশায় মেতে উঠলেন আট থেকে আশি সকলেই। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে লাগলো মগজে শান দেওয়ার এই খেলা। গ্রামবাসীরা মদ ও জুয়াকে কার্যত কিস্তিমাত করে দিয়ে সানন্দে গ্রহণ করলেন দাবা খেলা।

প্রসঙ্গত, উন্নিকৃষ্ণনের ব্যক্তিগত জীবনের বিষয়ে বলতে গেলে শুরু করতে হবে ছোটোবেলা থেকে।এক সময় ‘নেশাড়ুদের গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত মারোত্তিচল ছেড়ে কিছু দূরের ছোটো শহর কাল্লুরে থাকতেন উন্নিকৃষ্ণন। কাল্লুরে থাকাকালীনই দাবার শখ জাগে তাঁর৷ শুরু করেন দাবার অনুশীলন। অবশেষে দাবার (Chess) প্রেমে পড়েন এই যুবক ৷ এছাড়াও কিংবদন্তি ববি ফিশারের অন্ধ ভক্ত ছিলেন তিনি৷ আসলে দাবা শিখবেন বলেই গ্রাম ছেড়েছিলেন।

উন্নিকৃষ্ণন একাই তাঁর গ্রামের প্রায় সাতশো জনকে দাবা (Chess) খেলার প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ৷ এই যুবকের হাত ধরে মদ ও জুয়ার নেশা ছেড়েছেন মারোত্তিচলের নবীন থেকে প্রবীণ সকলেই। ধীরে ধীরে মহিলা পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই দাবার টানে ছুটে আসতে থাকেন তাঁর দোকানে। একেকজন হয়ে ওঠেন পাকা খেলোয়াড়৷ উন্নিকৃষ্ণনের কথায়, ‘জীবনে প্রতি মুহূর্তে আমরা যেমন বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করি, দাবা খেলা অনেকটা সেরকমই। এই খেলায় হার ও জিত ছাড়া অন্য কিছু নেই। হয় আপনি হারবেন, নয়তো জেতার জন্য লড়াই করে যাবেন। জীবনযুদ্ধের সকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে শেখায় দাবা’।

বর্তমানে মারোত্তিচল গ্রামের ৯০ শতাংশ মানুষই দাবা (Chess) খেলার সঙ্গে যুক্ত। এছাড়াও প্রতিটি পরিবারে অন্তত একজন আছেন যিনি দাবা খেলাকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী। এই খেলা গ্রামবাসীদের কাছে শুধুমাত্র অবসর যাপনের বিষয় নয়, তাঁদের জীবনযাত্রার অঙ্গ হয়ে গিয়েছে এই দাবা। অবশ্য আজ আর চায়ের দোকান নেই। অর্থনৈতিক ভাবে আরও উন্নতি করেছেন উন্নিকৃষ্ণন। বর্তমানে তিনি একটি রেস্তোরাঁর মালিক। এখন এই রেস্তোরাঁতেই বসে দাবার আসর। পেটপুজোর সাথেই যে কোনও সময় খুলে বসা যায় দাবার বোর্ড। একক প্রচেষ্টাতেও যে গ্রামের পরিবেশ আমূল বদলে দেওয়া যায় তা করে দেখিয়েছেন কেরলের এই যুবক। উন্নিকৃষ্ণনের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন পঞ্চম বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জয়ী স্বয়ং গ্র্যান্ড মাস্টার বিশ্বনাথন আনন্দ। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে এক হাজার খেলোয়াড়ের একই জায়গায় বসে দাবা খেলার নিদর্শন হিসেবে মারোত্তিচল গ্রাম এশিয়ার মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে নিয়েছে। সারা পৃথিবীর মানুষ দাবার কৌশল শেখার আকাঙ্ক্ষায় ভিড় করেন এই গ্রামে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবেই এই গ্রাম দেশজুড়ে চিহ্নিত হয় ‘দাবাড়ুদের গ্রাম’ (Chess Village Of India) হিসেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.