পড়ুয়াদের আন্দোলনের জের, বই খুলে পরীক্ষা নেওয়ার পথেই হাঁটছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)

পড়ুয়াদের আন্দোলনের জের, বই খুলে পরীক্ষা নেওয়ার পথেই হাঁটছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University)

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পরীক্ষা নিয়ে নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পথেই হাঁটছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় (Jadavpur University) কর্তৃপক্ষ। পড়ুয়াদের টানা আন্দোলনের জেরে কর্তৃপক্ষের তরফে পরীক্ষা সংক্রান্ত নিয়মে একাধিক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই ফ্যাকাল্টি কাউন্সিল অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (Faculty Council Of Engineering) বৈঠকে এই সংক্রান্ত বিষয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বিভিন্ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানদের থেকেও মতামত চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাইনাল সেমেস্টারের পরীক্ষা নিয়ে আগামী ৮ এপ্রিলের মধ্যে রিপোর্ট পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।

গতকাল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) পরীক্ষা বিষয়ক বৈঠকে ১৫টি বিভাগের মধ্যে ২টি বিভাগ প্রস্তাব দেয় অফলাইনে পরীক্ষা হলেও যাতে ‘ওপেন বুক ইভ্যালুয়েশন’ সিস্টেমে পরীক্ষা নেওয়া হয়। অর্থাৎ অফলাইনে পরীক্ষা দিলেও পড়ুয়ারা ‘বই খুলে’ পরীক্ষা দিতে পারবে। এর পাশাপাশি প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, বই, নোটস ও পিডিএফের প্রিন্টআউট নিয়ে পরীক্ষায় বসা যাবে। তবে মোবাইল বা ট্যাবের মতো কোনও ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেট ব্যবহার করা যাবে না। সেইসঙ্গে ১০০ নম্বরের বদলে ৭০ নম্বরে লিখিত পরীক্ষা করাতে চায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও প্রতিটি পেপারের পরীক্ষা ৩ ঘণ্টার পরিবর্তে ৪ ঘণ্টা নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফাইনাল ইয়ারের পড়ুয়ারা অফলাইনে অর্থাৎ ক্লাসরুমে বসেই পরীক্ষা দেবেন।

প্রসঙ্গত, বেশ কিছুদিন ধরেই অনলাইনে ইঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষার দাবিতে সরব হয়েছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পড়ুয়ারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সব বিভাগের পরীক্ষা অফলাইনে হলেও, নিজেদের দাবিতে অনড় ছিলেন তাঁরা। এমতাবস্থায় এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) শিক্ষক সংগঠন জুটা (JUTA)। জুটা-র সাধারণ সভার বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, পড়ুয়াদের দাবি মেনে অফলাইনের বদলে যদি অনলাইনে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের পরীক্ষা নেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষার গোটা প্রক্রিয়া থেকে বিরত থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। একই কারণে সম্পূর্ণ বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে জলঘোলা হয়েছে।

সমগ্র বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল জুটা (JUTA)। এই প্রসঙ্গে জুটা-র সাধারণ সম্পাদক পার্থপ্রতিম রায় জানিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এগজ়ামিনেশন বোর্ড এবং বোর্ড অব স্টাডিজ়গুলির অফলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত না মেনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তাহলে শিক্ষকরা এই পরীক্ষার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না’। তিনি আরও বলেন, এর আগে এই ধরণের অনলাইন পরীক্ষায় বহু ক্ষেত্রেই কারচুপি ও টুকলির অভিযোগ উঠেছে। তাই অনলাইন পরীক্ষার বদলে অফলাইনেই পরীক্ষা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবগত করার জন্যই জুটা-কে এই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়েছে। যে কারণে অফলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য শিক্ষকরা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলেই মনে করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে পড়ুয়া ও শিক্ষকদের মধ্যে এই অচলাবস্থার কারণে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির ছাত্রসংসদের সদস্যরা (FETSU) চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা অনলাইনে দেওয়ার দাবিতে উপাচার্য সুরঞ্জন দাসকে ঘেরাও করেছিল। প্রায় ১২ ঘন্টা ঘেরাও কর্মসূচি চলার পর উপাচার্য সুরঞ্জন দাস অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে ডাক্তারবাবুকে ডেকে আনা হয়। তিনি সুরঞ্জনবাবুকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। এই ঘটনার পর ঘেরাওয়ে নিযুক্ত পড়ুয়ারা সুরঞ্জনবাবুকে ছেড়ে দিলেও অবস্থান বিক্ষোভ চালিয়ে যান। ক্যাম্পাসেই রয়ে যান সহ-উপাচার্য স্যমন্তক দাস, রেজিস্ট্রার স্নেহমঞ্জু বসু সহ বেশ কয়েক জন শিক্ষক। ঘেরাও থাকা অবস্থাতেই উপাচার্য সুরঞ্জন দাস জানিয়ে দিয়েছিলেন, কোনও পরিস্থিতিতেই বোর্ডের অফলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বদলানো সম্ভব নয়। এদিন ফেটসু-র সদস্যরা (FETSU) সহ-উপাচার্যের কাছে দাবি জানায়, অবিলম্বে পরীক্ষা-বোর্ডের বৈঠক ডাকতে হবে। এই প্রসঙ্গে সহ-উপাচার্য জানিয়েছিলেন, ওই বৈঠক ডাকার এক্তিয়ার তাঁর নেই।

অন্য দিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্যকে এই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। খুব তাড়াতাড়ি বিশ্ববিদ্যালয় এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে’। রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির শিক্ষক সংগঠন আবুটা-র (ABUTA) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের (Jadavpur University) লোকাল চ্যাপ্টারের পক্ষে গৌতম মাইতির বক্তব্য ছিল, ‘এগজ়ামিনেশন বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা শক্ত হাতে কার্যকর করতে হবে প্রশাসনকে। ফেটসু-র এই ঘেরাওকে আমরা সম্পূর্ণ অসঙ্গত এবং অবাঞ্ছিত বলেই মনে করছি’। তবে এত কিছুর মধ্যেও, নিজেদের দাবিতে অনড় ছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়ুয়ারা। করোনা অতিমারির কারণে সমস্ত ক্লাস অনলাইনেই হয়েছে। যে কারণে তাঁদের দাবি ছিল, অনলাইনেই পরীক্ষা গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিক বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে বই খুলে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়কে স্বাগত জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার। তিনি বলেন ‘বিদেশেও এই ধাঁচেই পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে’। যদিও গোটা বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বই দেখে অফলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে। আপাতত এই প্রস্তাব মান্যতা পায় কিনা সেই দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ওয়াকিবহাল মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.