কোনও কাজই ছোটো নয়, সংসার চালাতে জুতো সেলাই করছেন ইসলামপুরের (Islampur) সুজিয়াদেবী

কোনও কাজই ছোটো নয়, সংসার চালাতে জুতো সেলাই করছেন ইসলামপুরের (Islampur) সুজিয়াদেবী

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: বাংলা ভাষায় একটি প্রবাদ রয়েছে ‘জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ’। যখন কোনও ব্যক্তি সব ধরনের কাজে পারদর্শী হন, তখন এই প্রবাদটি ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি আরও একটি প্রবচনও বাংলার মাটিতে প্রচলিত। বলা হয়ে থাকে, নারীদের (Women) অসাধ্য কাজ নাকি কিছুই নেই। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ঘরের সমস্ত কাজ, এমনকি একুশ শতকে দাঁড়িয়ে বাইরের কাজও নিপুণহস্তে সামলাচ্ছেন মেয়েরা। প্রায় সমস্ত কাজেই মেয়েরা পারদর্শী। উত্তর দিনাজপুর জেলার ইসলামপুর (Islampur) অঞ্চলের এই বিধবা মহিলার জেদ দেখলে নারীরা যে সবকিছুই পারে, সেকথাই প্রমাণিত হয়।

জানা গিয়েছে, ওই বৃদ্ধার নাম সুজিয়া দেবীরাম। বয়স ৬০ বছরের উপরে। সংসারে অভাব-অনটন থাকায় অর্থাভাব মেটাতে জুতো সেলাইয়ের পেশা বেছে নিয়েছেন তিনি। বিগত প্রায় ২৪ বছর ধরে কোনওরকম সমালোচনায় কান না দিয়ে এই পেশা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সুজিয়া দেবীর স্বামী বেশ কয়েকদিন আগে মারা গিয়েছেন। স্বামীর মৃত্যুর নিজের উদ্যোগে একমাত্র কন্যাসন্তানের বিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে বিয়ের কয়েকদিন পরই সুজিয়া দেবীর জামাই প্রবল অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাধ্য হয়েই সুজিয়া দেবীর মেয়ে আবার মায়ের আশ্রয়েই ফিরে আসেন। সব মিলিয়ে মা ও মেয়ের এই সংসারে একমাত্র রোজগেরে সুজিয়াদেবী নিজেই ।

কিন্তু কেন তিনি এই চর্মকারের পেশা বেছে নিলেন? সুজিয়া দেবী জানিয়েছেন, যত দিন তাঁর স্বামী বেঁচে ছিলেন শুধুমাত্র ঘরের বিভিন্ন কাজ ও সংসারের দেখাশোনা করতেন তিনি। হঠাৎ করে স্বামী মারা যাওয়ায় সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে বাধ্য হন তিনি। সংসার সামলানোর জন্য জুতো সেলাইকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না তাঁর কাছে। অল্প বিস্তর সেলাইয়ের কাজ আগে থেকেই জানতেন তিনি। সেই প্রতিভা কাজে লেগে যায় এখানেও। তবে জুতো সেলাই করেন বলে কোনও ভাবেই কুণ্ঠিত নন তিনি। এই কাজকে ছোট বলে মানতেও রাজি। ইসলামপুরের (Islampur) সুজিয়া দেবীরামের প্রত্যয়ী জবাব, ‘কোনও কাজই ছোট নয়। আমার সংসারের দায়িত্ব যখন আমাকেই নিতে হতে হবে, তখন যে পেশায় আমি স্বচ্ছন্দ সেই পেশাই বেছে নিয়েছি’।

প্রায় আড়াই দশক ধরে ইসলামপুর (Islampur) শহরের তিন নম্বর ওয়ার্ডের লিচুবাগান এলাকার বাসিন্দা সুজিয়া দেবী। সম্বল বলতে শুধু একফালি একটা ঘর। সেই একফালি ঘরে বসেই নির্বিকার ভাবে জুতো সেলাই করেন তিনি। এক সময় যে মহিলা চার দেওয়ালের অন্দরে সংসার সামলাতে ব্যস্ত থাকতেন, তিনিই আজ জুতো সেলাইয়ের মাধ্যমে সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েছেন। উত্তর দিনাজপুরের জেলার একমাত্র ‘মহিলা চর্মকার’ সুজিয়া দেবীরাম। তাঁর হাতের কাজ চমৎকার, এমনটাই বলছেন জুতো সারাতে আসা মানুষজন। খুবই ভদ্র ব্যবহার, বেশি কথা বলেন না তিনি। নিজের মনেই কাজ করে চলেন। ক্রেতাদের এগিয়ে দেওয়া জুতো পালিশ করে দেন, চপ্পল সারিয়ে দেন। সব কাজই হাসিমুখে করেন ষাটোর্ধ্ব বিধবা। জুতো পালিশ থেকে মেরামত, সেলাইয়ের জাদুতে একজোড়া জুতোকে নতুন করে তুলতে সিদ্ধহস্ত তিনি। কখনও কী কেউ খোঁজ নিয়েছেন? বা কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা তিনি পাননি এখনও? এই ধরনে প্রশ্ন শুনলে কড়া ভাষায় বৃদ্ধাকে বলতে শোনা যায়, ‘চব্বিশ বছর ধরে জুতো পালিশ করে পেটের ভাত জোটাচ্ছি। সকালে ৯টায় দোকান খুলি। আর রাত ৯টায় বন্ধ হয়। এর মধ্যেই যা রোজগার হয় তাই দিয়ে খাবার জোগাড় করি। তিনবার ঘরের জন্য আবেদন করেছি। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। সেই আমার ঝুপড়ি ঘরেই ছেলেমেয়েদের নিয়ে থাকি’। এখন আর শরীরে তেমন জোর নেই। একটানা কাজও করতে পারেন না তিনি। অল্প সময়েই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। বৃদ্ধার গলায় আক্ষেপের সুর, ‘কত লোক কত সুযোগ পাচ্ছে। কিন্তু আমি কিছুই পাচ্ছি না। আর তো শরীর চলছে না, তবুও কাজ করে যেতে হচ্ছে’। হতাশা আর অভিমান ঝরে পড়ে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধার গলায়।

বর্তমান সমাজে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেয়েরাও (Women) এখন সমান তালে স্বনির্ভর হয়েছে। স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রেও এখন মেয়েদের যোগদান লক্ষ্য করা যায়। পেশার দিক থেকেও জল-স্থল-অন্তরীক্ষ সব জায়গাতেই মেয়েদের বিচরণ। তবুও চারপাশে এমন কিছু কাজ রয়েছে যেগুলি শুধুমাত্র পুরুষরাই করতে পারেন বলে অনেকের ধারণা। সেই কারণেই যখন কোনও মহিলাকে ট্যাক্সি বা অটো চালাতে দেখা যায় তখন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন কেউ কেউ। চর্মশিল্প বা মুচিদের নিয়েও সেরকমই কিছু ধারণা রয়ে গিয়েছে সমাজে। এই ধরণের পেশার সঙ্গে যখনই মহিলারা যুক্ত হন, তখনই বাঁকা চোখে দেখা হয় তাঁদের। প্রাপ্য হিসেবে শুনতে হয় নানা কটুক্তিও। এই সব কিছুকে উপেক্ষা করে ইসলামপুরের (Islampur) এই বৃদ্ধা যেভাবে মুচির পেশা বেছে নিয়েছেন তা সত্যিই অভাবনীয়। উত্তর দিনাজপুর সহ সারা বাংলার মানুষ কুর্নিশ জানাচ্ছে সুজিয়া দেবীরামের এই উদ্যমকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.