রাষ্ট্রপুঞ্জে (UN) ইউক্রেন (Ukraine) ভোটে অংশগ্রহণ করলো না ভারত (India), রাশিয়ার (Russia) ভেটো (Veto) প্রয়োগে খারিজ প্রস্তাব

Home বিদেশ-বিভূঁই রাষ্ট্রপুঞ্জে (UN) ইউক্রেন (Ukraine) ভোটে অংশগ্রহণ করলো না ভারত (India), রাশিয়ার (Russia) ভেটো (Veto) প্রয়োগে খারিজ প্রস্তাব
রাষ্ট্রপুঞ্জে (UN) ইউক্রেন (Ukraine) ভোটে অংশগ্রহণ করলো না ভারত (India), রাশিয়ার (Russia) ভেটো (Veto) প্রয়োগে খারিজ প্রস্তাব

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: গত দু’দিন ধরে ইউক্রেনের (Ukraine) ওপর রাশিয়ার (Russia) আক্রমণ নিয়ে তোলপাড় বিশ্ব রাজনীতি। ইউক্রেনে ঢুকে একের পর এক অংশ দখল করতে শুরু করেছে রাশিয়া। এমতাবস্থায়, সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জে (UN) রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা প্রস্তাব নিয়ে ভোটাভুটিতে অংশ নিল না ভারত। রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলি একসঙ্গে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনেছিল। কিন্তু ওই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করবে না ভারত, এমনটাই জানিয়ে দিলেন রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি টি এস তিরুমূর্তি (T.S.Tarumurti)।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনা ওই প্রস্তাবে মোট ১১টি ভোট পড়ে। ভারতের পাশাপাশি ওই ভোটাভুটিতে অংশগ্রহণ করেনি চীন (China) ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (UAE)। পরবর্তী সময়ে সম্মিলিত রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাশিয়া ভেটো প্রয়োগ করার কারণে প্রস্তাবটি পাস হয়নি।

প্রসঙ্গত, গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভারতীয় সময় সকাল সাড়ে আটটা নাগাদ একটি টেলিভিশন বার্তায় ইউক্রেন (Ukraine) আক্রমণ করার কথা ঘোষণা করেছিলেন রাশিয়ার (Russia) প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র ছাড়ার আবেদনও করেছিলেন তিনি। পুতিন স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছিলেন যদি কোনও রক্তক্ষয় হয়, তবে তার সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে ইউক্রেনকেই। পরে রাষ্ট্রপুঞ্জের (UNO) জরুরি অধিবেশনে ইউক্রেনের প্রতিনিধি বলেন, এই পরিস্থিতিতে অস্ত্র সংবরণের কথা বলার সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ইউক্রেনে বহু আগে থেকেই রাশিয়ার হামলা শুরু হয়ে গিয়েছে। তখন রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস (Antonio Guterres) পুতিনকে বাহিনী প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রপুঞ্জের জরুরি অধিবেশনে মহাসচিব বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পুতিন, আপনাকে অনুরোধ, দয়া করে আপনার বাহিনীকে আটকান। সেনা ফিরিয়ে নিন। দয়া করে শান্তি বজায় রাখুন।’ কিন্তু তাঁর কথায় কর্ণপাত করেননি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

পুতিনের এই ঘোষণার পরই ইউক্রেনে আক্রমণ শাণায় রাশিয়া। ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ (Kyiv) ,ওডেসাসহ (Odesa) একাধিক জায়গায় শোনা যায় বিস্ফোরণের শব্দ। ওইদিন সকালেই কিয়েভের সবচেয়ে বড় বিমানবন্দর বরিস্পিলে (Borispil) গুলি চালানোর আওয়াজ পাওয়া গিয়েছিল। দেশের অন্যান্য প্রান্ত থেকেও আক্রমণের খবর আসছিল। তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে ইউক্রেনের বায়ুঘাঁটি ও এয়ার ডিফেন্স গুঁড়িয়ে দেয় রুশ সেনাবাহিনী। বেলারুশ (Belarus) সীমান্তের দিক থেকে ইউক্রেনে লাগাতার আক্রমণ চালানো শুরু করে রাশিয়া। এখনও পর্যন্ত পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইউক্রেনের ডোনেৎস্ক ও লুহানস্ক সহ বহু অঞ্চল দখল করেছে রাশিয়া।

রুশ আক্রমণের পর স্থানীয় সময় মধ্যরাত্রে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভোলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy) দেশবাসীর উদ্দেশে বক্তৃতায় রাশিয়ার শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিকদের যুদ্ধের বিরুদ্ধে স্বর তোলার আবেদন করেন। প্রসঙ্গত, ইউক্রেন আক্রমণের ২৪ ঘণ্টা আগে রাশিয়ার উপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়েছিল আমেরিকা ও ইউরোপ। কিন্তু তাতেও সেনা অভিযান থেকে নিরস্ত থাকেননি পুতিন।

রাশিয়ার হামলার পরিপ্রেক্ষিতে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি জানিয়েছেন বিনা প্ররোচনায় এবং সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে এই হামলা চালানোর সম্পূর্ণ দায় নিতে হবে রাশিয়াকে। এর পরিণতি রাশিয়ার জন্য ভয়ঙ্কর হবে, এমনটাই বলেছেন জো বাইডেন।

ইউক্রেনের ওপর রুশ আক্রমণ শুরুর পরই সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলি রুশ সরকারের এই সিদ্ধান্তকে ‘ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত’ তকমা দেয়। ওই দেশগুলি স্পষ্টতই জানিয়ে দেয়, রাশিয়ার এই ঘৃণ্য আক্রমণের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং সেইজন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে আর্থিক নিষেধাজ্ঞা জারি ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে উদ্যোগী হয় তারা। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার এই প্রস্তাবে শামিল হয়নি ভারত। এই প্রস্তাব সমর্থনও করেনি নরেন্দ্র মোদির সরকার। বরং ফের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ইউক্রেন সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করার পক্ষেই সওয়াল করেন টি.এস. তিরুমূর্তি। তাঁর বক্তব্য-‘ বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এখনই সব দেশের বৈধ স্বার্থের কথা বিবেচনা করে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সকলে মিলে একসঙ্গে বসবাস করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ করা উচিত।’ এই প্রসঙ্গে ২০১৪-১৫ সালে স্বাক্ষরিত মিনস্ক চুক্তির কথা উল্লেখ করেন তিরুমূর্তি। যদিও ইউক্রেন সংক্রান্ত এই চুক্তি এখনও কার্যকর হয়নি। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে তিরুমূর্তি স্পষ্টতই জানান, রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের ওএসসিই (অর্গানাইজেশন ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপ)-ভুক্ত দেশগুলিকে নিয়ে গঠিত গোষ্ঠীর আলাপ-আলোচনা হলে তা অবশ্যই স্বাগত জানাবে ভারত। এছাড়াও রাশিয়া, ইউক্রেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের মধ্যে নরম্যান্ডি পর্যায়ের আলোচনারও পক্ষে ভারত। এই কঠিন পরিস্থিতিতে গঠনমূলক কূটনীতিই যে একমাত্র পথ, তা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিরুমূর্তি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেনের ওপর রুশ আক্রমণ দীর্ঘদিন ধরে চললে ভারতের ওপরও এর ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। গোল্ডম্যান স্যাকসের মতে, ইউক্রেন সঙ্কট গত শুক্রবারের বন্ধের তুলনায় মার্কিন স্টককে আরও ৬% নিচুতে ঠেলে দিতে পারে। ইউরোপ এবং জাপানে এর আরও খারাপ প্রভাব পড়বে, এমনটাই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। মার্কিন বাজারের তীব্র পতনের আগুন ভারতীয় বাজারেও পৌঁছচ্ছে। মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে, বিএসই তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলির বাজার মূলধন ৯.১ লক্ষ কোটি টাকা হ্রাস পেয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বাজার স্থিতিশীল পতনের সাক্ষী রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে ভারতীয় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। এছাড়াও ইউক্রেন সংকটের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম সাত বছরের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। মঙ্গলবার অপরিশোধিত তেলের দাম ২.০৩ শতাংশ বেড়েছে, যার পরে দাম ৯৭ ডলারের বেশি পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়বে এবং ১০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকলে তার পুরো প্রভাব পড়বে অভ্যন্তরীণ বাজারে। এর জেরে ভারতে পেট্রোল-ডিজেলের দামে বড়সড় বৃদ্ধি ঘটতে পারে। এলপিজির দামও বাড়বে। সব মিলিয়ে, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের ঘটনার ফল ভুগতে হবে ভারতীয়দেরও।

Leave a Reply

Your email address will not be published.