‘শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’, বিজ্ঞাপন দেখে অবাক বগুড়া

Home বিদেশ-বিভূঁই ‘শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’, বিজ্ঞাপন দেখে অবাক বগুড়া
‘শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’, বিজ্ঞাপন দেখে অবাক বগুড়া

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: গত কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন দেওয়ালে, ইলেকট্রিক খুঁটিতে সাদা এ-ফোর সাইজের কাগজে কালো কালিতে ছাপানো বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়ছিল বগুড়াবাসীর। ব্যস্ততার মধ্যেই যাতায়াতের পথে বিজ্ঞাপনটার ভাষা দেখে অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। আজকালকার দিনে গৃহশিক্ষকতার জন্য অনেকেই বিজ্ঞাপন দেন, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু বগুড়ার আলমগীরের দেওয়া এই গৃহশিক্ষকতার বিজ্ঞাপনে রয়েছে এক অন্যরকম ‘দাবি’। অর্থের বিনিময়ে নয়, বরং দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে গৃহশিক্ষকতা করতে বলে জানিয়েছেন বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর মোঃ আলমগীর কবির।

কবির বিজ্ঞাপনে নিজের পেশা হিসাবে উল্লেখ করেছেন ‘বেকার’ শব্দটি। বগুড়া শহরের জহুরুলনগরের আশেপাশে বিভিন্ন অঞ্চলে প্রথম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের গণিত বাদে সমস্ত বিষয় পড়ানোর জন্য বিজ্ঞাপনটি দিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি স্পষ্টতই উল্লেখ করেছেন, ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর বিনিময়ে তিনি কোনও অর্থ চান না। বরং তাঁর দাবি, সকাল ও দুপুর দু’বেলা তাঁকে ভাত খাওয়াতে হবে।

কিন্তু কেন এইরকম দাবি করেছেন আলমগীর? জানা গিয়েছে, খাবারের কষ্ট থেকেই এই বিজ্ঞাপন দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। গৃহশিক্ষকতা করে তাই দু’বেলা ভাত খেতে চান তিনি, যাতে জঠরের জ্বালা থেকে খানিক মুক্তি পাওয়া যায়। বর্তমানে তাঁর একটিমাত্র টিউশনি রয়েছে। সেখানে রাতে পড়াতে যান তিনি। ‘তারা আগে নাস্তা দিতো। পরে আমি তাদের বলেছি নাস্তার বদলে ভাত খাওয়াতে’, বলছেন আলমগীর।

রাতে ছাত্রের বাড়িতে অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হলেও সকালে ও দুপুরে খাবার জোগাড় করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠছিল তাঁর। একটি টিউশানি করে তিনি পান দেড় হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা দিয়ে হাতখরচ, খাওয়ার খরচ, চাকরির পরীক্ষার ফর্মফিলাপ- সব একসঙ্গে করা হয়ে উঠছিল না তাঁর। সেই কারণেই এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আলমগীর। বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজের বাড়ির আশেপাশে এই মুহূর্তে গৃহশিক্ষকতা করতে চাইছেন তিনি, যাতে তাঁর দু’বেলার ভাতের বন্দোবস্ত হয়ে যায়।

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আলমগীরের। তাঁর বাবার নাম মোঃ কফিলউদ্দিন এবং মায়ের নাম আম্বিয়া বেগম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাঁর বড় ভাই রুহুল আমিন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। স্নাতকোত্তর পাস করেছেন ২০২০ সালে। এরপর থেকে হন্যে হয়ে চাকরির জন্য ঘুরলেও এখনও পর্যন্ত প্রত্যাশামাফিক চাকরি জোটেনি তাঁর। বাধ্য হয়েই পেট ভরানোর জন্য এই বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তিনি। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত থাকার জায়গাও ছিল না তাঁর। ঢাকায় একটি মেসে কোনওরকমে থাকলেও টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। সেই সময় চাকরির কোচিং করাতেন তিনি। তাঁর এক ছাত্রীর বাবা তাঁদের বাড়িতে আলমগীরের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেখানেই এখন থাকেন তিনি। মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা হলেও এখনও দু’বেলা অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি তাঁর। সেই কারণেই এই বিজ্ঞাপন দিয়েছেন তিনি।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় নিজেদের অন্নসংস্থানের জন্য বিভিন্নরকম কাজে ঢুকতে হচ্ছে বাংলাদেশের যুবক-যুবতীদের। শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কাছে এই সময়ে গৃহশিক্ষকতাই উপার্জনের একমাত্র উপায়। কিন্তু গত দু’বছর ধরে করোনাভাইরাসের বাড়বাড়ন্তের কারণে সেই পেশাতেও এখন ভাঁটার টান। কোভিডের প্রকোপে স্কুল-কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে যেখানে পড়াশোনা বিষয়টিই অবহেলিত, সেখানে টিউশান বিষয়টিই বিলাসিতা বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক-অভিভাবিকা। তাছাড়া লকডাউনের জেরে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের আয় কমেছে, সেই কারণে সন্তানদের জন্য বেতন দিয়ে গৃহশিক্ষক-গৃহশিক্ষিকা রাখতে পারছেন না অনেকেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ইতিমধ্যেই ২০২২ সালে প্রকাশিত তাদের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বলেছে, এই বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকট। যদিও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কর্মহীন বেকার যুবক-যুবতীর সংখ্যা কত, সেই পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।

আলমগীরের বিজ্ঞাপনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই অনেকে ফোন করেছেন তাঁকে। কেউ কেউ তাঁকে পোশাক কারখানায় চাকরি করতে বলেছেন। কিন্তু কারখানায় কাজ করতে চান না তিনি। চাকরির ইন্টারভিউ থাকলে কারখানা থেকে ছুটি পাবেন না বলে জানিয়েছেন কবীর। সেই কারণে আপাতত গৃহশিক্ষকতা করতে চান বলেই জানিয়েছেন তিনি।দু-একটি জায়গায় চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছেন কিন্তু এখনও পর্যন্ত চাকরির কোনও খবর আসেনি। ‘আমার পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। আর পারছি না। বেকারত্ব যে কত কষ্টের, তা বলে বোঝাতে পারব না। এই বয়সে বাবার কাছ থেকে টাকা চাইতেও লজ্জা করে। আর পরিবারের যে অবস্থা, আমাকে কিছু দিতেও পারবে না তারা।’ বলছেন হতাশাগ্রস্ত আলমগীর। কিন্তু হাল ছাড়ছেন না তিনি। নিজের উদাহরণ অন্য সকলের লড়াইয়ের প্রেরণা হয়ে উঠুক, এমনটাই বলছেন তিনি। ‘একজন আলমগীর কবির সারা দেশের বেকারদের প্রতিচ্ছবি। আমাকে তো বাঁচতে হবে।’ বলছেন তিনি। কারুর করুণায় নয়, আপাতত নিজের চেষ্টায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার লড়াই চালাচ্ছে বছর চব্বিশের এই তরুণ তুর্কি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.