ভূত চতুর্দশীতে ‘তেনাদের’ কথা: দেখে নিন একটি ক্লিকে

Home ফিচার ভূত চতুর্দশীতে ‘তেনাদের’ কথা: দেখে নিন একটি ক্লিকে
ভূত চতুর্দশীতে ‘তেনাদের’ কথা: দেখে নিন একটি ক্লিকে

অরিজিৎ পাল: আজ ভূতচতুর্দশী। শোনা যায়, আজকের দিনটা নাকি ভূতেদের ‘হলিডে’।সারারাত রাস্তাজুড়ে নেচেকুঁদে, লোককে ভয় দেখিয়ে ভোর হওয়ার পর নাকি নিজেদের আস্তানায় ফেরেন ‘তেনারা।’ চলুন, আজকের এই বিশেষ দিনে জেনে নেওয়া যাক চোদ্দ রকম ভূতেদের সম্পর্কে, যারা বাংলা ও বাঙালীর সঙ্গে, বাংলার চিরাচরিত সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

১)ব্রহ্মদৈত্য: শোনা যায়, বাঙালী ব্রাহ্মণরা যদি অপঘাতে মারা যান, তবে মৃত্যুর পর তাঁরা ব্রহ্মদৈত্য হন। সাদা ধুতি ও খালি গায়ে ধবধবে সাদা পৈতে পরে সাধারণত বেলগাছে আস্তানা গাড়েন ‘এনারা।’ ব্রহ্মদৈত্য পায়ে খড়ম পরে বলেও শোনা যায়। অনেকেই নাকি রাতে ব্রহ্মদৈত্যর খড়মের খটখট আওয়াজ শুনতে পান। সুযোগ বুঝে কোনও নিরীহ মানুষের ঘাড়ে চেপে বসে এরা।

২)মামদো ভূত: ‘মামদো’ শব্দটির উৎপত্তি ‘মহম্মদ’ শব্দ থেকে। ব্রাহ্মণদের অপঘাতে মৃত্যুর পর যেমন তাঁরা ব্রহ্মদৈত্য হন, তেমনই কোন ধর্মপ্রাণ মুসলমান যদি অপঘাতে মারা যান, তবে মৃত্যুর পর তাঁরা হন মামদো ভূত। সুযোগ বুঝে মানুষের ক্ষতি করতে নাকি ওস্তাদ ‘এনারা’। মামদো ভূত লোকের ঘাড়ে চাপলে শোনা যায়, জ্বিন ভর করেছে।

৩) মেছোভূত: কথায় বলে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’।মাছ অত্যন্ত প্রিয় যে কোনও বাঙালির কাছে। মাছপ্রিয় বাঙালির মৃত্যুর পরেও মাছের লোভ ছাড়তে না পারলে মেছোভূত হন। এই ভূত রাত বাড়লে পুকুরের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়। মাঝরাতে কিংবা ভরদুপুরে কেউ পুকুর থেকে মাছ ধরতে বসলে, মাছ কিনে ফিরলে এরা মাছ খাওয়ার আবদার করে। না দিলেই ঘটে বিপদ, ঘাড় মটকে মানুষটিকে মেরে ফেলে এই ভূত।

৪) স্কন্ধকাটা: দুর্ঘটনায় ট্রেনে বা বাসে কোনও ব্যক্তি কাটা পড়লে যদি সেই ব্যক্তির মুণ্ডচ্ছেদ হয়, তাহলে সে স্কন্ধকাটা হয়। ‘স্কন্ধকাটা’ শব্দের অর্থ ‘কাঁধ থেকে কাটা’। এরাও নানারকমভাবে ক্ষতি করার চেষ্টা করে মানুষের। জনশ্রুতি রয়েছে, নিজের কাটা মাথার খোঁজেই এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায় স্কন্ধকাটা আর মানুষকে ভয় দেখায়।

৫)নিশি: রাতের অন্ধকারে যদি কেউ নাম ধরে পরপর দু’বার ডাকে, তাহলে সেই ডাক নিশির। আর সেই নিশির ডাকে সাড়া দিলেই পরিণতি হবে ভয়ঙ্কর। নিশি মানুষকে টেনে নিয়ে যায় বাড়ির বাইরে। বহু মানুষ ঠিক এভাবেই হারিয়ে যায় অন্ধকারে। তবে এর থেকে মুক্তির উপায় রয়েছে। নিশি কখনই দু’বারের বেশি ডাকতে পারে না। তাই কোনও ব্যক্তি তিনবার ডাকলে তবেই ডাকে সাড়া দেওয়া উচিত।

৬) শাঁকচুন্নি: যদি কোন সধবা হিন্দু মহিলা হাতে শাঁখা-পলা পরা অবস্থায় মারা যায়,তবে সে হয় শাঁকচুন্নি। অতৃপ্ত কামনা-বাসনা নিয়ে যদি কোনও মহিলার মৃত্যু হয়, তবে সেই মহিলা শাঁকচুন্নি হয়।জনশ্রুতি রয়েছে, নির্জন মাঠ বা রাস্তা দিয়ে আসা কোনও পুরুষকে হাতছানি দিয়ে ডাকে তারা। আর সেই ডাকে সাড়া দিলেই ঘটে বিপদ।

৭) পেত্নী: পেত্নী হলো মেয়ে-ভূত। সাধারণত কোনও অবিবাহিতা বা বিধবা মেয়ে মৃত্যুর পর পেত্নী হয়। এরা সাধারণত ভীষণ বদমেজাজী হয়। পেত্নী যে কোনও ব্যক্তির চেহারা ধারণ করতে পারে ও ক্ষতি করতে পারে। পেত্নীর পা সাধারণত পিছনের দিকে ঘোরানো থাকে।

৮) গেছোভূত: এরা বিভিন্ন গাছে থাকে। যখন কোনও মানুষ রাস্তা দিয়ে যায়, তখন এরা গাছ থেকে মানুষের ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ও মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা করে।

৯) যক্ষ: যেসব ব্যক্তি সারাজীবন ধরে ধনসম্পত্তি আগলায় এবং টাকাপয়সার লোভ প্রচুর,তারা মৃত্যুর পরও টাকাপয়সার লোভ ছাড়তে পারে না, যক্ষ হয়ে ধনসম্পদের রক্ষক হয়ে থাকে।

১০) পেঁচাপেঁচি: এই ভূত ভয়ঙ্কর দেখতে হয়। শোনা যায়, এরা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। কোনও গর্ভবতী নারীর উপর এদের দৃষ্টি পড়লে গর্ভের সন্তান নষ্ট হয়ে যায়।

১১) একানড়ে: অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র কোনও ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে তারা একানড়ে হয়। এরা মূলত তালগাছে থাকে। গ্রামবাংলায় শিশুদের একানড়ের নাম বলে ভয় দেখানো হয়।

১২) আলেয়া: শীতকালে গ্রামের দিকে মাঠের উপর দিয়ে মাঝে মাঝে হঠাৎই আগুনের গোলা ছুটতে দেখা যায়। শোনা যায়, যে সব ব্যক্তি আগুনে পুড়ে মারা যায়, তারা আলেয়া ভূত হয়। যদিও বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

১৩) কানাভুলো: গন্তব্যস্থলে যাওয়ার পথে রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক সময় পথ হারিয়ে ফেলে বহু মানুষ। এই কাজের পিছনে থাকে কানাভুলো ভূত। তারা মানুষকে রাস্তা ভুলিয়ে দেয় ও মেরে ফেলে।

১৪) জুজু: শোনা যায়, এই ভূত সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে গ্রামের শিশুদের ভয় দেখায়। গ্রামের দিকে ছোট বাচ্চারা যখন বায়না করে, খেতে চায় না, রাতে ঘুমোতে চায় না, তখন জুজুভূতের ভয় দেখিয়ে মায়েরা বাচ্চাদের খাওয়ায় এবং ঘুম পাড়ায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.