‘ওমিক্রন ঢেউয়ের পর ফ্লু হয়ে ফিরবে করোনা ভাইরাস’! ল্যানসেটে প্রকাশিত মার্কিন গবেষকের মতামত

Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ‘ওমিক্রন ঢেউয়ের পর ফ্লু হয়ে ফিরবে করোনা ভাইরাস’! ল্যানসেটে প্রকাশিত মার্কিন গবেষকের মতামত
‘ওমিক্রন ঢেউয়ের পর ফ্লু হয়ে ফিরবে করোনা ভাইরাস’! ল্যানসেটে প্রকাশিত মার্কিন গবেষকের মতামত

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: অতিমারীর আতঙ্ক কাটলেও, এত সহজে বিদায় নিচ্ছে না করোনা ভাইরাস। বরং আগামী মার্চ মাসের মধ্যে গোটা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষের শরীরে, করোনার নতুন প্রজাতি ওমিক্রন কমবেশি থাবা বসাবে। ফলে অতিমারীর আকারে হয়ত নয়, সাধারণ ফ্লু-র মতোই এই ভাইরাস মাঝেমধ্যেই নিজের দৌরাত্ম্য চালাবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি বিখ্যাত মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেট– এ প্রকাশিত হয়েছে এরকমই একটি মতামত।

১৯ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রবন্ধটির রচয়িতা ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষণা কেন্দ্র ‘দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন’-র ডিরেক্টর ক্রিস্টোফার জেএল মুরে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিনে, মুরে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কোভিড ১৯ আবারও ফিরবে, কিন্তু অতিমারীর চেহারায় আর নয়।’

মুরের সংযোজন, ‘এই নজিরবিহীন সংক্রমণের চেহারা দেখে অন্তত একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, ২০২১-এর নভেম্বর থেকে মার্চের শেষাশেষি বিশ্বের ৫০ শতাংশ মানুষ ওমিক্রনে আক্রান্ত হচ্ছেনই।’

মুরে নিজের প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘করোনার সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের আগের প্রজাতিগুলির সংক্রমণের তুলনায়, উপসর্গহীন বা মৃদু উপসর্গযুক্ত ওমিক্রন সংক্রমিতের সংখ্যা যে হারে বেড়েছে, বিপরীতে আক্রান্তদের চিহ্নিতকরণের হারও ২০ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশে নেমেছে।’

এছাড়াও মুরে লক্ষ্য করেছেন, দুনিয়া জুড়ে বর্তমান করোনা পরিস্থিতে, মাস্কের বাড়তে থাকা ব্যবহার, ব্যাপক হারে টিকাকরণ বা বুস্টার ডোজও, অতিমারীর সাম্প্রতিক ঢেউয়ের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারবে না।

দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন– এর গবেষণা অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ জনতার মধ্যে মাস্কের ব্যবহার বাড়লেও, তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা সংক্রমণকে আগামী চারমাসে মাত্র ১০ শতাংশই রুখে দিতে সক্ষম হবে।

উপরন্তু দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত মুরের প্রবন্ধে আরও লেখা হয়েছে, টিকার বুস্টার ডোজই হোক বা অনিচ্ছুকদের টিকাকরণ, তারও কোনও বিশেষ প্রভাব ওমিক্রন ঢেউয়ের উপর পড়বে না। কারণ করোনা টিকার প্রভাব যতদিনে সর্বতোভাবে কার্যকরী হবে, ততদিনে অবশ্য ওমিক্রন নিজের খেলা অনেকটই সাঙ্গ করে ফেলবে।

তবে মুরে একইসঙ্গে জানিয়ে দিয়েছেন, যে সব দেশ ওমিক্রনের দৌলতে করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের মুখোমুখি হয়নি, মাস্কের বর্ধিত ব্যবহার সেই সব দেশকে ওমিক্রনের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ওমিক্রন এত দ্রুত হারে সংক্রমণ ছড়ায় যে কোনও সতর্কতা বা নতুন আরোপিত বিধিনিষেধ আগামী ৪ থেকে ৬ সপ্তাহের মধ্যে এই ভাইরাসের অপ্রতিরোধ্য গতি রোধ করতে পারবে না।

মুরে আরো লিখছেন, ‘অদূর ভবিষ্যতে মানব শরীরের উপরও সার্স-কোভ-২ ভাইরাস বিপজ্জনক হয়ে উঠবে না। কারণ অতিমারীর প্রকোপ কাটিয়ে ওঠার পর স্বাভাবিক নিয়মেই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মানব শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে। এছাড়াও টিকা, প্রয়োজনে আরও উন্নত মানের মাস্ক ব্যবহার বা সামাজিক দূরত্বের মত সতর্কতা অবলম্বনে সচেতনতা কোভিডকে দুর্বল করতে কার্যকরী ভূমিকা নেবে।’

এরপরই মোক্ষম কথাটির উল্লেখ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি লিখছেন, এই চেহারা নিয়েই ভবিষ্যতে ফিরে ফিরে আসবে করোনা। যা নিয়ন্ত্রণে সমাজ এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। উদাহরণ হিসেবে মুরে উল্লেখ করেছেন, ‘ওমিক্রনের সংক্রমণে বিভিন্ন দেশে মৃত্যুর সংখ্যা, আর উত্তর গোলার্ধ্বের একাধিক দেশে ইনফ্লুয়েঞ্জায় মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে কোনও তফাত নেই।’

ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষণা কেন্দ্র দ্য ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন এর ডিরেক্টর  ক্রিস্টোফার জে.এল. মুরে নিজের প্রবন্ধ শেষ করেছেন,  ‘ ওমিক্রন ঢেউয়ের পর, কোভিড-১৯ আবার ফিরে আসবে, কিন্তু কখনওই তা আর অতিমারীর চেহারা নেবে না।’

এদিকে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা নেচার মেডিসিন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। যেখানে দেখা গেছে গবেষণাগারে তৈরি বহু মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিকেই ধোঁকা দিচ্ছে ওমিক্রন। মিসৌরির সেন্ট লুইসে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের বিজ্ঞানীদের নেতৃত্বে এই গবেষণা চালানো হয়েছে।

করোনাভাইরাস-সহ যে কোনও ভাইরাসের সংক্রমণের নির্দিষ্ট সময় পর মানবদেহের স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা বহিরাগত শত্রুকে চিনে নেওয়া ও তার বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে। সংক্রমণের পর স্বাভাবিক ভাবেই হোক বা টিকার মাধ্যমে, মানবশরীরে এই অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়া কিছুটা সময়সাপেক্ষ। যে সময়টা খরচ করতে হয় না মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলি ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মানবশরীরে ঢুকিয়ে দিলে। বহিরাগত শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য মানবদেহ তখন রাতারাতি অ্যান্টিবডি পেয়ে যায়। এই সব মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলি তৈরি করা হয় গবেষণাগারে। এর আগে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের সংক্রমণ রুখতেও মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডির ব্যবহার হয়েছে। তা অনেক ক্ষেত্রে ফলপ্রসূও হয়েছে।

গবেষণায় পর্যবেক্ষণলব্ধ ফল বলছে, ওমিক্রন নিজের স্পাইক প্রোটিনের বিভিন্ন অংশ খুব অল্প সময়ের মধ্যে এত বার বদলে ফেলছে যে, মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলি শত্রুকে চিনতে পারছে না। ফলে, তাকে কোষের ভিতরে ঢুকে পড়তে বাধা দিতে পারছে না। তাই ওমিক্রনের সংক্রমণও অনেক ক্ষেত্রে ভয়াবহ হয়ে উঠছে। যদিও এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে স্বস্তির খবর একটাই, গবেষণাগারেই তৈরি অন্য কয়েকটি মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিকে কিন্তু হারাতে পারছে না ওমিক্রন। সেই মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিগুলি ওমিক্রনকে ঠিকঠাক ভাবে চিনে নিতে পারছে। সেই সব ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের এই নতুন ভেরিয়্যান্ট আর মানব দেহকোষের ভিতরে ঢুকতে পারছে না। সংক্রমণও ভয়াবহ হয়ে উঠছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published.