মায়ের বকুনি, অভিমানে ‘আত্মঘাতী’ বেলদার উচ্চমাধ্যমিক (HS Exam) পরীক্ষার্থী

মায়ের বকুনি, অভিমানে ‘আত্মঘাতী’ বেলদার উচ্চমাধ্যমিক (HS Exam) পরীক্ষার্থী

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: সামনেই ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের উচ্চমাধ্যমিক (HS Exam) পরীক্ষা। বাকি হাতে গোনা আর কয়েকদিন। বর্তমানে অতিমারী পরিস্থিতিও অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে, তাই অফলাইনেই পরীক্ষা হওয়ার কথা জানিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ। সেই কারণেই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়েকে পড়াশুনোয় আরও একটু মনোযোগ দিতে বলেছিলেন বাবা-মা। কিন্তু তারপরও পড়াশুনোয় মনোযোগী হয়নি মেয়েটি। মন দিয়ে পড়াশুনো করার বদলে বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্পেই মজে থাকতো সে।

সময়টা বুধবার সন্ধ্যাবেলা। পড়াশুনো না করায় মায়ের সঙ্গে বচসা শুরু হয়েছিল ১৮ বছর বয়সী সোহিনী জানার। মায়ের কাছে বিস্তর বকুনিও খেয়েছিল সে। আর তারপরই রাগের মাথায় নিজের ঘরে ঢুকে খিল তুলে দিয়েছিল সোহিনী। পরে বহু ডাকাডাকি করেও যখন তার সাড়া পাওয়া গেল না, দরজা ভেঙে দেখা গেল গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা (Suicide) করেছে সে।

পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার বেলদায় ঘটেছে এই ঘটনা। আঠেরো বছরের ফুটফুটে মেয়ের আত্মঘাতী হওয়ার ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন মেয়েটির বাবা-মা সহ পরিবারের সদস্যরা। দেওয়ালে মাথা ঠুকতে ঠুকতে যেন নিজের ‘অপরাধের’ প্রায়শ্চিত্ত করছেন সোহিনীর মা। বারংবার শুধু একটাই প্রশ্ন শোনা যাচ্ছে তাঁর মুখে, ‘সন্তানকে শাসন করা কী পাপ?’

পুলিস সূত্রে জানা গিয়েছে, মৃত উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর (HS Exam) নাম সোহিনী জানা। পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা গঙ্গাধর একাডেমির কলা বিভাগের (Arts) ছাত্রী ছিল সে। বুধবার সন্ধ্যায় বেলদা বাজারে এক গৃহশিক্ষকের কাছে প্রাইভেট টিউশন পড়তে যাওয়ার কথা ছিল সোহিনীর। পড়তে যাওয়ার সময় পেরিয়ে যাচ্ছিল, অথচ সে বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিল। তা দেখেই সোহিনীর মা তাকে পড়তে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেন। কিন্তু তখনও গল্পেই মজে সে। দ্বিতীয়বার তার মা এসে যখন দেখেন সোহিনী প্রাইভেট টিউশনে যায়নি, তখন কড়া ভাষায় সোহিনীকে ভর্ৎসনা করেন তিনি। মাকে পাল্টা জবাবও দেয় সোহিনী। মুখের ওপর তর্ক করায় বন্ধুদের সামনেই মেয়ের গালে একটি চড় মারেন মা। রেগে ঘরে ঢুকে যায় সোহিনী।

মেয়ে এবার টিউশনে যাবে ভেবে মা নিজের কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সোহিনীর মা এবং পিসির খেয়াল হয়, তার ঘর ভেতর থেকে বন্ধ করা। সোহিনীর মায়ের ধারণা হয়, চড় খেয়ে হয়তো অভিমান হয়েছে সোহিনীর। মা এবং পিসি মিলে অনেকক্ষণ ধরে তাকে ডাকাডাকিও করেন। কিন্তু কোনও সাড়া না মেলায় উদ্বিগ হয়ে পড়েন তারা। বাধ্য হয়েই সোহিনীর বাবাকে খবর পাঠানো হয়। সোহিনীর বাবা প্রভাত জানা পেশায় একজন পরিবহন ব্যবসায়ী। খবর পেয়েই সঙ্গে সঙ্গে ছুটে আসেন প্রভাতবাবু। ততক্ষণে প্রতিবেশীদের খবর দিয়েছেন সোহিনীর মা ও পিসি। কয়েকজন প্রতিবেশী এসে জানলার শিক ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখেন একটি শাড়িকে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে বেঁধে আত্মহত্যা করেছে সোহিনী। পরনে রয়েছে টিউশনে যাওয়ার পোশাক। তৎক্ষণাৎ তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বেলদা হাসপাতালে। কিন্তু চিকিৎসকেরা সোহিনীকে মৃত ঘোষণা করেন।

লন্ডনের কিংস কলেজের একটি গবেষণা থেকে জানা গিয়েছে, গত দু’দশকে ভারতবর্ষে কিশোর-কিশোরীদের আত্মঘাতী হওয়ার রেখচিত্রটি ক্রমবর্ধমান। পরীক্ষার মানসিক চাপ, নানারকম সামাজিক চাপ এবং সর্বোপরি বাবা-মায়েদের অত্যাধিক চাহিদা ভারতের কিশোর-কিশোরীদের আত্মহত্যার অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে তারা। অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের আত্মঘাতী হওয়া রুখতে বাবা-মায়েদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে দাবি করা হয়েছে তাদের গবেষণাপত্রে। গবেষণা দলের অন্যতম সদস্য মনোবিদ অ্যাণ্ড্রু জনসন জানিয়েছেন, ‘একদিকে এটি সত্য যে বাবা-মায়ের উপকারী ভূমিকা শিশুদের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু একইভাবে বাবা-মায়ের কিছু ভুল কাজ, ক্ষতিকর কাজ বা কথা তাদের সন্তানের জন্য সারাজীবনের একটা ট্রমা হতে পারে বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই কারণে বাবা-মায়েদের উচিত নিজেদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।’

প্রসঙ্গত, ২০২২ এর উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা (HS Exam) শুরু হবে আগামী ২ এপ্রিল। নতুন সূচি অনুযায়ী ২ এপ্রিল হবে প্রথম ভাষার পরীক্ষা। ৪ এপ্রিল দ্বিতীয় ভাষার, ৫ এপ্রিল স্বাস্থ্যবিদ্যা, অটোমোবাইল, আইটি ও আইটিইস ইত্যাদি ভোকেশনাল বিষয়ের পরীক্ষা হবে। এরপর উপনির্বাচনের কারণে পরের কয়েকদিন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। এরপর ১৬ এপ্রিল গণিত, সাইকোলজি, অ্যান্থ্রোপলজি ও ইতিহাস বিষয়ের, ১৮ এপ্রিল অর্থনীতির, ১৯ এপ্রিল কম্পিউটার সায়েন্স, মডার্ণ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, পরিবেশবিদ্যা, মিউজিক, স্বাস্থ্যবিদ্যা ও ভিজ্যুয়াল আর্টসের, ২০ এপ্রিল কমার্শিয়াল ল, দর্শন ও সমাজবিদ্যার, ২২ এপ্রিল পদার্থবিদ্যা, পুষ্টিবিদ্যা, শিক্ষাবিজ্ঞান ও হিসাবশাস্ত্রের, ২৩ এপ্রিল স্ট্যাটিটিক্স, ভূগোল, হোম ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের, ২৬ এপ্রিল সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন, রসায়নবিদ্যা, সংস্কৃত, পারসি, আরবি ও ফরাসির এবং ২৭ এপ্রিল জীববিদ্যা, বিজনেস স্টাডিজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা হবে।

কোভিডের প্রকোপ যেহেতু এখনও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়নি, সেই কারণে এবার হোম সেন্টারেই হতে চলেছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা (HS Exam)। ২০২০ সালের তুলনায় এই বছর উচ্চমাধ্যমিকের (HS Exam) পরীক্ষাকেন্দ্রও বাড়ানো হয়েছে। মোট পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা ৬৭২৭ টি। প্রতি বছরের মতো এ বছরও পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা মোবাইল থাকলে তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে না। যেদিনগুলিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা (HS Exam) থাকবে, সেদিনগুলিতে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ কিমি পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হবে, এমনটাই জানানো হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পক্ষ থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.