বয়সকে তোয়াক্কা না করে অগস্ত্যকোডাম (Agasthya Koodam) পর্বতের শিখরে পৌঁছলেন বেঙ্গালুরুর (Bangalore) ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা

বয়সকে তোয়াক্কা না করে অগস্ত্যকোডাম (Agasthya Koodam) পর্বতের শিখরে পৌঁছলেন বেঙ্গালুরুর (Bangalore) ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: বয়স যে কেবলমাত্র একটা সংখ্যা, তা বহুবার প্রমাণ করে দিয়েছেন অনেক মানুষ। নানারকম ক্ষেত্রে বৃদ্ধ বয়সে নজির গড়েছেন বহু কৃতী ব্যক্তি। বয়স যে কোনও বাধাই নয়, এবার তা প্রমাণ করলেন বেঙ্গালুরুর (Bangalore) ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধা। ৬২ বছর বয়সে জয় করলেন তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। অগস্ত্যকোডাম (Agasthya Koodam) পর্বতমালার শিখরে তিনি পৌঁছোলেন প্রবল মনের জোর ও অসীম সাহসে। এই কৃতিত্ব নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। অজানাকে জানা আর অচেনাকে চেনার কী অসীম আগ্রহ তার অন্যতম উদাহরণ হলেন এই বৃদ্ধা।

স্থানীয়দের কাছে এই বৃদ্ধা পরিচিত ‘নাগারাতনাম্মা’ (Nagaratnamma) নামে। জানা গিয়েছে, ১৯৬০ সালে বেঙ্গালুরু শহরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। খুবই অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাঁর। গ্রহণ করতে হয় নানারকম সাংসারিক দায়ভার। আর পাঁচজনের মতোই দৈনন্দিন জীবন কাটছিলো এই বৃদ্ধার। কিন্তু তাঁর শখ ছিলো অন্যরকম। প্রাত্যাহিক জীবন অতিবাহিত করলেও তাঁর মনের মধ্যে বাসা বেঁধেছিল পাহাড়চূড়ায় ওঠার প্রবল আগ্রহ। বুড়ো বয়সেও পর্বতশৃঙ্গে ওঠার অসীম ইচ্ছা হারিয়ে ফেলেননি তিনি। বিবাহের চল্লিশ বছর পরেও তাঁর এমন অনেকরকম অপূর্ণ ইচ্ছা ছিল, যা পূরণ করার সাধ জাগতো তাঁর। একজন মা হিসাবে সন্তানদের মানুষ করা থেকে শুরু করে সংসারের প্রত্যেক মানুষের যাবতীয় প্রয়োজন মেটানো, গত চল্লিশ বছরে সব দায়িত্বই হাসিমুখে পালন করেছেন তিনি। সন্তান সন্ততিরা যখন নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত, তখন নিজের জন্য খানিক সময় বের করলেন নাগারাতনাম্মা। যে বাসনা তিনি নিজের মনের এক কোণে যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন, এবার তা পূরণ করার তোড়জোড় শুরু করলেন তিনি।নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে তিনি বেরিয়ে পড়লেন তামিলনাড়ুর দ্বিতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ অগস্ত্যকোডামের উদ্দেশে।

অগস্ত্যকোডাম শৃঙ্গটি পশ্চিমঘাট (Western Ghat) পর্বতের সহাদ্রি (Sahyadri) পর্বতমালার অন্তর্গত অন্যতম সর্বোচ্চ একটি শৃঙ্গ। পাশাপাশি, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পর্বতমালার এই শৃঙ্গটিতে আরোহণ করা যথেষ্ট কষ্টকর এবং পরিশ্রমসাধ্যও বটে। কিন্তু নাগারাতনাম্মার অভিধানে বোধহয় দুঃসাধ্য বা অভিধান বলে কোনও শব্দ নেই। পর্বতশৃঙ্গ জয় করার ধনুকভাঙা পণ নিয়েছিলেন তিনি। সেই লক্ষ্যে তিনি বেরিয়ে পড়েছিলেন তাঁর ছেলে ও ছেলের বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। এর আগে বেশ কিছু ছোটখাটো সফর করলেও নিজের রাজ্য কর্নাটকের বাইরে এটিই ছিল তাঁর প্রথম অভিযান। বেঙ্গালুরু শহর থেকে যাত্রা শুরু করেন নাগারাতনাম্মারা। ক্রমশ তাঁরা এগোতে থাকেন গন্তব্যের উদ্দেশে।

অবশেষে সমস্ত রকম প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে সামান্য একটি দড়িতে ভর করে ধাপে ধাপে অগস্ত্যকোডাম পর্বতমালার চূড়ায় পৌঁছেছেন তাঁরা। সেই পর্বতারোহণের ভিডিও ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন বিষ্ণু নামক জনৈক ব্যক্তি। ভিডিওটিতে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, বহু বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে পর্বত জয়ের পর ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধার চোখে মুখে শৃঙ্গজয়ের উন্মাদনা। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখে সমগ্র বিশ্ব বৃদ্ধার এই জীবনী শক্তিকে কুর্নিশ জানাচ্ছে। নেটিজেনরাও বৃদ্ধার এই মানসিক শক্তিকে ভরিয়ে দিয়েছেন প্রশংসায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও সকল মানুষের অজস্র ভালোবাসা কুড়িয়েছে। সকলেই বেঙ্গালুরুর এই বৃদ্ধার অপরিসীম ইচ্ছাশক্তিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। নেটিজেনদের প্রার্থনা, নাগারাতনাম্মা এভাবেই তাঁর স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলুন।

প্রসঙ্গত, এর আগেও বহু ভারতীয় মহিলা সমস্তরকম বাধা পেরিয়ে নানা পর্বতশৃঙ্গ জয় করেছেন। ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেন বাচেন্দ্রী পাল। উত্তরাখণ্ডের নাকুরি গ্রামের বাসিন্দা বাচেন্দ্রী ১৯৮৪ সালে এই বিরল কৃতিত্ব অর্জন করেন। এছাড়াও গতবছর পৃথিবীর দশম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট অন্নপূর্ণা জয় করেছিলেন প্রিয়াঙ্কা মোহিতে। মহারাষ্ট্রের সাতারা অঞ্চলের বাসিন্দা তিনি। মাত্র ২৮ বছর বয়সে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি। কিন্তু ষাট বছরের অধিক বয়সে পর্বতারোহণের কৃতিত্ব বোধহয় ভারতবর্ষে কারুরই নেই। এদিক থেকে নাগারাতনাম্মার এই কৃতিত্ব সত্যিই প্রশংসনীয়।

নাগারাতনাম্মা অগস্ত্যকোডাম পর্বতের শিখরে পোঁছে ছিলেন ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। এই পর্বতটির ভৌগোলিক অবস্থান তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলায়। পর্বতশৃঙ্গটি ভারতবর্ষের তামিলনাড়ু ও কেরল এই দু’টি রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত এবং অগস্ত্যমালা বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভের (Agasthyamala Biosphere Reserve) একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রসঙ্গত, অগস্ত্যমালা বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ হল ২০১৬ সালে ইউনেস্কো (UNESCO) দ্বারা নথিভুক্ত ২০টি নতুন অঞ্চলের মধ্যে একটি। অগস্ত্যকোডাম পর্বতের ট্রেকিংয়ের সম্পূর্ণ গতিপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ নাগারাতনাম্মা অতিক্রম করেছেন তাঁর হার না মানা মনোবলকে সঙ্গী করে। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয়, পর্বতে ওঠার সময় পর্বতারোহীরা যে পেশাদারি পোশাক পরেন, সেরকম কোনও পোশাক নাগারাতনাম্মার পরনে ছিল না। তিনি পরেছিলেন হালকা সবুজ রঙের একটি শাড়ি। ভারতীয় মহিলাদের চিরন্তন এই পোশাকেই অদম্য জেদ ও প্রবল মানসিক দৃঢ়তার জেরে অনায়াসে নিজের স্বপ্ন সফল করেন তিনি। ভবিষ্যতে বয়সকে কোনওরকম পাত্তা না দিয়ে এর থেকেও কঠিন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করবেন নাগারাতনাম্মা, এমনই প্রত্যয় সকল ভারতবাসীর।

Leave a Reply

Your email address will not be published.