শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে ভালো ফলের আশায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী (HS Exam) মুজিবুর

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে ভালো ফলের আশায় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী (HS Exam) মুজিবুর

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ভালো করে হাঁটতে পারে না সে। কোমর থেকে পা পর্যন্ত শরীরের অঙ্গগুলি কোনও কাজ করে না। তবুও সে অটল, নির্ভীক, প্রত্যয়ী। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে (Physically Challanged) কোনওরকম তোয়াক্কা না করে পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করতে উদ্যোগী চন্দ্রকোণা কৃষ্ণপুর রহমানিয়া হাইস্কুলের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী (HS Exam) মুজিবুর সরকার।

পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কখনও নিজের ট্রাইসাইকেল বা কখনও বাবার কোলে চড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসছে সে। এখনও পর্যন্ত উচ্চমাধ্যমিকের (HS Exam) সবকটি পরীক্ষাই ভালো হয়েছে, এমনটাই জানাল মফিজুর । আগামীদিনে বাকি পরীক্ষাগুলিও ভালো হবে, এমন আশাতেই বুক বাঁধছে সে।

মুজিবুরের মুখ থেকেই শোনা গেল তার লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার চন্দ্রকোণা ২ ব্লকের কৃষ্ণপুর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র সে। মাত্র দশ বছর বয়স থেকে প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গে করেই মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে আসছে মুজিবুর। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালোভাবেই উত্তীর্ণ হয়েছে সে। প্রথম বিভাগে পাস করেছিল মুজিবুর। এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় (HS Exam) ভালো ফল করে পরবর্তীকালে সরকারি চাকরি (Government Job) করবে, এমনটাই ইচ্ছা তার। স্কুলের সমস্ত শিক্ষক থেকে শুরু করে এলাকার সমস্ত মানুষও চান, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করুক মুজিবুর।

চন্দ্রকোণা দু’নম্বর ব্লকের ভগবন্তপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের কৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা ওহিদুর সরকার। তিনি পেশায় দিনমজুর। প্রবল আর্থিক অনটনের মধ্যে দিয়ে কোনওরকমে চলে তাঁদের সংসার। মুজিবুর সরকার ওহিদুরের মেজ ছেলে। জন্মের কয়েক বছর পর হঠাৎ শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয় মুজিবুরের। ভালো চিকিৎসকের পরামর্শও নেওয়া হয়। বাবা-মায়ের পাশাপাশি এলাকাবাসীও মজিবুরের শারীরিক উন্নতির জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সুস্থ হয়নি সে। ধীরে ধীরে শরীরের অধিকাংশ অংশ তার অচল হয়ে পড়ে। কোমর থেকে পা পর্যন্ত একেবারে নড়াচড়া করতে পারে না সে। সব মিলিয়ে ১০০ শতাংশ প্রতিবন্ধীই বলা চলে তাকে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে রেখে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো ফল করার স্বপ্ন দেখছে সে। মুজিবুরের আশা, চাকরি করে বাবা-মায়ের দুঃখ-দুর্দশা দূর করবে সে।

আর্থিক সমস্যার কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার (HS Exam) জন্য প্রাইভেট টিউশন নিতে পারেনি মুজিবুর। স্কুলের শিক্ষকরাই তাকে পড়া দেখিয়ে দিতেন। লেখাপড়া সংক্রান্ত যে কোনও সমস্যায় তাকে সাহায্য করতেন শিক্ষকেরা। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মুজিবুর ভালো ফল করবেই, আশাবাদী কৃষ্ণপুর রহমানিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা।

প্রসঙ্গত, গত ২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে ২০২২ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা (HS Exam)। গত বছর করোনা অতিমারির কারণে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। একাদশ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল ও দ্বাদশ শ্রেণির অন্তর্বর্তী মূল্যায়নের ফলাফল যোগ করে একটি নির্দিষ্ট নিয়মে নম্বর দেওয়া হয়েছিল উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের।

এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার (HS Exam) প্রশ্নপত্রেও বদল আনা হবে জানিয়েছিল সংসদ। মূলত পরীক্ষায় নকল আটকাতে উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নপত্রে বদল ঘটানো হতে চলেছে বলে জানিয়েছিল তারা। প্রতি বছরই উচ্চমাধ্যমিকে পরীক্ষার্থীদের ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস, উত্তর নকল ইত্যাদি সম্পর্কিত নানা বিষয় প্রকাশ্যে আসে। এবার তা আটকাতে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদ জানিয়েছে, পরীক্ষার সময় বিভিন্ন বিষয়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ওপর থাকবে একাধিক সেট। যাতে পরীক্ষায় নকল আটকানো সম্ভব হয়। যদি কোনও কারণে উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে, তবে সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন পাল্টে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে তারা। তবে পরীক্ষা শুরুর আগে কোনওভাবেই জানা যাবে না, কোন প্রশ্নে পরীক্ষা হবে। একেবারে শেষ মুহূর্তে জানা যাবে, কোন প্রশ্নে পরীক্ষা হবে। সংসদের এই নির্দেশানুযায়ী গত দু’দিন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষাও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে বলে জানাা গিয়েছে।

গত ২ এপ্রিল উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম ভাষার পরীক্ষা হয়েছে। ৪ এপ্রিল হয়েছে দ্বিতীয় ভাষার পরীক্ষা। আজ ৫ এপ্রিল স্বাস্থ্যবিদ্যা, অটোমোবাইল, আইটি ও আইটিইস ইত্যাদি ভোকেশনাল বিষয়ের পরীক্ষা হবে। এরপর আসানসোল লোকসভা কেন্দ্র ও বালিগঞ্জ বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচনের কারণে পরের কয়েকদিন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। এরপর ১৬ এপ্রিল গণিত, সাইকোলজি, অ্যান্থ্রোপলজি ও ইতিহাস বিষয়ের, ১৮ এপ্রিল অর্থনীতির, ১৯ এপ্রিল কম্পিউটার সায়েন্স, মডার্ণ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশন, পরিবেশবিদ্যা, মিউজিক, স্বাস্থ্যবিদ্যা ও ভিজ্যুয়াল আর্টসের, ২০ এপ্রিল কমার্শিয়াল ল, দর্শন ও সমাজবিদ্যার, ২২ এপ্রিল পদার্থবিদ্যা, পুষ্টিবিদ্যা, শিক্ষাবিজ্ঞান ও হিসাবশাস্ত্রের, ২৩ এপ্রিল স্ট্যাটিটিক্স, ভূগোল, হোম ম্যানেজমেন্ট বিষয়ের, ২৬ এপ্রিল সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন, রসায়নবিদ্যা, সংস্কৃত, পারসি, আরবি ও ফরাসির এবং ২৭ এপ্রিল জীববিদ্যা, বিজনেস স্টাডিজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা হবে।

কোভিডের প্রকোপ যেহেতু এখনও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়ে যায়নি, সেই কারণে এবার হোম সেন্টারেই হতে চলেছে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা। ২০২০ সালের তুলনায় এই বছর উচ্চমাধ্যমিকের পরীক্ষাকেন্দ্রও বাড়ানো হয়েছে। মোট পরীক্ষাকেন্দ্রের সংখ্যা ৬৭২৭ টি। প্রতি বছরের মতো এ বছরও পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইস বা মোবাইল থাকলে তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হবে না। যেদিনগুলিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা থাকবে, সেদিনগুলিতে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে ১০০ কিমি পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হবে, এমনটাই জানানো হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের পক্ষ থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.