পদ্মশ্রী পেলেন অসামরিক কলায় দক্ষ ৯৩ বছরের শঙ্করানারায়ণা

Home দেশের মাটি পদ্মশ্রী পেলেন অসামরিক কলায় দক্ষ ৯৩ বছরের শঙ্করানারায়ণা
পদ্মশ্রী পেলেন অসামরিক কলায় দক্ষ ৯৩ বছরের শঙ্করানারায়ণা

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: বয়স নব্বইয়ের কোঠা পেরিয়েছে। কিন্তু কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও পরিশ্রম দেখে তা বোঝার উপায় নেই। অশীতিপর বৃদ্ধ এখনও প্রবল কর্তব্যপরায়ণ তাঁর কাজের প্রতি। আর সেই কারণেই এই বছর তাঁর ভাগ্যে জুটলো কেন্দ্রীয় সরকারের পদ্মশ্রী সম্মাননা। প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন কেরলের বৃদ্ধ শঙ্করনারায়ণা মেনন পেলেন এই পুরস্কার।

পদ্মশ্রী সম্মাননার ক্রীড়া বিভাগের জন্য মনোনীত হয়েছেন তিনি। কেরলের থ্রিসুর জেলার বাসিন্দা এই ব্যক্তি ‘কালারি’ শিল্পকলায় দক্ষ। এই ‘কালারি’ বা ‘কালারিপায়াত্তু’ হল কেরলের সুপ্রাচীন এক অসামরিক শিল্পকলা যা প্রায় ৩ হাজারের বছরেরও বেশি পুরনো। ভারতবর্ষের ইতিহাসে সবথেকে বেশিদিন ধরে টিকে থাকা মার্শাল আর্ট এটি। জনশ্রুতি রয়েছে, এর প্রবক্তা স্বয়ং পরশুরাম। পুরাণ অনুসারে, পরশুরাম শিবের কাছ থেকে এই শিল্প শিখেছিলেন। পূর্বে কেরল ছিল সমুদ্রের তলায়। মনে করা হয়, কেরলকে সমুদ্রের তলা থেকে ওপরে আনার পর পরশুরাম কেরলের আদিবাসীদের এই শিল্পকলা শিখিয়েছিলেন। বেশিরভাগ মার্শাল আর্টের মতো কালারিপায়াত্তু হিন্দুধর্ম দ্বারা অনুপ্রাণিত। এতে হিন্দু আচার ও দর্শনও রয়েছে। প্রাচীন এই শিল্পটি প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসা পাঠ্য আয়ুর্বেদশাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করেও গড়ে উঠেছে। কালারিপায়াত্তুর অনুশীলন বিশ্বের অন্যান্য মার্শাল আর্ট থেকে পৃথক, কারণ এখানে অস্ত্রভিত্তিক কৌশলগুলি প্রথমে শেখানো হয় এবং খালি হাতের কৌশলগুলি পরে শেখানো হয়।

শঙ্করানারায়ণা ৬ বছর বয়সে তাঁর পিতার কাছ থেকে এই শিল্পকলার পাঠ নেন। ধীরে ধীরে কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি এই বিষয়ে দক্ষ হয়ে ওঠেন। এখনও তিনি এই কালারি শিল্পকলার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে শতাধিক ছাত্রছাত্রীকে তিনি নিজে অনুশীলন করান। মেননের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি পরিচিত ‘উন্নি গুরুক্কল’ নামে। কেরল ও তার সংলগ্ন হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে তাঁর।

উল্লেখ্য, মেননের জন্ম ১৯২৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কেরলের থ্রিসুর জেলার চাভাক্কাড় অঞ্চলে। তাঁর পরিবারের সদস্যদের অনেকেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাশাপাশি তাঁরা রাষ্ট্রের সুরক্ষার স্বার্থেও কাজ করেছেন বহু বছর। সেই সূত্রেই মেননের এই অসামরিক শিল্পকলার প্রতি আগ্রহ জন্মায়। ১৯৫৭ সালে মেননের পরিবারের উদ্যোগে চাভাক্কাড় অঞ্চলে ‘বল্লভট্ট কালারি’ শিল্পকলার প্রতিষ্ঠা হয়। ‘বল্লভট্ট কালারি’ হল এক অসামরিক রণকৌশল যা মূলত শারীরিক কসরতের দ্বারা প্রদর্শিত হয়। বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও তার ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি শরীর নিরাময়ের কৌশলও শেখানো হয় এক্ষেত্রে।

কালারিপায়াত্তুতে প্রতিটি প্রশিক্ষণের আগে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে কালারি মন্দিরে শিবের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাতে হয়। যে মাটিতে তারা অনুশীলন করে, সেই মাটি দিয়ে তারা শিবের মূর্তির কপালে ‘তিলক’ বা ‘টিক্কা’ লাগায়। কালারিপাত্তুতে ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী পোষাক হলো ‘কাচাকেটাল’। এই পোষাক দু’ধরনের হয়ে থাকে-লাল ও সাদা রঙের এবং লাল ও কালো রঙের। কালারি অনুশীলনকারীদের ঐতিহ্যবাহী এই পোষাক পরে গুরু বা ‘গুরুক্কলের’ কাছে আসতে হয়। প্রশিক্ষণের সময় গুরুক্কল সংস্কৃত বা মালয়ালম ভাষায় শিক্ষার্থীদের মৌখিক আদেশ দেন, যা ‘বৈঠারি’ নামে পরিচিত।

কালারি চর্চাকারীদের মধ্যে কালায়িপাত্তুর দুটি রীতি স্বীকৃত। এই দুটি শৈলী ‘ওয়াজি’ নামে পরিচিত। মালয়ালম ভাষায় ‘ওয়াজি’ শব্দের অর্থ ‘পথ’। কালারিপাত্তুর মধ্যে বিভিন্নরকম ‘ওয়াজি’ রয়েছে, যেমন ‘হনুমান ওয়াজি’, ‘বালি ওয়াজি’, ‘ভীম ওয়াজি’ ইত্যাদি। পৌরাণিক এই চরিত্রগুলি নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতেন, তাই তাঁদের নামেই কালারির বিভিন্ন শৈলীর নামকরণ হয়েছে। যেমন ‘হনুমান ওয়াজি’ এমন একটি শৈলী যা গতি এবং প্রযুক্তিগত প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। ‘বালি ওয়াজি’-র মাধ্যমে প্রতিপক্ষ যে পদ্ধতি অবলম্বন করে আক্রমণ করে, সেই কৌশলেই শত্রুপক্ষকে পরাস্ত করার ওপর গুরুত্ব আরোপিত হয়। সেই কৌশল এমনভাবে প্রয়োগ করতে হয়, যাতে তা প্রতিপক্ষের কাছেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ‘ভীমন ওয়াজি’-র ক্ষেত্রে আবার শারীরিক শক্তির ব্যবহার প্রাধান্য পায়। কালারিপাত্তু যোদ্ধাদের সবসময় নজরে রাখতে হয় শত্রুপক্ষের কার্যকলাপের ওপর। প্রয়োজনে কালারি অনুশীলনকারীদের প্রতিপক্ষের কাছ থেকেও রণকৌশল শিখতে হতে পারে, এমনটাই মনে করেন গুরুক্কলরা।

শঙ্করনারায়ণা মেননের অধ্যবসায় ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় বর্তমানে এই কালারি শিল্প কেরল ছাড়িয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় প্রশংসিত হচ্ছে। ভারতের বাইরেও বেলজিয়াম, ফ্রান্স, শ্রীলঙ্কা সহ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের বহু জায়গায় এই শিল্পকলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। মেননের উত্তরসূরী ১৭ জন ‘বল্লভট্ট কালারি’ শিল্পী এই প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। শিক্ষানবিশদের সংখ্যা নেহাত কম নয়, প্রায় ৫ হাজার। যার মধ্যে ১০০ ও বেশি ছাত্রছাত্রীকে মেনন নিজের হাতে তৈরি করেছেন।

প্রজাতন্ত্র দিবসের দিন সকালে অন্যান্য দিনের মতোই ভোর পাঁচটায় ঘুম ভেঙেছিল তাঁর।পুকুরে স্নান করে, বাড়ির কাছের একটি মন্দিরে পুজো দিয়ে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন কালারি শেখানোর মাঠে। মঙ্গলবার রাতে তাঁর পদ্মশ্রী প্রাপ্তির ঘোষণা যে তাঁর প্রাত্যাহিক জীবনে কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি, তা বোঝা গিয়েছিল তখনই। যদিও মেনন জানিয়েছেন, এই সম্মান পেয়ে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। পাশাপাশি তাঁর এই কৃতিত্বের জন্য তাঁর পরিবার ও শিক্ষকদের তিনি ধন্যবাদ জানান। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, আজীবন তিনি এই শিল্পকলার পরম্পরা বয়ে নিয়ে যাবেন। ‘আমি অত্যন্ত খুশি কেন্দ্রীয় সরকার আমাকে এই সম্মাননার যোগ্য মনে করেছেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। যতদিন বাঁচবো, আমি আমার শিক্ষার্থীদের শিখিয়ে যাবো। এটাই আমার কাজ’, বলছেন ৯৩-এর এই ‘তরুণ’।

Leave a Reply

Your email address will not be published.