তপসিলি মহিলাকে মন্দিরে ঢুকতে বাধা, অভিযুক্ত তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) চিদাম্বরম নটরাজ মন্দিরের ২০ জন পুরোহিত

তপসিলি মহিলাকে মন্দিরে ঢুকতে বাধা, অভিযুক্ত তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) চিদাম্বরম নটরাজ মন্দিরের ২০ জন পুরোহিত

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: উদ্দেশ্য ছিল তপসিলি জাতির এক মহিলার মন্দিরে প্রবেশাধিকার বন্ধ করা। আর তা করতে গিয়েই রীতিমতো নিগ্রহ করা হল জয়াশীলা (Jayasheela) নামের এক মহিলাকে। এই ঘটনার সাক্ষী তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) চিদাম্বরম নটরাজ মন্দির (Chidambaram Nataraja Temple)। ওই মহিলাকে রীতিমতো হুমকি দিয়ে মন্দির থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। মন্দিরের পুরোহিত ও ধর্মযাজকদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেছেন জয়াশীলা। যার ভিত্তিতে চিদাম্বরম মন্দিরের ২০ জন পুরোহিতের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। জানা যাচ্ছে, ভারতীয় সংবিধানের তপসিলি জাতি ও তপসিলি উপজাতি সংক্রান্ত নৃশংসতা প্রতিরোধক আইন, ১৯৮৯ (Caste and Scheduled Tribe Act, 1989) (Prevention of Atrocities) অনুযায়ী এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) চিদাম্বরম নটরাজ মন্দির হল একটি হিন্দু মন্দির যা থিল্লাই নটরাজ মন্দির (Thillai Nataraja Temple) নামেও পরিচিত। ভগবান শিবের (Shiva) অবতার নটরাজকে (Nataraja) উৎসর্গ করে এই মন্দির নির্মিত। মূলত নৃত্যের দেবতা হিসেবেই মানা হয় নটরাজকে। সেই নটরাজ মন্দিরে কোনও মহিলা বিশেষত তপসিলি উপজাতি অধ্যুষিত কোনও ব্যক্তির প্রবেশ মানতে পারেননি পুরোহিতরা। ফলত তা ঠেকাতে রীতিমতো চুরির অভিযোগ এনে মন্দিরে ঢুকতে চাওয়া ওই মহিলাকে হেনস্থা করার অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন জয়াশীলা নামের এক তপসিলি মহিলা নটরাজ মন্দির দর্শনে এসেছিলেন। এই মন্দিরের ভিতরে একটি মঞ্চ রয়েছে যেটিকে ‘কানাগাসাবাই মেডাই’ (Kanagasabai Medai) বলা হয়। এই মঞ্চটি প্রধানত মন্দিরের পুরোহিতদেরই ব্যবহারের অধিকার রয়েছে। প্রসঙ্গত, চিদাম্বরম নটরাজ মন্দিরের পুরোহিতরা স্থানীয় ভাবে ‘দীক্ষিতর’ (Dhiskhitar) নামে পরিচিত। এই দীক্ষিতরদের মেডাই মঞ্চে উপস্থিত থেকে নটরাজের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করার রেওয়াজ রয়েছে। ঘটনার দিন জয়াশীলা ওই মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করে পুরোহিতদের জন্য নির্ধারিত মঞ্চে ওঠার চেষ্টা করেন। সেই সময় সিড়ি বেয়ে উঠতে গেলেই মন্দিরের পুরোহিতরা তাঁকে ঘিরে ফেলেন এবং রীতিমতো চিৎকার করতে থাকেন। পরিস্থিতি ক্রমশই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং মন্দিরে উপস্থিত বেশ কিছু মানুষ এই ঘটনার ভিডিয়ো রেকর্ড করতে শুরু করেন। সেই রকমই বেশ কিছু ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। ভিডিয়োগুলিতে দেখা যাচ্ছে, মন্দিরের এক পুরোহিত জয়াশীলার হাত ধরে তাঁকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছেন। তখন ওই মহিলা বাধা দিতে গেলে তাঁর ওপর চূড়ান্ত খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে, এমনটাই স্পষ্ট ওই ভিডিয়োতে। ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয় স্থানীয় পুলিস। শেষমেশ পুলিসের হস্তক্ষেপেই অবশেষে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

এত কিছুর পরেও কিন্তু দমে যাননি জয়াশীলা। থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে রীতিমতো হুমকি দেওয়া হয়েছে যাতে তিনি মন্দিরের ওই নির্দিষ্ট স্থানে না যান। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মন্দিরের পুরোহিতরা তাঁর বিরুদ্ধে পুজোর জন্য ব্যবহৃত কিছু সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ তুলেছেন। যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিশ্বাস করতে অবাক লাগে, কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি কতটা বিদ্বেষ থাকলে এমন আচরণ করা সম্ভব। তিনি মহিলা হতে পারেন, হতে পারেন জাতিগত দিক থেকে নিম্ন শ্রেণীর। তা সত্ত্বেও এই অসম্মান কি তাঁর প্রাপ্য?

এই মন্দিরে এমন ঘটনা নতুন হয়। অতীতেও এর নজির রয়েছে। এর আগে গণেশ (Ganesh) নামের একজন দীক্ষিতরকে এই ভাবেই মন্দির থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর অপরাধ তিনিও মন্দিরের ওই মেডাই মঞ্চে উঠে নটরাজের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করতে চেয়েছিলেন। ঘটনাচক্রে, তিনিও ছিলেন সমাজের নিম্ন শ্রেণীর। তাই পুরোহিত হওয়া সত্ত্বেও শ্রেণী বিভাজনের দোহাই দিয়ে তাঁকে প্রার্থনা করার অনুমতি দেয়নি মন্দির কমিটি। শুধুমাত্র বাধা দেওয়াতেই বিরত থাকেননি তাঁরা, গণেশের ‘অন্যায্য’ দাবির মাশুল হিসেবে মন্দিরে প্রবেশের অধিকারও হারিয়েছিলেন তিনি।

গণেশের আরও দাবি, তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) এই মন্দিরে এই ধরনের অনিয়মিত এবং আপত্তিকর কার্যকলাপ চলতেই থাকে। তা দেখেও মন্দির পরিচালনা কমিটি নির্বিকার এবং কোনও রকম ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ। প্রসঙ্গত, বর্তমানে এই মন্দিরটি পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় হিন্দুধর্ম ও সেবামূলক পরিসেবা প্রদানকারী একটি সংস্থা (Hindu Religious and Charitable Endowment Department)। যেটি আগে এআইএডিএমকে (AIADMK) সরকারের অধীনে ছিল বলে জানা যাচ্ছে। অতএব এই ধরনের ঘটনায় যে মন্দির পরিচালন কমিটির (Trustee Board) মদত রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। তবে ২০ জন পুরোহিতকে যে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে তাতে কিছুটা হলেও অন্যান্য সেবায়েতরা সতর্ক হবেন বলে আশা করা যায়। কারণ, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও সমাজের পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর ওপর ধর্মযাজকদের এই ধরনের আক্রমণ একেবারেই প্রত্যাশিত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.