দেশ-বিদ্বেষ! হিজাব কাণ্ডে প্রতিবাদী মুসলিম ছাত্রীদের ফোন নম্বর-ঠিকানা ফাঁস করল উদুপির কলেজ?

Home দেশের মাটি দেশ-বিদ্বেষ! হিজাব কাণ্ডে প্রতিবাদী মুসলিম ছাত্রীদের ফোন নম্বর-ঠিকানা ফাঁস করল উদুপির কলেজ?
দেশ-বিদ্বেষ! হিজাব কাণ্ডে প্রতিবাদী মুসলিম ছাত্রীদের ফোন নম্বর-ঠিকানা ফাঁস করল উদুপির কলেজ?

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: আলিয়া আসাদি। বুধবার থেকেই অশ্রাব্য ভাষায় ফোন আসছে ১৭ বছরের এই কিশোরী কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে জানতে পারে তার ফোন নম্বর, বাড়ির ঠিকানা, বাবা-মায়ের নামের মতো সব ব্যক্তিগত তথ্যই ফাঁস হয়ে গেছে। উদুপিতে দৌরাত্ম্য চালানো দলেরই হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে শেয়ার হয়ে গেছে এ সবকিছুই।

আলিয়া আসাদি উদুপির সরকারি প্রি-ইউনিভার্সিটি গার্লস কলেজের ছাত্রী। এখন তার এই পরিচয়টুকুই যথেষ্ট নয়। আলিয়া সেই ছ’জন ছাত্রীর একজন, যারা কর্নাটকের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করার দাবিতে প্রতিবাদের পুরোভাগে ছিলেন।

একটি জাতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বুধবার প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকেই এই ছয় ছাত্রীর অ্যাডমিশন ফর্ম ফাঁস হয়ে যায় বলে সন্দেহ। ওই সংবাদ মাধ্যমের হাতে সেই অনলাইন মেসেজটিও হাতে আসে যেখানে আলিয়া ও তার পাঁচ বান্ধবীর নামের সঙ্গে তাদের ছবি দেখিয়ে চিনিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

মেসেজটি ছিল একটি পিডিএফ ডকুমেন্টের মধ্যে থাকা ওই ছাত্রীদের অ্যাডমিশন ফর্মের স্ক্যান করা কপি। কলেজের লেজারে রাখা এই ফর্মগুলির স্ক্যান করা থেকে একটা বিষয় নিশ্চিত হয় যে, সর্ষের মধ্যেই রয়েছে ভূত। ছয় মুসলিম ছাত্রীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে কলেজের ভিতর থেকেই।

পদাধিকার বলে ওই কলেজের ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হলেন উদুপিরই বিজেপি বিধায়ক রঘুপতি ভাট। গত ডিসেম্বরে, হিজাব বিতর্কের শুরু থেকেই ভাট বলে আসছেন, ক্লাসরুমের ভিতর ছাত্রীদের হিজাব পড়া চলবে না। অন্যদিকে আলিয়ারা দাবি করছে, অ্যাডমিশনের সময় একমাত্র কলেজ কর্তৃপক্ষের হাতেই তাঁরা নিজেদের নথি তুলে দিয়েছিলেন। ফলে কোন অঙ্গুলি হেলনে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, আলিয়াদের কাছে সেই অঙ্কটা খুব একটা কঠিন নয়।

প্রতিবেদক যখন আলিয়ার সঙ্গে কথা বলতে তার বাড়ি পৌঁছন, তখন অন্যান্য সময়ের মতো শুধু হিজাবে মুখ নয়, আগাগোড়া বোরখায় নিজেকে ঢেকে রেখেছিল এই কিশোরী। কারণ জানতে চাওয়ায় জবাব, ‘আমি আর কোথাও নিজের মুখ দেখাতে চাইছি না। ইতিমধ্যেই সকলে জেনে গেছেন আমায় কেমন দেখতে, কোথায় থাকি। এবার আমার উপর যদি কেউ হামলা করে তখন কী হবে?’পাল্টা প্রশ্ন করে বসে আলিয়া।

হাজরা শিফা। উদুপির প্রি ইউনিভার্সিটি কলেজের আরেক ছাত্রী। আলিয়ার মতোই এই মেয়েটিও মনে করে হিজাব পরে ক্লাসে আসার অধিকার তার আছে, আর তাই  এই লড়াইও চলবে। শিফার কথায়, ‘শুধু আমাকে নয়, আমার বাবা-মায়ের নম্বরও অনেককে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের কাছেও অজানা নম্বর থেকে সমানে ফোন আসছে। আমি সেইসব কল ধরতে বারণ করে দিয়েছি।’ হিজাবের অধিকারের লড়াইতো চলছেই, এবার শিফা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জোর গলায় জানতে চাইবে, কীভাবে কলেজের জিম্মায় থাকা তাদের সব ব্যক্তিগত তথ্য বাইরে এল।

এখানে আলিয়াও রঘুপতি ভাটের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে  দাবি করেছে, এই বিধায়কের প্রশ্রয়েই কলেজ কর্তৃপক্ষ এবং একদল ছাত্র গেরুয়া উত্তরীয় ওড়ানোর সাহস পায়, ‘উনিই আমাদের হিজাবের অধিকারে সাম্প্রদায়িকতার রং চড়িয়েছেন।

উনিই গেরুয়া উত্তরীয় পরার জন্য প্রশ্রয় দিয়ে, আমাদের বিরুদ্ধে উস্কেছেন। ওনার জন্য এখন শুধু কলেজ নয়, বাড়িতে থাকাও আমাদের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াল।’

এরপর কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়েই আলিয়া বলতে থাকেন, ‘আমি সাপ ভালোবাসি।ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার হওয়া আমার স্বপ্ন। এখন অনুভব করছি, কারও কাছে আমার সেই ইচ্ছের কোনও মূল্য নেই। নয় তো কেন তারা আমাদের এভাবে লাগাতার টার্গেট করবে?’

শিফা জানায় সে ডাক্তার হতে চায়, নিদেনপক্ষে রেডিয়োলজিস্ট। মেয়েটি বলে, ‘এবার এসব শেষ হোক। আমি শুধু পড়াশোনায় মন বসাতে চাই। আমায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে।’

প্রতিবেদক কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে এই ৬ ছাত্রীর অভিযোগ নিয়ে প্রতিক্রিয়া চাইলে, সরাসরি কথা বলতে অস্বীকার করা হয়।

প্রতিবাদী ছাত্রীদের অভিযোগ মতো, কলেজ থেকে তাদের যা যা তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে মার্কশিটও। সেখানেই স্পষ্ট ক্লাস টেনের বোর্ডের পরীক্ষায় এরা সকলেই ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পায়, কিন্তু এমন একটা ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, এই ৬ জন লেখাপড়ায় ততটা ভালো নয়। প্রতিবাদের প্রতিশোধ হিসেবে, মিথ্যা প্রচার করে এদের হেয় করার চেষ্টা চলছে। প্রতিবেদক দেখেছেন, এরা সকলে খুবই ভালো ছাত্রী, বোর্ডেও সকলে দারুন নম্বর পেয়েছে। যেমন মুসকান জাইনাব পেয়েছে ৮৭.৫২, রেশম সোশ্যাল সায়েন্সে ৮০ এবং সব মিলিয়ে ৬৭.৫২, আলিয়া আসাদি সোশ্যাল সায়েন্সে ৮৩ এবং সব মিলিয়ে ৬৬.৭২ শতাংশ নম্বর পেয়েছে। আলিয়ার ভয়, এপ্রিলেই প্রি ইউনিভার্সিটি পরীক্ষা। এই বিতর্কের ফলে তাদের ক্লাস করা শিকেয় উঠল। শিফাও জানায়, দু মাসের মধ্যে পরীক্ষা। অথচ তাদের ক্লাসে ঢুকতেই দেওয়া হচ্ছে না। লেখাপড়া তো দূরের কথা।

ছাত্রী হিসেবে তারা কেমন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য কতটা যোগ্য তা নিয়েই য়ে শুধু বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে এমন নয়, এই ৬ জনের  পারিবারিক আর্থিক অবস্থাকেও টার্গেট করা হচ্ছে।

আলিয়া জানায়,‘আমার বাবা একজন অটো চালক।প্রথমে কিছু না জেনে এরা আমার বড়লোকের তকমা দিয়ে ফেলে।আর এখন সব কিছু জেনে বলতে শুরু করেছে, আমি গরীব ঘরের মেয়ে আর যত সমস্যার উৎস।’ হোয়াটস অ্যাপে ফরোয়ার্ড হওয়া মেসেজে, যাদের পরিবারে বছরে আয় এক লক্ষ টাকারও কম, বেছে বেছে তাদের আক্রমণ করা হচ্ছে। শিফার কথায়,‘বলা হচ্ছে এর জন্য আমরা টাকা পাচ্ছি। টাকা নয়, এই লড়াই আমাদের বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষার।’

উল্লেখ করা যেতে পারে গত বুধবারই, আলিয়া ও শিফার সহপাঠী এবং সহ প্রতিবাদী রেশমের করা হিজাব মামলাটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়েছে কর্নাটক হাইকোর্ট।

হিজাব পরা নিয়ে, নিজেদের বিশ্বাস আর অধিকারের অসম লড়াই চালাতে গিয়ে তারা ক্রমশ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। আলিয়া জানায়, এই ক’ দিনে প্রচুর কিছু হারিয়ে বসেছে সে। যেমন, ‘আমাদের উপর যেভাবে প্রবল মানসিক অত্যাচার ও হেনস্থা হয়েছে, তাতে আমরা বিধ্বস্ত। মানসিক শান্তি বলে আর কিছু নেই। মিডিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রচুর সময় নষ্ট হয়েছে। এখন সবসময়ে ভয়ে ভয়ে থাকি।’ আলিয়া বলে, মিডিয়ার সঙ্গে অনেক ভেবেচিন্তে কথা বলতে হয়, যাতে নতুন করে কোনও বিতর্ক তৈরি না হয়। এবার কলেজ থেকে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর, জীবনটা আরও কঠিন হয়ে গেল।

আলিয়া জানায় হিজাব বিতর্ক তার আরও বড় একটা ক্ষতি করেছে। অনেক বন্ধু তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েছে। সে জানে না কারা তাদের এমনটা করতে বাধ্য করল। তবে এখনও তার আশা, এই দমবন্ধ পরিস্থিতি একদিন ঠিক কেটে যাবে। শিফার কথায়, অ-মুসলিম বন্ধুদের কাছে সে এখন ঘৃণার পাত্র। যখনই সে সব কথা ভাবে, পড়াশোনায় আর মন বসাতে পারে না।

মানসিক অত্যাচার, আক্রান্ত হওয়ার ভয়, নিরাপত্তার অভাব বা বন্ধু বিচ্ছেদের আঘাত সব কিছুর পরও শুধু নিজেদের বিশ্বাসে ভর করে সামনের দিকে এগোতে চায় আলিয়া, শিফা, রেশম, মুসকানরা। তাদের মনের কোণে সেই শক্তিটুকু এখনও যে অটুট।

Leave a Reply

Your email address will not be published.