নারী দিবসের মুখ বাংলার আনজারা! সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে হাসপাতালের বেডে মাধ্যমিক(Madhyamik) দিল সপ্তদশী

Home অ‘‌সাধারণ’ নারী দিবসের মুখ বাংলার আনজারা! সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে হাসপাতালের বেডে মাধ্যমিক(Madhyamik) দিল সপ্তদশী
নারী দিবসের মুখ বাংলার আনজারা! সদ্যোজাত কন্যাকে নিয়ে হাসপাতালের বেডে মাধ্যমিক(Madhyamik) দিল সপ্তদশী

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: কাজী নজরুলের চোখে বিশ্বের সকল মহান সৃষ্টির রচয়িতা নারী। কারও চোখে নারীই তাঁর অর্ধেক আকাশ। সেই শক্তিময়ীকে কুর্নিশ জানানোর দিন ৮ মার্চ(International Women’s Day)। অন্তত এই একটা দিন নারীদের সম্মান জানাতে কার্পণ্য করে না পুরুষজাতি। আর সেই বিশ্ব নারী দিবসের মুখ হয়ে উঠে এল এই বাংলার মেয়ে আনজারা খাতুন। হাসপাতালেই তৈরি হয়েছিল পরীক্ষাকেন্দ্র। পরীক্ষার্থীর কোলে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে পৃথিবীর আলো দেখা ফুটফুটে এক সন্তান। আর তার হাতে পরীক্ষাপত্র আর কলম। ঠায় একভাবে বসে এভাবেই মাধ্যমিক(Madhyamik) পরীক্ষা দিল মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের মেয়ে আনজারা খাতুন। এখন তার বয়স ১৭ বছর আট মাস।১৮ বছর বয়স হতে এখনও চার মাস বাকি তার।

মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের নানারাহি গ্রামের বাসিন্দা আনজারা, হরিশ্চন্দ্রপুর কিরণবালা বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী। বছর তিনেক আগে ওই গ্রামেরই যুবক মহম্মদ সেলিমের সঙ্গে মন দেওয়া নেওয়া হয় তার। বাড়ির কাউকে না জানিয়ে বিয়েও করে নেয় তারা। তখন আনজারা মাত্রই ক্লাস সেভেনের ছাত্রী। জীবনে একটা ভুল করে ফেললেও তার মাশুল দিতে রাজি ছিল না মেয়েটি। তাই অদম্য জেদ নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে সে। সংসার জীবনে ঢুকলেও, লেখাপড়ার সামনে আসা সব বাধাকেই হেলায় দূরে সরিয়ে দিয়েছে সে। হয়ত এই কঠিন মনের জন্যেই আনজারা, সকালে মেয়ের জন্ম দিয়ে দুপুরেই হাসপাতালের বেডে মাধ্যমিক(Madhyamik)পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসে পড়তে পারল।

আরও জানতে পড়ুন – নারী দিবসে (International women’s Day) দুর্দান্ত ডুডল! সব শ্রেণীর নারীকে সম্মান গুগলের

১৪ বছর আট মাস বয়সের মেয়ের পালিয়ে গিয়ে বিয়ে প্রথমে অস্বীকার করলেও, পরে মেনে নিয়েছিলেন, আনজারার বাবা আমির হোসেন। কিন্তু বিয়ের পরেও মেয়ে পড়াশোনা বন্ধ না করায় মন নরম হয় বাবার। তিন বছরের দাম্পত্যের পর, দশম শ্রেণিতে উঠে, সন্তানসম্ভবা হয় আনজারা। যেদিন সে জানতে পারে, মা হতে চলেছে, সেই দিনটা ছিল ভাষণ এক দোলাচলের। একদিকে ছিল মা হতে চলার আনন্দ, অন্যদিকে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা(West Bengal Board of Secondary Education )। চিকিৎসক সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য দিনক্ষণ জানানোর পর থেকেই,মাধ্যমিক(Madhyamik) পরীক্ষায় বসা নিয়ে বদ্ধপরিকর সে। কারণ ডাক্তারের কথা মতো ১৬ মার্চ ডেলিভারির দিনশুনে মনে মনে কোনও একটি প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করতে শুরু করে আনজারা। 

পরীক্ষায় বসার প্রস্তুতি আর নিজের ভিতরে বড় হতে থাকা একটি প্রাণকে সঙ্গে নিয়ে মাধ্যমিক দিতে যায় সে। কিন্তু ভাগ্যের কী পরিহাস! সোমবার কাকভোর থেকেই শরীরটা খারাপ হতে শুরু করে। পরীক্ষার(board exams)দিনই প্রসব যন্ত্রণা(labor pain)শুরু হয়। তড়িঘড়ি হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামীণ হাসপাতালে ভরতি করা হয় আনজারাকে। সকাল সাতটা নাগাদ এক সাহসী মায়ের কোল আলো করে আসে তাঁর প্রথম সন্তান, তাঁর কন্যা। চিকিৎসকদের চেষ্টায় সুস্থভাবে ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়ে দুশ্চিন্তায় ডুবে যায়। কয়েক ঘণ্টা পরেই যে শুরু মাধ্যমিক(Madhyamik), তবে পরীক্ষার কী হবে! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে, তবে বছরখানেকের পরিশ্রম কী বৃথা যাবে? এত আনন্দের মধ্যেও যেন, মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে গোটা পরিবারের। তবে আনজারা জানিয়ে দেয়, পরীক্ষা(West Bengal Board of Secondary Education) সে দেবেই। সন্তান জন্মের কয়েকঘন্টার মধ্যেই দুধের সন্তানকে কোলে নিয়ে পরীক্ষা(board exams) দিতে বসে আনজারা। সকলেই তখন কুর্নিশ জানাচ্ছে নতুন মা ষোড়শী আনজারাকে।

মেয়েকে কোলে নিয়ে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষায় বসার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন আনজারা। জানালেন, ‘সোমবার সকালেই প্রসব যন্ত্রণার(labor pain) ওঠে। এরপর ভালোয় ভালোয় আমার মেয়ে হয়েছে। কিন্তু এদিনই আমাদের পরীক্ষা শুরু। পরীক্ষা তো দিতেই হবে। হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। স্কুলে পড়ার সময় প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম । তবে আজ পরীক্ষা দিতে কেউ আমাকে বারণ করেনি । আশা করি পরীক্ষার ফল ভালোই হবে। ভবিষ্যতে কিছু একটা করতেই হবে।’ 

আনজারার বাবা আমির হোসেন বলেন, ‘মেয়ে বেশ কিছু বছর আগে গ্রামেরই এক যুবককে বিয়ে করে। মেয়ে বিয়ে করলেও পড়াশোনা ছাড়েনি। সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়েই যে মাধ্যমিক(Madhyamik) পরীক্ষা দিয়েছে এটাই বড় কথা।’

 হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামীণ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত কর্তা শুভেন্দু ভক্ত বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে একজন মাধ্যমিক(Madhyamik)পরীক্ষার্থী ভরতি ছিল। সোমবার সকালে একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয় সে। তারপরেও সে হাসপাতাল থেকেই পরীক্ষা দিতে চেয়েছে। সেটাই প্রশংসাযোগ্য। আমরাও সানন্দে সবরকম ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’ ওয়ার্ডের বাইরে একটি আলাদা ঘরে বসার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয় তার। আনজারার পরীক্ষার জন্যই হাসপাতালে নিয়মমাফিক যথাযথ পুলিসি ব্যবস্থাও করা হয়।  

আনজারার মানসিক জোরকে কুর্নিশ জানিয়েছে গোটা বাংলা। কথায় বলে, ‘একজন শিক্ষিত মা মানে, একটি শিক্ষিত পরিবার।’ আজ নারী দিবসে(International Women’s Day) আনজারার মধ্যে দিয়ে সার্থকতা পেল বহু কথিত আপ্তবাক্যটি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.