‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ চীনে নির্মিত! অস্বস্তি এড়াতে অন্য সুর বিজেপির

Home দেশের মাটি ‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ চীনে নির্মিত! অস্বস্তি এড়াতে অন্য সুর বিজেপির
‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ চীনে নির্মিত! অস্বস্তি এড়াতে অন্য সুর বিজেপির

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক : সম্প্রতি তেলেঙ্গানাতে ২১৬ ফুট উচ্চতার ‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। উদ্বোধনের কয়েকদিনের মধ্যে এই মূর্তি নিয়েই শুরু হয়েছে বিতর্ক। জানা গিয়েছে,মূর্তিটি তৈরি করেছে চীনের একটি কোম্পানি। আর এই সংবাদ জানাজানি হতেই প্রশ্নের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপির ‘দেশপ্রেম’।

সম্প্রতি তেলেঙ্গানায় একাদশ শতকের ভক্তিবাদী সন্ন্যাসী শ্রী রামানুচার্যের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। গুজরাটের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’-র পর এই মূর্তির নাম দেওয়া হয় ‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’। সন্ন্যাসীর ১০০০তম জন্মদিবস উপলক্ষে গত ৫ ফেব্রুয়ারি ২১৬ ফুট উচ্চতার এই মূর্তিটি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু মূর্তি উদ্বোধনের পরই শুরু হয়েছে বিতর্ক। জানা গিয়েছে, এই মূর্তিটি তৈরির বরাত পেয়েছিল একটি চৈনিক কোম্পানি এরোসান কর্পোরেশন। বিতর্ক তৈরি হয়েছে এই বিষয়টিকে ঘিরেই।

প্রসঙ্গত, মূর্তিটি তৈরির জন্য টেন্ডার ডাকা হয়েছিল। দেশ ও বিদেশের একাধিক কোম্পানি এই টেন্ডারে অংশ নেয়। ভারতেরও বেশ কয়েকটি সংস্থা ইচ্ছা প্রকাশ করে মূর্তি তৈরি করার জন্য। তবে প্রজেক্ট ওয়েবসাইটে চীনের এরোসান কোম্পানিই মূর্তি তৈরির বরাত পাওয়ার কথা স্বীকার করে। জানা গিয়েছে, প্রায় ১৫ মাস ধরে মূর্তিটি তৈরি হয়েছে চীনে। পরে প্রায় ১৬০০টি খণ্ডে বিভক্ত অবস্থায় ভারতে আসে মূর্তিটি। মূর্তিটিকে জোড়া লাগিয়ে সঠিক স্থানে বসানোর জন্য এরোসান কর্পোরেশনের তরফ থেকে প্রায় ৭০ জন কারিগরকে চীন থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল।

তবে মূর্তি তৈরির বরাত চিনা কোম্পানিটিকে হঠাৎ করে দিয়ে দেওয়া হয়নি। তার আগে কোম্পানিটির সাফল্যের ইতিহাসও খতিয়ে দেখা হয়। এ প্রসঙ্গে হায়দরাবাদ আর্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি রমনা রেড্ডি জানিয়েছেন, ‘যে কোনও বড় কাজের জন্য অতীতের সাফল্য দেখা হয়। ভারতে যে ব্রোঞ্জের কাজ হবে না তেমন নয়, তবে অতীতের খতিয়ানটাই এখানে দেখা হয়েছে। চীনের কোম্পানিগুলির পরিকাঠামো রয়েছে। তাছাড়া, সুলভ মূল্যে শ্রমিকও পাওয়া যায় চীনে। তাই চীনের এরোসান কর্পোরেশনকেই এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’ প্রসঙ্গত, মূর্তিটি তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ১০০০ কোটি টাকা। মূর্তিটির পাদদেশ ঘিরে রয়েছে ১০৮ ‘দিব্য দেশম’ অর্থাৎ ভারতীয় হিন্দুদের সর্বশ্রেষ্ট ১০৮ টি মন্দির। এছাড়া মূর্তিটিতে ১২০ কেজি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে রামানুজাচার্যের ১২০ বছরের জীবনের স্মারক হিসেবে। বিরাট এই মূর্তির ভিতরে রয়েছে ছোট আকারের আর একটি রামানুজাচার্যের মূর্তি। ১৩ ফেব্রুয়ারি এই ছোট মূর্তিটির উদ্বোধন করবেন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। মূর্তির বেদিটি ৫৪ ফুট উঁচু। এটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভদ্র বেদি’। এই বেদি জুড়ে রয়েছে একাধিক ঘর। প্রত্যেকটি ঘরেই বৈদিক লাইব্রেরি ও গবেষণাগার করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। প্রাথমিক ভাবে মূর্তিটির মোট ১৪টি মডেল তৈরি করা হয়। তার মধ্যে একটি মডেলকে নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচিত মডেলের ত্রিমাত্রিক ছবি পাঠানো হয় চীনে।

তবে এত বিরাট কর্মকাণ্ডের পরেও বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না কোনওভাবেই। মোদি সরকার বিগত কিছু বছর ধরেই ‘আত্মনির্ভর ভারতের’ স্লোগান তুলছে। আত্মনির্ভর ভারত হওয়ার পথে প্রধান বাধা চিন। চীন থেকে আমদানিকৃত দ্রব্যে ইতিমধ্যেই ছেয়ে গিয়েছে ভারতীয় বাজার। তাই ভারতকে আত্মনির্ভর হতে গেলে প্রথমেই চিন থেকে দ্রব্য আমদানি বন্ধ করতে হবে বলেই মনে করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার।স্লোগানও উঠেছিল ‘চীনা দ্রব্য বর্জন করো’। গালওয়ান উপত্যকায় ভারত-চীন সংঘর্ষের পর চীনের দ্রব্য বয়কট করার ধুম দেখা যায় ভারতীয়দের মধ্যে। মোদিও একাধিকবার তার ‘মন কি বাতে’ চীনা দ্রব্য বয়কট করার দাবি জানান। ২০২০ সালের জুন মাসে সুরক্ষাজনিত প্রশ্ন তুলে বাতিল করা হয় ৫৯ টি চীনা মোবাইল অ্যাপও। চীন বিরোধিতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে দীপাবলীতে চীনা বৈদ্যুতিক বাতির বদলে দেশে তৈরি প্রদীপ বিক্রি শুরু হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এত কর্মকাণ্ডের পরও কীভাবে ‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ তৈরির বরাত চীনের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া যায়? শুধু হায়দরাবাদের মূর্তিটিই নয়, গুজরাটে অবস্থিত ‘স্ট্যাচু অফ ইউনিটি’ তৈরি হয়েছে চীনে। প্রসঙ্গত, গুজরাটে অবস্থিত বল্লভভাই প্যাটেলের সাম্যের মূর্তির পৃথিবীর সর্বোচ্চ মূর্তি। ৫৫৩ টি ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি হয়েছে এটি।

চীনে মূর্তি তৈরির বিষয় সমর্থন করছে না সঙ্ঘ পরিবারও। বিজেপির সঙ্গে তারাও চীনের দ্রব্যকে বয়কট করার প্রবল দাবি জানিয়েছিল। যদিও এই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছিল সঙ্ঘ।

এই সমস্ত বিতর্ককে অপ্রাসঙ্গিক বলেই মনে করছে বিজেপি। তেলেঙ্গানার বিজেপি নেতা এনভি সুভাষ বলেন, ‘ একাদশ শতকের এক উল্লেখযোগ্য সমাজ সংস্কারক ছিলেন শ্রী রামানুজাচার্য। তিনি আমাদের সাম্য ও মানবতার পাঠ শিখিয়েছেন। তাঁর মূর্তি চীনে তৈরি হল না ভারতে, সেটা বড় বিষয় নয়। এই মূর্তির তৈরির সঠিক বার্তা হল আমরা সবাই সমান। আর এটাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একমাত্র ভাবনা।’

মূর্তির উদ্বোধনকে ঘিরে কাজিয়া তৈরি হয়েছে বিজেপি ও তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতি পার্টির মধ্যে। বিজেপির অভিযোগ তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী কে চন্দ্রশেখর রেড্ডি উদ্বোধনের দিন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত না জানিয়ে নিরাপত্তা বিধি ভঙ্গ করেছেন। টিআরএসের রাজ্যসভার সদস্য কে কেশব রাও এই বিষয়ে জানিয়েছেন, উদ্বোধনে আসতে না পারার কারণ মুখ্যমন্ত্রী নাকি প্রবল জ্বরে শয্যাশায়ী ছিলেন। কিন্তু এর পরও থেমে থাকেনি বিজেপির আক্রমণ। মুখ্যমন্ত্রীর ছেলে এবং তেলেঙ্গানার তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী কেটি রামারাও প্রধানমন্ত্রীকে ‘পক্ষপাতদুষ্টের প্রকৃষ্ট উদাহরণ’ বলে কটাক্ষ করেছেন। যা নিয়ে বিক্ষুব্ধ বিজেপি শিবির। তবে চীনে তৈরি ‘স্ট্যাচু অফ ইকুয়ালিটি’ নিয়ে এই মুহূর্তে তোলপাড় গোটা দেশ। ঐক্য ও মানবতার সাফাই গাইলেও মূর্তি তৈরিতে চীনের প্রসঙ্গ নিয়ে এখনও প্রবল অস্বস্তিতে ভারতীয় জনতা পার্টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.