শেন ওয়ার্ন (Shane Warne): প্রায় একটি উপন্যাসের মতো বর্ণময় যাঁর জীবন

Home খেলাধুলো শেন ওয়ার্ন (Shane Warne): প্রায় একটি উপন্যাসের মতো বর্ণময় যাঁর জীবন
শেন ওয়ার্ন (Shane Warne): প্রায় একটি উপন্যাসের মতো বর্ণময় যাঁর জীবন

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: শেন কিথ ওয়ার্ন (Shane Keith Warne)। বিশ্বের অন্যতম সেরা এই লেগস্পিনার (leg spinner) অষ্ট্রেলিয়ার স্বর্ণযুগের দলের অন্যতম সদস্য। গত ৪ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাইল্যাণ্ডের একটি হাসপাতালে প্রয়াত হয়েছেন কিংবদন্তি এই অষ্ট্রেলীয় (Australian) ক্রিকেটার। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ ক্রিকেট মহল।

ক্রিকেট ও ক্রিকেটের বাইরে এক বর্ণময় চরিত্র ছিলেন শেন ওয়ার্ন (Shane Warne)। প্রায় একটি উপন্যাসের মতো ঘটনাবহুল ছিল তাঁর গোটা জীবন। চলুন, আজ জেনে নেওয়া যাক, শেন ওয়ার্নের জীবনের কিছু অজানা দিক সম্পর্কে, যা কিনা কম মানুষই জানেন।

১৯৬৯ সালে অষ্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায় জন্ম শেন ওয়ার্নের (Shane Warne)। ছোটবেলা থেকেই ‘হেটেরোক্রোমিয়া ইরিডাম’ নামক একটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। এই রোগে যে সমস্ত ব্যক্তিরা আক্রান্ত হন, তাঁদের দুটি চোখের মণি দু’রঙের হয়। সাধারণত মানুষ ব্যতীত অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে এই রোগ বেশি দেখা যায়। ওয়ার্ন এই বিরল রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাঁর দু’চোখের দুটি মণির রঙ ছিল ভিন্ন। একটি চোখের মণির রঙ ছিল ধূসর ও আরেকটি চোখের মণির রঙ ছিল সবুজ।

খেতে খুবই ভালোবাসতেন শেন ওয়ার্ন (Shane Warne)। বিশেষ করে জাঙ্ক ফুড ও ফাস্টফুড অত্যন্ত প্রিয় ছিল তাঁর। এই কারণে ওজনও বেড়ে গিয়েছিল তাঁর। অতিরিক্ত ওজনের কারণে কোচের কাছে বকাও খেতেন তিনি। ভিক্টোরিয়ার হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা শুরু করার সময় তাঁর ওজন ছিল প্রায় ১১০ কেজি। ওজন কমানোর জন্য ভিক্টোরিয়ার কোচ তাঁকে সাঁতার শেখার কথা বলেছিলেন। প্রতিনিয়ত বিভিন্নরকম শারীরিক ব্যায়াম ও কসরতও করতে হতো তাঁকে। তাতে কয়েকদিন পরে খানিকটা ওজন কমে তাঁর। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৯২ সালে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অষ্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট অভিষেকের সময় তাঁর ওজন ছিল প্রায় ৯৭ কেজি।

সর্বকালের সেরা অষ্ট্রেলিয়া দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন শেন ওয়ার্ন (Shane Warne)। স্টিভ ওয়া ও রিকি পন্টিং-দুই অধিনায়কের নেতৃত্বেই সর্বাধিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ১৪৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৭০৮টি উইকেট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ১৯৯৯ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপজয়ী অষ্ট্রেলিয়া দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন তিনি। সেই বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম্যান্সও করেছিলেন তিনি। সেমিফাইনাল ও ফাইনালের প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তার পরের বিশ্বকাপে বিপর্যয় নেমে আসে তাঁর জীবনে। ২০০৩ বিশ্বকাপে খেলার আগেই ওয়ার্নের ডোপিং টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসে। ফলে দেশে ফিরে আসতে হয় তাঁকে। যদিও ওয়ার্ন (Shane Warne) দাবি করেছিলেন, তিনি কোনও নিষিদ্ধ ওষুধ বা ড্রাগ নেননি। মায়ের দেওয়া একটি ওষুধ খেয়েছিলেন ত্বক ভালো রাখার জন্য, এমনটাই দাবি করেছিলেন তিনি। দেশে ফিরে ক্রিকেট অষ্ট্রেলিয়ার কোপের মুখেও পড়েন তিনি। এক বছরের জন্য তাঁকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত করা হয়। ২০০৪ সালে নির্বাসন কাটিয়ে তিনি ফিরেছিলেন টেস্ট ক্রিকেটে।

অষ্ট্রেলিয়া দলে শেন ওয়ার্নের (Shane Warne) প্রথম অধিনায়ক ছিলেন স্টিভ ওয়া। কিন্তু শোনা যায়, স্টিভ ওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ ছিল ওয়ার্নের। ১৯৯৯ সালে ওয়েস্ট ইণ্ডিজ সফর থেকে ওয়ার্ন বাদ পড়ার পর এই তিক্ততা আরও বেড়েছিল। ২০১৬ সালে একটি সাক্ষাৎকারে ওয়ার্ন, স্টিভ ওয়াকে ‘স্বার্থপর’ খেলোয়াড় আখ্যা দিয়েছিলেন।

জানা যায়, ওয়ার্নের পছন্দের খেলোয়াড় ছিলেন মাইকেল ক্লার্ক। অষ্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক রিকি পন্টিং তাঁর আত্মজীবনীকে ক্লার্কের প্রবল সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু পন্টিংয়ের এই বক্তব্য খারিজ করে তাঁর অধিনায়কত্বের সমালোচনা করেন ওয়ার্ন। পন্টিংয়ের নেতৃত্বে তিনটি অ্যাসেজ সিরিজ হেরেছিল অষ্ট্রেলিয়া, তাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

ক্রিকেটবিশ্বের কাছে ওয়ার্ন স্মরণীয় হয়ে আছেন ‘বল অফ দ্য সেঞ্চুরি’-র জন্য। ১৯৯৩ সালে অ্যাসেজ সিরিজ চলাকালীন ইংল্যান্ডের ব্যাটার মাইক গ্যাটিংকে একটি অসাধারণ ডেলিভারিতে বোল্ড করেন তিনি। ওয়ার্নের বলটি লেগস্টাম্পের বাইরে পড়বে ভেবে না খেলে বলটিকে ছেড়ে দিয়েছিলেন গ্যাটিং। কিন্তু সকলকে অবাক করে বলটি প্রায় ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে গ্যাটিংয়ের স্টাম্প নড়িয়ে দেয়। দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন মাইক গ্যাটিংও।

কিংবদন্তি লেগ স্পিনারের সিগারেট প্রীতি ছিল প্রবল। চেইন স্মোকার ছিলেন তিনি। ওয়ার্নের সহ খেলোয়াড়েরা ও বহু ক্রিকেট সাংবাদিক জানিয়েছেন, দিনে প্রায় ৫০টি সিগারেট খেতেন ওয়ার্ন। অষ্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক মাইকেল ক্লার্ক এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে সিগারেট নিয়ে যেতেন ওয়ার্ন। ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ড সফরের সময় ধূমপানরত অবস্থায় তাঁর ছবি সামনে আসে, যা নিয়ে প্রবল বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এর কারণ, মাত্র কয়েকদিন আগেই নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট সংস্থার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। সেই চুক্তি অনুসারে, ধূমপানকে বিদায় জানানোর কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তা সত্ত্বেও ধূমপান করতে দেখা যায় তাঁকে। এই ধরনের খামখেয়ালিপনা যেন তাঁর মজ্জাগত, এমনটাই মনে করেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।

ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গেও নাম জড়িয়েছিল শেন ওয়ার্নের। ১৯৯৪ সালে অষ্ট্রেলিয়ার শ্রীলঙ্কা সফরে ভারতীয় বুকি জন ওরফে মুকেশকে পিচ রিপোর্ট ও আবহাওয়া সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহের অভিযোগ ওঠে ওয়ার্ন ও মার্ক ওয়ার বিরুদ্ধে। তা নিয়ে প্রবল বিতর্কও হয়। যদিও ওয়ার্ন এই ঘটনায় একটুও বিচলিত না হয়ে জানিয়েছিলেন, এরকম ছোটখাটো ঘটনা ঘটেই থাকে।

আইপিএলের ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে আছেন শেন ওয়ার্ন। ২০০৮ সালে প্রথম আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস দলের কোচ ও অধিনায়ক ছিলেন তিনি। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, আইপিএলের আটটি দলের মধ্যে সবথেকে দুর্বল দল রাজস্থান। কিন্তু তাঁদের ভুল প্রমাণিত করেন ওয়ার্ন। তাঁর ক্ষুরধার মস্তিষ্কে ভর করে প্রথমবারের ডিএলএফ আইপিএল ট্রফি জেতে রাজস্থান রয়্যালস।

ব্যক্তিগত জীবনেও বিতর্ক ছিল শেন ওয়ার্নের নিত্যসঙ্গী। ১৯৯৫ সালে দীর্ঘদিনের বান্ধবী সিমোনে কাল্লাহেনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। বিয়ের পাঁচ বছরের মধ্যেই নতুন বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ২০০০ সালে ডোনা রাইট নামে এক ব্রিটিশ নার্সকে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মেসেজ পাঠানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নিয়ে তীব্র জলঘোলা হয় এবং এর জেরে অষ্ট্রেলিয়ার সহ অধিনায়কত্ব হারান তিনি। এখানেই শেষ নয়। ২০০৫ সালে সিমোনের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর আবারও অভিযোগ ওঠে এক মহিলাকে কুরুচিপূর্ণ বার্তা পাঠিয়েছেন তিনি।

২০০৭ সালে আবারও ভাঙা সম্পর্ক জোড়া লাগতে শুরু করে ওয়ার্নের। কিন্তু এখানেও ঘটে বিপত্তি। অন্য একজন মেয়েকে মেসেজ পাঠাতে গিয়ে ভুল করে সেই মেসেজ তিনি পাঠিয়ে দেন সিমোনেকেই। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে ব্রিটিশ অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। হার্লেকে প্রকাশ্যে চুম্বন করতেও দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তাঁরা দুজন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চলেছেন, এমনটাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।

২০১১ বিশ্বকাপ চলাকালীন ঘটেছিল একটি চমকপ্রদ ঘটনা। গ্রুপ লিগে ভারত ও ইংল্যান্ডের একটি ম্যাচ টাই হয়েছিল। ওয়ান ডে ক্রিকেটে টাই ম্যাচ অতি বিরল ঘটনা। কিন্তু এই ঘটনাই ঘটেছিল সেবারের বিশ্বকাপে। মজার ব্যাপার হলো, ওয়ার্ন ম্যাচের আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ম্যাচটি টাই হতে চলেছে। আর তাঁর সেই ভবিষ্যদ্বাণী মিলে গিয়েছিল অক্ষরে অক্ষরে।

মাত্র ৫২ বছর বয়সে ওয়ার্নের আকস্মিক মৃত্যু (cause of death) ঘিরেও রয়েছে নানা প্রশ্ন। পুলিসের তরফ থেকে জানানো হয়েছে, থাইল্যাণ্ডের কো সামুইয়ে যে রিসর্টে ওয়ার্ন ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন, সেই রিসর্টে তাঁর মৃত্যুর মাত্র দু’ঘণ্টা আগে চারজন মহিলা ম্যাসিওর এসেছিলেন। রিসর্টের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জানা গিয়েছে এই বিষয়টি। যা আরও ঘনীভূত করেছে কিংবদন্তি লেগস্পিনারের মৃত্যুরহস্য। এই বিষয়টি নিয়ে এখনও তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ডের পুলিস।

অসামান্য প্রতিভা, লাগামহীন নারীসঙ্গ, দু’বারের বিশ্বকাপে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুরকম অভিজ্ঞতা- একইসঙ্গে এতগুলি বিষয়ের মিশেলে তৈরি চরিত্র এর আগে পায়নি ক্রিকেটবিশ্ব। সারা জীবন বিতর্ক সঙ্গী ছিল তাঁর। কিন্তু তার জন্য ক্রিকেটে কোনও প্রভাব পড়েনি। বিশ্বের অন্যতম সেরা লেগস্পিনার হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেন কেইথ ওয়ার্ন। তাই সবশেষে বলা যায়, অন্য কোনও স্পিনারের সঙ্গে তাঁর তুলনা করা নেহাতই মূখার্মির পরিচয় হবে। শেন কেইথ ওয়ার্নের তুলনা তিনি নিজেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published.