লতা মঙ্গেশকর:‌ জিন্দাবাদ না নিন্দাবাদ?‌

Home পয়েন্ট অফ ভিউ লতা মঙ্গেশকর:‌ জিন্দাবাদ না নিন্দাবাদ?‌
লতা মঙ্গেশকর:‌ জিন্দাবাদ না নিন্দাবাদ?‌

প্রিয়ম সেনগুপ্ত:‌ আগে লোকে মরে বাঁচত। সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর থেকে মরেও বাঁচার উপায় নেই। অভিনেতা হন বা লেখক, নেতা হন বা গায়িকা— কবে তিনি কী করেছেন, কোন রাজনীতির ব্যক্তিত্বের কাছাকাছি এসেছেন, সে সব নিয়ে কাটাছেঁড়া, কাদা ছোড়াছুড়ি চলতেই থাকে। সর্বজনশ্রদ্ধেয় বলে যে একটা শব্দ আছে, সেটা যেন আজকাল বিশ্বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছে দিনকেদিন।
লতা মঙ্গেশকর বিনায়ক দামোদর সাভারকরের অনুরাগী ছিলেন। ট্যুইটারে সেকথা খুল্লমখুল্লা লিখেওছিলেন। সেই সাভারকর, যিনি ভারতীয় জনতা পার্টি ও তাদের সমর্থকদের অন্যতম আদিপুরুষ ও ‘‌পোস্টারবয়’‌। শুধু তাই নয়, ‘‌ইন্ডিয়া টুডে’‌–কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবিও করেছিলেন সাভারকর নাকি তাঁর প্রাপ্য সম্মান পাননি। স্বভাবতই তারপর থেকেই বিজেপিবিরোধীরা যে সব বিশেষণে লতাকে ভরিয়ে দিয়েছিলেন, সেগুলো খুব একটা প্রীতিকর নয়।
আসমুদ্রহিমাচলকে সুরসপ্তকে ডুবিয়ে রাখা লতা কেন সাভারকরের মতো বিতর্কিত চরিত্রের গুণগান করবেন, সে নিয়ে তর্ক চলতে পারে। চলছেও। আসলে লতা মঙ্গেশকররা সেই প্রজন্মের মহাতারকা, যাঁরা ইহজীবনে শিখে উঠতে পারলেন না, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোন কথাটা বলা যায় আর কোনটা বললে রুষ্ট নেটিজেনরা ফালাফালা করে ছিঁড়ে নিতে পারেন সারা জীবন ধরে কষ্ট করে কাঁধে তুলে নেওয়া চিরঅম্লান গৌরবের উত্তরীয়।
লতা কেন সাভারকরকে সমর্থন করবেন?‌ সত্যিই তো, শিল্পীর কি ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দ থাকতে নেই?‌ কবীর সুমনকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলতে থাকা বিতর্কের মধ্যেই মোটামুটি একটা তত্ত্ব ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে ইতিউতি ভাসতে ভাসতে ডাঙায় উঠেছিল। শিল্পীকে তাঁর শিল্পের বাইরে কোনওকিছু দিয়ে বিচার করা বোকামি। অমুকের গান ভাল লাগলে শোনো। তাঁকে নিয়ে বা তাঁর লেখা বইটই বেরলে কিনে পড়ো। মেরেকেটে খুব বেশি হলে ফোনের রিংটোন করে রাখো। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে সেই গানের আদর্শ মেনে চলেন কি না, সে জাহাজের খবরের খোঁজে শ্রোতা ব্যাপারীর মাথা না ঘামানোই ভাল। যিনি ঘামান, তাঁকে বেকুব হতে হয়।
শিল্পী ও শিল্পের ব্যক্তিগত জীবনের চ্যুতিটুকুর মধ্যে কতটুকু নেবো, কতটুকু নেবো না, সেটুকু বোধহয় হাঁসের জলমেশানোর দুধ খাওয়ার মতোই সন্তর্পণে সেরে ফেলতে হয়। জানতে হয়, কীভাবে জল বেছে দুধটুকু নিতে হবে। কট্টর বিজেপি–বিরোধীরা বলতেই পারেন, লতার জীবনের সাভারকর কিংবা বিজেপিঘনিষ্ঠতা আমরা নেবো না। তাহলে নেবো কোনটা?‌ শুধু তাঁর গান?‌
নেওয়ার জিনিস কিন্তু তার বাইরেও আছে। ভারতবর্ষ ব্যক্তিপূজার দেশ। তারকাদের কমতি নেই। তবে কেউ কেউ–ই কিংবদন্তি। লতা নিঃসন্দেহে তাঁদের মধ্যে একজন। যে কোনও কিংবদন্তির মতোই নিয়তি লতাকেও পরীক্ষার আগুনে পুড়িয়ে পরখ করে নিয়েছে। শুধুই যদি প্রতিভা কিংবা অনুশীলন থাকতো, তাহলে লতা বড়জোর তারকা, মেরেকেটে মেগাস্টার হতেন। কিন্তু কিংবদন্তিদের সঙ্গে স্টার কিংবা মেগাস্টারদের পার্থক্যটা হয়ে যায়, তাঁদের মানসিক কাঠিন্যে, অনমনীয় দাঁতে দাঁত চাপা জেদের সংগ্রামে। নিয়তির ভাগ্যপরীক্ষার আগুনে পুড়তে পুড়তে যেখানে বেশিরভাগই ছাই হয়ে হাওয়ায় উড়ে যান, সেখানে লতারা হয়ে ওঠেন অগ্নিশুদ্ধ খাঁটি সোনা। কেমন ছিল লতার সেই আগুনে পুড়িয়ে নিজেকে খাঁটি সোনা করে নেওয়ার দিনগুলো?‌
শৈশবে সেভাবে প্রথাগত শিক্ষার সুযোগই পাননি লতা। ‘‌সেভাবে’, কারণ— প্রথম দিনই‌ স্কুলে গিয়ে নাকি সহপাঠীদের গান শেখাতে শুরু করে দিয়েছিলেন। শিক্ষকের বকাঝকাতে স্কুলে যাওয়ায় ইতি। বাড়িতে মরাঠি পড়াতেন এক গৃহকর্মী এবং সংস্কৃত পড়াতেন এক পণ্ডিত। বাদবাকি অন্যান্য বিষয় পড়াতেন আত্মীয়, পরিচিতরা। যে বলিউডের মুকুটহীন সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠবেন তিনি, সেই হিন্দি সিনেমার গান শেখা তো দূর, বাড়িতে শোনাও ছিল পাপ। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর সে যুগের নামকরা থিয়েটার ব্যক্তিত্ব, সঙ্গীতজ্ঞ এবং গায়ক। তবু বাড়িতে হিন্দি সিনেমার গানের চর্চা ছিল কঠোরভাবে নিষিদ্ধ!‌ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সরগম ভেসে বেড়াত মঙ্গেশকর পরিবারের ইন্দোরের বাড়ির আলোহাওয়ায়। তবে ধীরেধীরে ততদিনে বাবা দীনানাথ স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বন্ধ হয় তাঁর উপার্জনও।
পারিবারিক অবস্থার অবনতি ঘটলে এদিকওদিক ভেসে পাকাপাকিভাবে ঠাঁই হয় মুম্বইতে।
সেসময়ে প্লে–ব্যাক গাওয়ার রেওয়াজ খুব একটা নেই। গানের চেয়ে অভিনয়ের সুযোগই বেশি। বাধ্য হয়েই আটটি মরাঠি ও হিন্দি ফিল্মে অভিনয় করেছিলেন লতা। তবে, অভিনয় তাঁকে সেভাবে টানেনি। পরে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‌মেকআপ, লাইট এগুলো কখনওই আমার ভাল লাগেনি। কেউ আপনাকে আদেশ দিচ্ছে, এই কথা বলো, ওই কথা বলো, আমার খুব অস্বস্তি লাগতো।’ বরং গান গাইতেই বেশি ভাল লাগছে তাঁর।‌ এদিকে টানাটানির সংসারে টাকাটাও তো দরকার।
পেট না মন— কীসের ক্ষিদেকে বেশি গুরুত্ব দেবেন?‌ লতা মনের ক্ষিদে মেটাতে গানটাই বেছে নিলেন।
তখন প্লে–ব্যাকে নুরজাহান কিংবা শামসাদ বেগমরা রাজত্ব করছেন। তার ওপরে প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায় লতার গান শুনে বাতিলই করে দেন তাঁকে। বলেছিলেন ‘বড্ড সরু গলা’। ‘মজবুর’ ছবিতে ১৯৪৮ সালে গাইলেন লতা। পরপর সুযোগ আসতে থাকল। এর পর আরও সুযোগ এলেও, তখনও বিদ্ধ হয়েছেন সমালোচনায়। কারও কারও অভিযোগ ছিল, নুরজাহানকে নাকি নকল করেন লতা। সেই সময়ের মেগাস্টার দিলীপকুমার তো লতার উর্দু উচ্চারণ নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিলেন তোলেন! লতা কিন্তু স্থির, অবিচল। উর্দু শিখলেন। অবশেষে ১৯৪৯ সালে সুপারডুপার হিট হয় ‘আয়েগা আনেওয়ালা’। আর কখনও ফিরে তাকাতে হয়নি। ৩৫টি ভাষায় ৩০ হাজারেরও বেশি গান গেয়েছেন।
কিশোরকুমার হোক মহম্মদ রফি— পুরুষশাসিত বলিউডে সমান দাপটে কাজ করেছেন লতা। শুধু তাই নয়, বলিউডে তিনিই প্রথম গায়িকা, যিনি গান গেয়ে কিশোর–রফিদের সমান পারিশ্রমিক এবং গানের লভ্যাংশ দাবি করেছিলেন। সাফ বলেছেন, ‘নিজের যোগ্যতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছি। আমি জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। আমি কখনও কাউকে ভয় পাইনি।’‌ ‘‌ভারতীয় নাইটিঙ্গেল’‌ যতই তাঁর লতাসুলভ রিনরিনে মধুক্ষরা কণ্ঠে এই বক্তব্য বলুন না কেন, এর পিছনে যে এক বিরাট সিংহগর্জন লুকিয়ে আছে, তা সহজেই অনুমেয়।
জীবনদেবতার প্রতি কি অভিমানিনী ছিলেন সুরের দেবী?‌ হয় তো তাই। তাঁর জীবনে হাতে গোনা যে কয়েকটা বিতর্ক আছে, সেগুলো ঘাঁটলে দেখা যাবে, যেখানেই বিতর্ক কিংবা সমালোচনা হয়েছে, সবিনয়ে এমন কোনও কাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাতে বিরোধীদের মুখ হয় একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে নয়তো নিজেকে সরিয়েই নিয়েছেন সেখান থেকে।
১৯৯৯ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হলেন। কিন্তু ভগ্নস্বাস্থ্যের কারণে সভায় ছিলেন অনিয়মিত। নাজমা হেপতুল্লা, প্রণব মুখোপাধ্যায়, শাবানা আজমিরা বিষয়টা নিয়ে সরব হলেন। পরে জানা গেল সাংসদ হিসেবে বেতন, বাড়িভাড়া কিংবা অন্য যা যা সুযোগ–সুবিধা তাঁর প্রাপ্য ছিল, কিছুই নেননি।
যে কোনও তারকার মতো লতার প্রয়াণেও তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কাটাছেঁড়া করছে সংবাদমাধ্যম। লতা কত টাকার সম্পত্তি রেখে গেলেন, রাজ সিং দুঙ্গারপুরের সঙ্গে প্রেম পরিণতি না পাওয়া পরে কেন বিয়ে করলেন না লতা, সেসব নিয়ে আলোচনার অন্ত নেই। সে সব দেখতে দেখতে মনে পড়ে যাচ্ছিল, লতার সেই বিখ্যাত উক্তি—
‘‌আমি সবসময়ে মনে করি, আনন্দ হল বিশ্বের সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়ার জিনিস এবং দুঃখ হল নিজের ভেতরে চেপে রাখার বিষয়।’ আর অদ্ভুত বিষয় হল, জীবনের ব্যক্তিগত শোকের বিষয়গুলো নিয়ে খুব একটা অভিযোগও শোনা যায়নি তাঁর মুখে। শুধু একবারই জাভেদ আখতারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লতা বলে ফেলেছিলেন, ‘আর যেন জন্মাতে না হয়! যদি জন্মাতেই হয়, তা হলে অন্য কিছু হব। লতা মঙ্গেশকর হয়ে যেন আর না জন্মাই।’‌
জন্মচক্রের জালে জড়িয়ে গিয়ে গিয়ে বারবার পার্থিব জগতে ফিরে না আসার এই কামনা তো সাধকরা করেন!‌ যাকে বলে ‘‌মুক্তি’‌। অবশ্য লতাই বা সাধিকার চেয়ে কম কীসে!‌
তবু সেই লতার প্রয়াণেও যখন তাঁর রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ইতিহাস খুঁড়ে এনে বিতর্ক হয়, তখন খানিক ধন্দে পড়তে হয় বই কী?‌ যাঁর গান শুনে একসময় না জানি কত কোটি হাত করতালি দিয়েছে, আজ সেই হাতেরই আঙুল যখন অভিযোগের বিষে চুবিয়ে ধরে আসছে তাঁর দিকে, তখন দ্বিধা গ্রাস করবেই। কারণ, একদিকে সেই শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন, ব্যক্তিগত মতকে গুরুত্ব দেবো কি দেবো না— এই লাখটাকার প্রশ্ন। অন্যদিকে আজ, লতার প্রয়াণদিবসেই দিনেই তো ৪৬ বছর আগে আরও এক কিংবদন্তির চলে যাওয়া। ঋত্বিক ঘটক!‌ যিনি বলেছিলেন, রাজনীতির বাইরে কিছু হয় না। সব এবং সবাই রাজনীতিরই অংশ। শিল্প থেকে শিল্পীকে আলাদা করা নাকি জীবনের সবকিছুকেই রাজনীতির রঙিন কাঁচে দেখা— কোনটা ঠিক? শিল্পী হিসেবে লতা যে সব অগম্য গিরিশৃঙ্গে অবলীলায় বিচরণ করেছেন, সেটার জন্য তাঁর নামে জিন্দাবাদ ধ্বনি উঠবে?‌ নাকি সাভারকর বন্দনার জন্য তাঁকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেহ দাহ হওয়ার আগেই বিদ্ধ হতে হবে?‌ শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন নাকি শুধুই তাঁর শিল্প, কোনটা বড়, কোনটা তাঁর আসল পরিচয়?
আমার ঘরের হোম থিয়েটারে লতা মঙ্গেশকর রিনরিন করে গাইছেন, ‘‌মেরি আওয়াজ হি পেহচান হ্যায়’‌।

Leave a Reply

Your email address will not be published.