সাহস দেখালেন ছট্টু, যৌনপল্লিতে পাচার হয়ে যাওয়া ঝুমার সঙ্গে ঘর বাঁধলেন রমরমিয়ে

Home অ‘‌সাধারণ’ সাহস দেখালেন ছট্টু, যৌনপল্লিতে পাচার হয়ে যাওয়া ঝুমার সঙ্গে ঘর বাঁধলেন রমরমিয়ে
সাহস দেখালেন ছট্টু, যৌনপল্লিতে পাচার হয়ে যাওয়া ঝুমার সঙ্গে ঘর বাঁধলেন রমরমিয়ে

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: মেয়েটির জীবনের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস সত্যি হতে দেননি ছেলেটা। উল্টে উদারমনা ছট্টু ঝুমার জীবনে লিখে দিয়েছেন এক নতুন আখ্যান। যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে সাহসিকতার গল্প।নারী পাচার চক্রের ফাঁদে পড়ে অজান্তেই যৌনপল্লির অন্ধকারে ঢুকে পড়েছিল বাপ, মা হারা নাবালিকা। বছর কয়েক এ ভাবে কাটলেও সমাজের মূল স্রোতে ফেরার মরিয়া চেষ্টা জারি ছিল। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলের এক যৌনপল্লিতে খাবার সরবরাহ করতে আসা যুবকের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে তাঁর। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় ক্লাবের সহযোগিতায় এক হল চার হাত। হাসি মুখে নববিবাহিতা চললেন শ্বশুরবাড়ি।

বেশ কয়েক বছর আগে মুর্শিদাবাদের লালগোলার বাসিন্দা বাবা-মা হারা নাবালিকা ঝুমা ঘোষকে যৌনপল্লিতে এনে ফেলেছিল নারী পাচার চক্র। গায়ের জোরে দেহ ব্যবসায় নামতে বাধ্য করা হয় তাঁকে। অনেক পথ ঘুরে শেষমেশ তাঁর ঠাঁই হয় মহিষাদলের যৌনপল্লিতে। এই যৌনপল্লিতেই খাবার সরবরাহ করতেন বাসুলিয়ার বাসিন্দা পেশায় হোটেল ব্যবসায়ী ছোট্টু দাস। সেই সূত্রেই ঝুমা-ছোট্টুর আলাপ। মাস পাঁচেক আগে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন দু’জন।প্রথম দিকে বিষয়টি হজম করতে কিছুটা ইতস্তত করেছিল ছোট্টুর পরিবার। সেই সঙ্গে মেয়েটিকে যৌনপল্লি থেকে বার করে আনাটাও সহজ ছিল না। এই সময় স্থানীয় ক্লাবের সদস্যরা প্রেমিক যুগলকে মেলাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। ক্লাবের তরফ থেকে যৌনপল্লি এবং ছোট্টুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়। সোমবার রাতে ক্লাবের ঘরেই বসে বিয়ের আসর। ছেলের পরিবারের উপস্থিতিতে সম্প্রদান করেন ক্লাবের এক সদস্য।
ক্লাবের সম্পাদক মানসকুমার বেরা জানান, যৌনপল্লির মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়ে ছোট্টু ক্লাবের কাছে দরবার করে। এমন মহৎ কাজে এগিয়ে আসতে একটুও দেরি করিনি। ছেলের বাড়ির পাশাপাশি যৌনপল্লিতে মেয়েটির বিয়ের ব্যাপারে সবাইকে রাজি করিয়েছি। এর পরেই যুগলের চার হাত এক হল। নতুন জীবনে প্রবেশ করে চোখের জল বাঁধ মানছিল না নববিবাহিতার। ঝুমা বলেন, যৌনপল্লির অন্ধকার জীবন ছেড়ে কোনও দিন যে শ্বশুরবাড়ি যাব, ভাবতেই পারিনি। ছোট্টুর জেদ আর ক্লাবের সদস্যরা এগিয়ে না এলে সম্ভব হত না। সেই সঙ্গে সবাই আমাকে যে ভাবে আপন করে নিয়েছেন, আমি অভিভূত।ছোট্টুর পাশে দাঁড়ান আরও অনেকে। স্থানীয় নিহারিকা নামক এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে সম্পন্ন হল শুভকাজ। সরস্বতী প্রতিমার সামনেই হল বিয়ের অনুষ্ঠান।

বছর সাতাসের ছোট্টু দাস। পূর্ব মেদিনীপুরের মহিষাদলে ছোট্ট একটি হোটেল চালান ছোট্টু। বছর কয়েক আগের কথা। অভাবের জ্বালায় মুর্শিদাবাদের লালগোলা থেকে ঝুমা বেরিয়ে পড়েন। এদিক-ওদিক ঘুরে তাঁর ঠাঁই হয় মহিষাদলের এক পতিতাপল্লিতে। পতিতাপল্লি, তাই সমাজের কাছে অবহেলিত ঝুমা। এরমাঝেই এক চিলতে আলোর মতো ঝুমার জীবনে আসেন ছোট্টু। পাঁচ মাস ধরে ঝুমা ও ছোট্টুর ভালোলাগা, ভালোবাসা। এবার যা পেল সামাজিক স্বীকৃতি। সরস্বতী পুজোর সময়, দেবীর সামনেই সম্পন্ন হল তাঁদের বিয়ে।সমাজের আর পাঁচটা ছাপোশা বিয়ের অনুষ্ঠানের থেকে এটি আলাদা। তাই এগিয়ে এল নিহারিকা নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ছোট্টুই বিষয়টি এই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে জানান। এরপর দেবী সরস্বতীর সামনে বেশ ঘটা করে হল বিয়ে। পুরোহিত ডেকে হস্তবন্ধনী, সিঁদুর দান-সহ হিন্দুদের প্রায় সব রীতিনীতি মেনেই হল অনুষ্ঠান। ধুমধাম, বিয়ে উপলক্ষে সরস মজা সবই হল আর পাঁচটা বিয়েবাড়ির মতোই।

পতিতাপল্লি নয় এবার ঝুমার ঠাঁই হবে স্বামীর ঘরে। ঠিকানা পাল্টাবে, পাল্টাবে পরিচয়। তাই বেশ খুশি তিনি। বেশ সাহসী পদক্ষেপ করেছেন ছোট্টু দাস। ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে বেশ খুশি তিনিও। নানা বাধা বিপত্তি আসতে পারে জানেন। তবে তার জন্য প্রস্তুত ছোট্টুর বাবা সনাতন দাস। পুত্র ও পুত্রবধূকে স্বাদরে মেনে নিয়েছেন তিনি।সমাজের নির্মম বিধিনিষেধ ছোট্টুকে দমিয়ে দিতে পারেনি। তাঁর মন সায় দিয়েছে উদারতায়। তাই নতুন করে তিনি এক অসহায় মেয়ের ভাগ্য বদলে দিলেন। এখানেই জয় আধুনিক চেতনার। ছোট্টু এই সমাজের প্রতিনিধি। যাঁদের আজ বেশি করে প্রয়োজন সমাজের। বইয়ের পাতা উল্টিয়ে যাঁরা কোনও সাহসী পদক্ষেপ নিতে ভয় পান, ছোট্টু তাঁদের জন্য মুখের মতো জবাব লিখে দিয়েছে। দেখিয়ে দিয়েছেন কোনও ভালো কাজে পাশে পাওয়া যায় কাউকে কাউকে। তবে এক্ষেত্রে শেষপর্যন্ত ছোট্টুকে সায় দিয়েছে তাঁর পরিবার। তাই তিনি এত বড় পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন। সফল করতে পেরেছেন এক অসহায় মেয়ের স্বপ্ন। ছোট্টু-ঝুমা যে নতুন পথচলা শুরু করলেন, তাতে লেখা হল এক উদারতার আখ্যান। যার রূপকল্প ছোট্টুর হাতে লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.