কোভিডে যাত্রার অন্তর্জলিযাত্রা, সংকটে শিল্প ও শিল্পী

Home রাজ্য কোভিডে যাত্রার অন্তর্জলিযাত্রা, সংকটে শিল্প ও শিল্পী
কোভিডে যাত্রার অন্তর্জলিযাত্রা, সংকটে শিল্প ও শিল্পী

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: অনেকদিন আগে যাত্রা তার গরিমা হারিয়েছে। কোভিড সেই ষোলো কলা পূর্ণ করেছে। যাত্রা শিল্পের এখন অন্তর্জলিযাত্রা। এর সঙ্গে যুক্ত শিল্পীরা এখন পাত্তারি গুটোচ্ছেন। সে এক সময় ছিল। যাত্রার আসরে ভেঙে পড়ত গ্রামকে গ্রাম। রাত জেগে পালার পর পালা দেখা। যাত্রা তার পুরনো জৌলুস হারাচ্ছিল বেশ কয়েক বছর ধরেই। করোনা এসে ওলটপালট করে দিল বাকিটুকুও। যাত্রাদলের আয়োজক বা প্রযোজকরা তো বটেই, এ আফশোস এখন অভিনেতাদেরও কুরে কুরে খাচ্ছে!

গোটা দেশের পাশাপাশি বাংলাতেও অতিমারির দাপট বাড়তেই জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা। ফলে বিনোদনের বাকি ক্ষেত্রের মতোই লাগাম পড়েছিল যাত্রায়। শহর থেকে গ্রামগঞ্জ, প্রায় সর্বত্রই বছর দুয়েক বন্ধই ছিল যাত্রা। পুজোর সময়ে খানিক সাহস করে দু-একটা দল যাত্রা নিয়ে ফিরতে চেয়েছিল বটে, তবে লাভ হয়নি। এক দিকে রোগের ভয়, অন্য দিকে অতিমারিতে রোজগার হারানো মানুষের হাতে যাত্রা দেখার মতো ‘বিলাসিতা’র পয়সাটুকুও না থাকা। সেই সঙ্গেই কোভিড এড়াতে টিভির পর্দার চেনামুখদের যাত্রার আসরে যেতে না চাওয়া। অগত্যা লোকসানের খাতাই বহাল রইল যাত্রাপাড়ায়। তার মধ্যে নতুন করে ফিরে এল করোনাও। ওমিক্রনের দাপটে আবারও ঝাঁপ বন্ধ। প্রযোজকদের মাথায় হাত, শিল্পীদের অনেকেরই প্রায় না অনাহারের দশা! অগত্যা প্রাণে বাঁচতে অন্য পেশাতেও চলে যাচ্ছেন কেউ কেউ।

যাত্রার দ্বিতীয় সারি থেকে নিচুতলার শিল্পী, যাত্রার অন্যান্য কর্মীদের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। পেটের দায়ে অনেকেই চলে যেতে চাইছেন অন্য পেশায়। করোনা এসে যাত্রাপাড়ার প্রায় মেরুদণ্ড ভেঙে দিল বলা যায়। এই তো কয়েক দিন আগে সরকার যাত্রা করায় ছাড় দিল। তার পরে একটু একটু করে বিভিন্ন দল শো করা শুরু করেছে বটে, তবে তা আগেকার অর্ধেকও হবে কি না সন্দেহ! এই অবস্থায় আমরা শিল্পীরা নিজেদের পারিশ্রমিক কমিয়ে লোকসান কমানোর চেষ্টা করছি, যেটুকু পারি। তাতেও শিল্পকে বাঁচানো যাচ্ছে না।

এক-একটি মরসুমে প্রায় ১২০-১৩০ দিনের মতো যাত্রা মঞ্চস্থ হয়৷ প্রতিটি দলের সঙ্গে বহু মানুষ যুক্ত থাকে৷ অভিনেতা থেকে শুরু করে টেকনিশিয়ান, মঞ্চসজ্জার শিল্পী থেকে মেকআপ আর্টিস্ট৷ প্রত্যেকে তাঁদের রুজি রোজগার করেন এই শিল্পের মাধ্যমে৷ বড় এবং ছোটপর্দার মতই যাত্রার ক্ষেত্রেও নেপথ্যে থেকে যান বড় সংখ্যক কলাকুশলী৷ সবার এখন প্রায় হাতে হ্যারিকেন। যাত্রা জগতের অভিনেতা ও কলাকুশলীরা নানা ধরনের চুক্তিতে তাঁদের সাম্মানিক পেয়ে থাকেন৷ দৈনিক, মাসিক বা মরসুমের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়৷ অভিনয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সবার সাম্মানিক নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে৷ যাঁরা অত্যন্ত কম পারিশ্রমিকের কাজ করেন, তাঁদের সঞ্চয় ফুরিয়ে আসছে৷ এ প্রসঙ্গে এক যাত্রা শিল্পী জানান, কাজ হলে পারিশ্রমিক পাই৷ এখন হাতের টাকা ফুরিয়ে এসেছে৷ কয়েকমাস বাড়িভাড়া দিতে পারিনি৷ রেশনের খাদ্যসামগ্রী পাচ্ছি না৷ প্রতিবেশীরা চাল, আলু দিয়ে গিয়েছেন৷ তা দিয়েই কোনো মতে চলছে৷ শিল্পীদের সংগঠন যাত্রা প্রহরীর সম্পাদক মিতালি চক্রবর্তী বলেন, ‘চৈত্র-বৈশাখ মাসে অনেক শো হত৷ করোনার জন্য বায়না বাতিল হয়ে যাচ্ছে৷ হাজারখানেক শিল্পী আমাদের সংগঠনের সদস্য৷ মাত্র ৫৫ জনকে আর্থিক সাহায্য দিতে পেরেছি’৷

যাত্রার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত মানুষজন ছাড়াও অনেক অনুসারী শিল্পের যোগ থাকে৷ এর মধ্যে অন্যতম লাইট ও ডেকরেটিং৷ যাঁরা মঞ্চ বাঁধেন ও আলোর ব্যবস্থা করেন, তাঁরাও কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন যাত্রা মঞ্চস্থ না হওয়ায়৷ গ্রামীণ অর্থনীতিই যেখানে ভেঙে পড়ছে, সেখানে যাত্রার সুদিন ফিরে পাওয়া মুশকিল৷
প্রতি বছর রথযাত্রার দিন যাত্রাশিল্পের শুভ মহরত অনুষ্ঠিত হয়৷ পয়লা বৈশাখের হালখাতার মতো৷ সেদিন থেকে নতুন মরসুমের যাত্রাপালার বুকিং শুরু হয়৷ আগামী আষাঢ় মাসে রথযাত্রা দিনটি এগিয়ে আসছে৷ কিন্তু, কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের যাত্রাদলের কর্তারা জানেন না, এবার তাঁরা ওই শুভদিনে বুকিং শুরু করতে পারবেন কি না৷

কাজ নেই যাত্রাশিল্পীদের। তাই অনেকেই ঝুঁকছেন অন্য পেশায়। দেশের ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনাশিল্প যাত্রাকে বেশ কয়েক বছর ধরেই টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। অতীতে এই শিল্পের যে বিত্তবৈভব ছিল, তা এখন বিলীনের পথে। মঞ্চে মেকআপ করা রঙিন মানুষগুলোর অবস্থা বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত। তার ওপর করোনা যেন মহাসংকটে ফেলেছে এ অঙ্গনের মানুষদের। এ পেশায় টিকে থাকতে পারবেন কি না, সেটাই ভাবছেন যাত্রার সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা।এই সময়ে করোনার কারণে একেবারেই ক্ষতির মুখে পড়বে এ শিল্প। এটা পুষিয়ে ওঠা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তিত যাত্রা সংশ্লিষ্টজনেরা। একসময়ের এই লোকায়ত শিল্প আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। মুখ তুলে দাঁড়াবার আশা দেখছেন না কেউ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.