কর্তব্যপরায়ণ আরতি, নিঃসঙ্গ চারু এবং মাধবী

Home ফিচার কর্তব্যপরায়ণ আরতি, নিঃসঙ্গ চারু এবং মাধবী
কর্তব্যপরায়ণ আরতি, নিঃসঙ্গ চারু এবং মাধবী

শুভম সেনগুপ্তঃ ষাটের দশকের কলকাতা। কমিউনিজম (Communism) দরজায় দরজায় কড়া নাড়ছে। তখনও উদ্বাস্তু পরিবারে হাল ফেরেনি। নিম্ন মধ্যবিত্ত গেরস্থালির বউ আরতি সেদিন প্রথম চাকরিতে যোগ দেবে। পুত্রবধূর এ হেন অধঃপাতে শাশুড়ি কাঁদছেন আর খুন্তি নাড়ছেন। এতদিন ধরে দাদার মুখে ‘পড়ে আর কী হবে’ শুনতে থাকা কিশোরী ননদ বিয়ের পর সেদিনই আবার দাদা আর বৌদিকে একসঙ্গে খেতে দেখল। মধ্যবিত্ত বাড়িতে স্বামীর খাওয়া হলে স্ত্রীর খেতে বসার অলিখিত নিয়মের বৈষম্য প্রকট করার জন্য কোনও প্রতিবাদমুখরতার সাহায্য নিতে হয় না আরতিকে। আরতি কি তবে কোনও নারীবাদী আইকন? না, সেও ছিল কর্তব্যপরায়ণ গৃহবধূ। শ্বশুর, শাশুড়ি, ননদ, স্বামী আর ছেলে নিয়ে তার টানাটানির সংসার। স্বামীর ব্যাঙ্কের কেরানিগিরি আর টিউশন থাকা সত্বেও যখন শাশুড়ির সুগন্ধী জর্দা আসে না, ননদের স্কুলের ফি বাকি থাকে, তখন আরতি সাংসারিক প্রয়োজনে বাইরে বেরোয়। উপার্জন করতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে উপভোগ করতে শেখে। আরতি সে যে ডোমেস্টিক সাইন্সকে ‘থোরাই কেয়ার’ করেছে। যার অপটু হাতে লিপস্টিক পরা জানান দিয়েছে নিঃশব্দ বিপ্লবের কথা।

‘মহানগর’ (Mahanagar) ছবিতে দুর্বিনীত নারী ও স্বাধীনতার প্রতীক সেই লাল লিপস্টিক যদি প্রসাধন হয় তবে চারুলতার ওয়াচ গ্লাসও অবিসংবাদিত ভাবে ‘ফিমেল গেইজ ’ এর দ্যোতক।
উপনিবেশবাদ বিরোধী সংগ্রাম তখনও শুরু হয়নি। উনিশ শতকে চারুলতা (Charulata) এমনই একটা পর্ব। কে চারু? এক্কেবারে ‘একা’ চারুলতা সেই নারী যে সুতোর ফোড়ে স্বামী ভূপতির নামের প্রথম ইংরেজি হরফ B লেখে। বিকেলবেলায় স্বামীর জন্য চা পাঠায়। বঙ্কিমের বই হাতে ধরে মৃদুগুঞ্জে ‘বঙ্কিম বঙ্কিম’ করে। খড়খড়ি ফাঁক করে ওয়াচগ্লাস দিয়ে কৌতূহলী চোখে ফেরিওয়ালা, পথচারী দেখে। ঝড়ের গতিতে অমল ঘরে ঢুকলে খানিকটা চঞ্চল হয়। চারু সে যে গৃহবধূ থেকে যুবতী হয়ে ওঠে। কাপড়ের সুতোর ফোর তুলতে তুলতে গীতগোবিন্দের শ্লোক বলে। সাদা পাথরের তৈরি রোমান প্রেমের দেবতা কিউপিডকে (Cupid) সাক্ষী রেখে অমলের সঙ্গে বাগানে দোল খায়। যাঁর গোটা সত্বা জুড়ে রাগ, অভিমান, প্রেমের সঙ্গে কামনা আর একাকীত্বের যন্ত্রণাও থাকে। অর্থ, সম্মান, স্নেহপ্রবণ স্বামী সব সত্বেও চারু সে, যে কেবল সম্পর্কে অনুরাগ চায়। অমলের বিলেত যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলে মন খারাপ করে।
ষাটের দশকের কলকাতার আরতি হোক বা উনিশ শতকের চারুলতার মতো নিঃসঙ্গ বিবাহিতা , এই দুই চরিত্রের মনস্তত্ব যাঁর অভিনয়ের সুতোয় গাঁথা, তিনি মাধবী মুখোপাধ্যায় (Madhabi Mukherjee)। সেই মাধবী, যিনি সিনেমায় প্রথমবারের মতো শুটিং করতে গিয়ে কল্লোল যুগের অন্যতম সেরা কবি সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্রের (Premendra Mitra) কাছে প্রত্যাখ্যাত। শুনতে হয়েছিল ‘সিনেমায় থিয়েটারের মতো প্রম্পটিং চলে না। মাত্র পাঁচ বছরে নেমেছিলেন মঞ্চে। শ্রীরঙ্গম থিয়েটারে। তখন অবশ্য তিনি মাধবী নন, মাধুরী। মৃণাল সেনের বাইশে শ্রাবণ (Baishe Shraban) ছবি করার সময় থেকে নিজের পিতৃদত্ত নাম মাধুরী ঝেড়ে ফেলে হয়ে উঠেছিলেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী মাধবী। মায়ের হাত ধরে প্রথম থিয়েটারের রঙিন দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন মাধবী। মা লীলা ভাল পিয়ানো বাজাতেন। গানের গলাও ছিল চমৎকার। বাবা শৈলেন্দ্রণাথ মুখোপাধ্যায়ের (Sailendranath Mukherjee) আপত্তি থাকায় সিনেমায় নামা ছিল বড় প্রতিবন্ধকতা। স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের পর লীলা ‘স্বংসিদ্ধা’ (Swayangsiddha) ছবিতে অভিনয় করেন। মা থিয়েটারের কাজ শুরু করলে মহড়া দেখতে যেতেন ছোট্ট মাধবী। মহড়া দেখতে দেখতেই পেয়ে গেলেন অভিনয়ের সুযোগ। শ্রীরঙ্গম ‘সীতা’ নাটকে আশ্রমবালিকা আত্রেয়ীর চরিত্র যে মেয়েটি করছিল, সে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিশির ভাদুড়ি (Sisir Bhaduri) তাঁকে অভিনয়ের সুযোগ দেন। শিশির ভাদুড়ি, তুলসী চক্রবর্তী (Tulsi Chakraborty), ছবি বিশ্বাস (Chhabi Biswas), অহিন্দ্র চৌধুরী (Ahindra Chowdhury), সরযূবালা দেবী, প্রভা দেবীর মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, সবার কাছ থেকে মাধবী যেমন অভিনয় শেখার সুযোগ পেয়েছেন তেমনই ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম ‘লাকি নায়িকা’ অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের তিন মহীরুহ সত্যজিৎ (Satyajit Ray), ঋত্বিক (Hrithik Ghatak), মৃণাল (Mrinal Sen)- এঁদের সবার সঙ্গে। জীবনের আশি বছর পার করে আসা বর্ষীয়ান মাধবী মুখোপাধ্যায়ের কথায় ‘একা ভালো থাকা যায় না, ভালো থাকা সম্ভব নয়।’ তাইতো ফেসবুক (Facebook), হোয়াটসঅ্যাপের (WhatsApp) যুগে তাঁর একমাত্র সঙ্গী বই। একাকীত্ব থেকে দূরে থাকতে প্রাজ্ঞ (পুঁথিগত ডিগ্রি না থাকলেও) মাধবী এখন যখন ধারাবাহিকে অভিনয় করেন, তখন তাঁর ‘আজকাল ধারাবাহিকগুলোতে শেখার কিছু থাকে না’ এমন আফসোসবাণী কি সেই উনিশ শতকের ‘চারু’ কিংবা ষাটের দশকের ‘আরতি’র দৃষ্টিভঙ্গিতে অস্বাভাবিক?

Leave a Reply

Your email address will not be published.