দেশের বীরাঙ্গনাদের স্মৃতিতে নামাঙ্কিত প্রথম রেল স্টেশন! বেলানগরে অমর হলেন বাংলার ‘ঝাঁসির রানি’ বেলা বসু

Home রাজ্য দেশের বীরাঙ্গনাদের স্মৃতিতে নামাঙ্কিত প্রথম রেল স্টেশন! বেলানগরে অমর হলেন বাংলার ‘ঝাঁসির রানি’ বেলা বসু
দেশের বীরাঙ্গনাদের স্মৃতিতে নামাঙ্কিত প্রথম রেল স্টেশন! বেলানগরে অমর হলেন বাংলার ‘ঝাঁসির রানি’ বেলা বসু

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক:  কর্ড লাইনে বর্ধমান থেকে হাওড়ায় যাতায়াতের মধ্যে পড়ে ‘বেলানগর’ রেল স্টেশন। কিন্তু ক’জনই বা জানেন এই নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মহান ইতিহাস। এই স্টেশন অমর করেছে এক বীরাঙ্গনাকে!  যাঁকে ভারতের স্বাধীনতার অন্তরালের ইতিহাস চেনে বেলা বসু বা বেলা মিত্র নামে। বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বসু পরিবার। সেই পরিবারের কন্যা এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুরই ভাইঝি ছিলেন বেলা। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদ ও বহু বীর যোদ্ধার স্মৃতিতে নামাঙ্কিত রয়েছে দেশের একাধিক রেল স্টেশন। কিন্তু দেশকে স্বাধীন করতে  বাংলার যে বীরাঙ্গনারা নিজেদের রক্ত ধরিয়েছিলেন, আত্মত্যাগ করেছিলেন, সংসারের মোহ ছেড়ে বিপ্লবী দলে নাম লিখিয়েছিলেন তাঁদের স্মৃতিকে এভাবে ধরে রাখার উদ্যোগ নেহাতই সামান্য।  তবে এই আক্ষেপের অন্যতম ব্যতিক্রম বেলানগর। দেশের প্রথম রেল স্টেশন, যা উৎসর্গ করা হয় দেশের একজন কন্যার নামে।

১৯৪১ সালে সুভাষচন্দ্রের মহা নিষ্ক্রমণের সময় ইংরেজ বাহিনীর চোখে ধুলো দিতে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ভাইপো শিশির বসু এবং ভাইঝি ইলা বসুর। এই ইলা বসুরই ছোট বোন ছিলেন বেলা, অর্থাৎ নেতাজির সেজ দাদা সুরেশ চন্দ্র বসুর কন্যা। ১৯২০ সালে উত্তর ২৪ পরগনার কোদালিয়ায় জন্মগ্রহণ। পারিবারিক পরিচয়ের বাইরে, নিজ গুণে অনন্যা ছিলেন বেলা। ১৯৩৬ সালে তাঁর বিয়ে হয় যশোরের হরিদাস মিত্রের সঙ্গে। আজাদ হিন্দ ফৌজের চিফ অফ ইন্টেলিজেন্স পদে নিযুক্ত হন হরিদাস। বেলা সবসময় হরিদাসের পাশে থেকেছেন তাঁর যোগ্য সহধর্মিনী হিসেবেই। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেই মহিলা সমিতি গড়ে তোলেন বেলা। ১৯৪০ সালে যখন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে বেরিয়ে আসেন সুভাষচন্দ্র বসু তখন মহিলা সমিতির দায়িত্ব দেওয়া হয় ১৯ বছরের বেলা বসুকেই। এমনকী সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুদায়িত্বও ছিল তাঁরই। সে সময় প্রায়ই, আইএনএ-র সদস্যদের পূর্ব এশিয়া থেকে ভারতে পাঠাতেন নেতাজি, তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়ার পাশাপাশি সকলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন নেতাজির অন্যতম বিশ্বস্ত বেলা। ১৯৪৪ সালে গোপনে সুভাষচন্দ্রকে রেঙ্গুন এবং সিঙ্গাপুরে বার্তা পাঠানোর জন্য গঠন করা হয় ট্রান্সমিশন সার্ভিস। কলকাতার একটি গোপন কেন্দ্র থেকে নিয়মিত বার্তা পাঠানো হত। সেই কেন্দ্রের দায়িত্বেও ছিলেন বেলাদেবী। জানুয়ারি থেকে অক্টোবর, টানা ১০ মাস অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে বার্তা পাঠানোর কাজ করে যান তিনি। আজাদ হিন্দ বাহিনীর সাফল্যের জন্য নিজের সমস্ত গয়নাও বিক্রি করে দিয়েছিলন তিনি। এই সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিপদ বুঝে ইংরেজদের চোখে ধুলো দিয়ে, কত বিপ্লবীকে পৌঁছে দিয়েছেন নিরাপদ আস্তানায়। গোপনে উড়িষ্যা উপকূলে নামা কত না স্বাধীনতা যোদ্ধা বেলার দুঃসাহসে ভর করেই তাঁদের চলার পথকে উন্মুক্ত করতে সফল হন!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, দেশদ্রোহিতার অপরাধে গ্রেপ্তার হন বেলার স্বামী হরিদাস মিত্র। সঙ্গে গ্রেপ্তার হন বিপ্লবী পবিত্র রায়, জ্যোতিষ চন্দ্র বসু এবং অমর সিং গিল। ১৯৪৫ সালে স্বামী হরিদাস সহ বাকি ২১ জন বিপ্লবীর ফাঁসির আদেশ আসে। ১৯৪৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তাঁদের ফাঁসির দিন নির্ধারিত হয়। সেই সময় শুধু নিজের স্বামী নয়, সকলের ফাঁসি রদের জন্য মহাত্মার শরণ নেন বেলা। গান্ধিজির হস্তক্ষেপে সেই মৃত্যুদণ্ড যাবজ্জীবন কারাবাসে পরিণত হয়। মহাত্মার চেষ্টাতে ফাঁসির আদেশ রদ হলেও হরিদাস সহ অন্যান্য বিপ্লবীদের পাঠানো হয় দ্বীপান্তরে। তারপর থেকেই স্বাধীনতার যুদ্ধ পরিচালনায় স্বামীর অসম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন বেলা।

১৯৪৭ সালে নেতাজির ঝাঁসি রেজিমেন্টের অনুকরণে কলকাতায় ঝাঁসির রানী সংগঠন তৈরি করেন বেলা। নিজেকে বিলিয়ে দেন জনসেবার কাজে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, স্বামী হরিদাস মিত্র কংগ্রেসে যোগ দেন। বিধানসভায় ডেপুটি স্পিকার হন। কিন্তু বেলা দেবী সংসদীয় রাজনীতির আঙিনায় পা রাখেননি। তাঁর একমাত্র ধর্ম ছিল মানুষের সেবা। যেন সকলের চোখের আড়ালে থেকে নিঃশব্দে কাজ করে যাওয়ার ব্রত নিয়েছিলেন তিনি। স্বাধীন দেশের সাধারণ মানুষদের সামাজিক উত্থানই ছিল তাঁর একমাত্র লক্ষ্য। তাই বালি ও ডানকুনির মধ্যবর্তী অভয়নগর অঞ্চলে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য প্রাণপাত করতে থাকেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা ছিন্নমূল জনস্রোতের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পাইয়ে দিতে নিজের দলবল নিয়ে বেলা দিনরাত এক করে দেন। কিন্তু অমানসিক পরিশ্রম আর অনিয়ম মেনে নেয়নি শরীর, প্রতিশোধ তুলতে শুরু করে। দ্রুত ভেঙে পড়তে থাকেন বেলা দেবী। মাত্র ৩২ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে জীবনাবসান হয় ভারতের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় অখ্যাত এক বীরাঙ্গনার।

দেশের ইতিহাস বেলা বসুকে যোগ্য সম্মান দেয়নি। সময়ের চোরাস্রোতে বিস্মৃত হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অমূল্য অবদান। কিন্তু তাঁর এই অনন্য কাজের মর্যাদা দিয়ে, বেলা বসুকে অমর করে রাখার এক দৃষ্টান্তকারী সিদ্ধান্ত নেয় ভারতীয় রেল। হাওড়া-বর্ধমান লাইনে অভয়নগর স্টেশনের নতুন নামকরণ হয় বেলাদেবীর নামে ‘বেলানগর’। জীবন বিসর্জন দিয়ে শ’য়ে শ’য়ে পরিবারের নিশ্চিত আশ্রয় নিজের হাতে গড়ে দিয়েছিলেন বেলা বসু। জীবনের অন্তিম মুহূর্তটা তাঁদের মধ্যেই থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর সেই শেষ আশা অবশ্য পূরণ হয়। অভয় নগরেই জীবনাবসান হয় বেলা বসু ওরফে বেলা মিত্রর। প্রথা ভেঙে ১৯৫৮ সালে প্রথম কোনও মহিলার নামে স্টেশনের নামকরণ করে, বেলা বসুকে মরণোত্তর সম্মান দান করে ভারতীয় রেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.