বিদ্যাস্থানে ‘ভয়ে’বচ?

Home পয়েন্ট অফ ভিউ বিদ্যাস্থানে ‘ভয়ে’বচ?
বিদ্যাস্থানে ‘ভয়ে’বচ?

প্রিয়ম সেনগুপ্ত:‌ ‘‌কে?‌ সরস্বতী?‌ ও বাবা, ওকে কে বিয়ে করবে? অংকে একশোর মধ্যে একশো পায়। ইংরেজিতে একশোর মধ্যে পঁচানব্বই। ইতিহাস–ভূগোল–স্বাস্থ্য–বিজ্ঞান এমন এমন নাম্বার পায়.‌.‌.‌ ওকে দেখলে নাকি মাস্টারদের অবধি পিলে চমকে যায়। তাছাড়া ওইটুকু পুঁচকি মেয়ে, তার এমন ভারিক্কি স্বভাব!‌’‌

‘‌দাদার কীর্তি’‌ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন সরস্বতী একজন আদর্শ গুডগার্ল। আর কে না জানে ‘‌গুডগার্ল’‌রা প্রেম করে না। তাদের জীবন পড়াশুনো, নাচ–গান আর কঠিন সময়ানুবর্তিতার বেণীতে বাঁধা।  তারা হাঁটলে নেপথ্যে মিলিটারি কুচকাওয়াজের ড্রামস বিটের শব্দ হয়। তাদের এক ধমকে বোন থেকে বাবা— তটস্থ হয়ে যায় সকলে। স্টপ বললে নট নড়নচড়ন। আর ‘‌অ্যাট ইজ’‌ বললে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা। শুধু পড়াশুনো নয়, বাড়ির গুরুজনদের শরীরস্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ছোটদের আচারআচরণে যেন তিলমাত্র বেচাল দেখা না যায়— সেসবের দিকেই সরস্বতীর কড়া নজর।

শুধু তাই কেন?‌ বিবাহযোগ্যা সরস্বতীর নিজের জীবনের ‘‌মর‍্যাল ভ্যালুজ’‌–এর সুরটিও বেশ উঁচু তারেই বাঁধা। পাত্র যতই ‘‌এলিজেবল ব্যাচেলর’‌ হোক না কেন, যতই সম্পন্ন পরিবারের হোক না কেন, সরস্বতীর নিজের কথায় ‘‌রাস্তায় লুকিয়ে লুকিয়ে যিনি অমনভাবে মেয়েদের দেখেন, গুরুজনদের গিয়ে সেকথা বেহায়ার মতো বলতে পারেন’, তাঁদের পরিবার থেকে আসা বিয়ের সম্বন্ধ ফিরিয়ে দিতে তার তিলমাত্র সময় লাগে না।‌

সে এক সময় ছিল বটে। পড়ার বইতে ‘‌এসেছে শরৎ হিমের পরশ’‌ দেখে অবাক হতে হতো না। পুজোর পরপরই ঠান্ডা পড়তে শুরু করতো। গায়ে উঠত মা–ঠাকুমার হাতে বোনা হাফ–সোয়েটার। ঠিক সেই রকম এক সময়ে কলকাতায় ইঁদুরদৌড়ে তিনতিনবার ফেল করে লেঙ্গিখাওয়া ফুলদা খেয়ে পা রাখে পশ্চিমের কোনও এক আধাশহুরে জনপদে।

পড়াশুনোর দেবী হোক কিংবা প্রতিবেশিনী— কোনও সরস্বতীর সঙ্গেই ফুলদার দূরদূরান্তে খাপ খাওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই। কারণ, সাধুরূপী ভোম্বলদার ব্যাখ্যায় ফুলদার নাকি ‘‌বৃহস্পতির স্থানে কুঞ্ঝটিকাগ্রহ। সৃষ্টির আনাদিকাল থেকে সম্বর্তন আর বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ওর বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ হয়ে আছে।’‌

এই বিদ্যাস্থানে ভয়েবচ–র ভয়টাকে কাটাতে গেলে দরকার আর একটি ‘‌ভ’‌–এর।

আরও একটি ‘‌ভ’‌ অর্থাৎ ভোম্বলদা। বলাই বাহুল্য, পুরোটাই গটআপ। যাতে ভোলাভালা ফুলদাকে গোটা গিলে নিতে পারে ভোম্বলদা। তারপর কী হয়েছিল, সকলেই জানেন। কিন্তু তারমধ্যেও কি কয়েকটা জিনিস আমরা খেয়াল করেছি?‌

যে কোনও বিদ্যাশিক্ষার প্রথম এবং প্রধান শর্ত হল গুরুর কাছে নিঃশর্ত এবং নিঃসঙ্কোচ আত্মসমর্পণ। গুরু ঠিক হতে পারেন, গুরু ভুল হতে পারেন। কিন্তু রোদ্দুরের মধ্যে পাথর বিছানো মাঠে দৌড়ানোই হোক কিংবা কনকনে শীতের রাতে আদুর গায়ে নদীতে গলাজলে নেমে স্নান করা— সরস্বতীলাভের (‌রক্তমাংসের নয় অবশ্য)‌ জন্য ফুলদা ভোম্বলদাকে না বলেনি কখনওই। ‘‌ওম শান্তি ওম’‌–এ শাহরুখ খান আমাদের শিখিয়েছেন মনপ্রাণ দিয়ে কিছু চাইলে নাকি নিয়তি তাকে আমাদের পাইয়েই ছাড়ে। মনপ্রাণ দিয়ে চাওয়ার ক্ষেত্রে ফুলদা কিন্তু কারও থেকে পিছিয়ে ছিল না।

নিবেদিতপ্রাণ ফুলদার মেধা না থাকতে পারে, কিন্তু তার মনটা নিষ্কলুষ। তার নামে কেউ মিথ্যা প্রশংসা করলে সে সসংকোচে গুটিয়ে যায়। এতটাই যে, তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করার ক্ষমতাটুকু সে হারিয়ে ফেলে। পরে অবশ্য ফুলদা প্রশ্ন তোলে, কেন তার নামে বাড়িয়ে প্রশংসা করা হল?‌ অবশ্য ততক্ষণে যা কেলেঙ্কারি হওয়ার, তা হয়ে গেছে।

ওইটুকু বাড়িয়ে বলা আসলে শাপে বর। নইলে ফুলদাও যদি সরস্বতীর মতোই লেখাপড়া থেকে খেলাধুলোয় নিখুঁত হতো, তাহলে তো গল্পে কোনও মোচড়ই আসত না। পাশাপাশি, ভাগলপুর থেকে আসা জমকালো সম্বন্ধের চিঠি ফের আসার দৃশ্যে সরস্বতীর মা–র সংলাপে একথাও আমরা নতুন করে বুঝতে শিখতাম না ‘‌শুধু টাকা আর টাকা’‌ থাকলেই সরস্বতীলাভের (‌তা সে রক্তমাংসেরই হোক কিংবা বিদ্যার দেবীর)‌ রাস্তা খুলে যায় না। তার জন্য লাগে ভাল মানুষ হওয়ার মনের মতো মন। যে মন ফুলদার ছিল।

সে মন আজকাল আর পাওয়া যায় না খুব একটা। তা সেই ১৯৮০ হোক (‌দাদার কীর্তি মুক্তি পেলে যে বছর)‌ হোক কিংবা এই ২০২২— সোশ্যাল মিডিয়ায় সর্বজ্ঞানীদের ভিড়ে সবজান্তাদের অভাব নেই। কারণ, সকলে সব জানেন। নিজেকে জাহির করার লোকেরও অভাব নেই। ঠিক বলছি জেনেও ট্রোলের নৃশংস দাঁতনখ বেরিয়ে পড়তে পারে, এই ভয়ে মনের কথা মুখে আসাল আগেই গিলে নেওয়ার লোকের অভাব নেই। কিংবা বিপরীত লিঙ্গের কারও প্রতি সরল–সহজ মুগ্ধতার প্রকাশ যে ভুল বার্তা দিতে পারে, ‘‌খোরাক’‌ করে তুলতে পারে আপনাকে— এটা অনুধাবনেরও লোকের অভাব নেই।

অভাব রয়েছে শুধু সোজা পথে ভাবার, সোজা কথা বলার লোকের।

কথায় বলে, একটা বন্ধ ঘড়িও একেবারে ফেলনা নয়। দিনে দু’‌বার অন্তত সে ঠিক সময় দেয়। শুধু সেই দুটো ঠিক সময়ে ঘড়ির দিকে তাকানোর লোকটিকে চাই। তেমনই মানুষও। যার কোনও গুণ নেই বলে মনে হয়, তার মধ্যে খুঁজলেও অন্তত একটা গুণ বেরবেই। শুধু না কাটা হিরে চিনে নেওয়ার চোখ চাই। তেমনই পড়াশুনো না হোক, ফুলদার ছিল গান। ‘‌চরণ ধরিতে’‌ যখন সে গাইতে শুরু করে, তখন পিয়ানোয় বসা সরস্বতীর চোখে–মুখে আলো যেন খানিক বেড়ে যায়।

যদি গানের গুণ না–ও থাকত, তাও কি সহজসরল ফুলদা শত মানুষের ভিড়ে স্বতন্ত্র হয়ে উঠত না?‌ উঠত। কারণ, ফুলদার মধ্যে ছিল আরও একটা দুর্লভ গুণ। যা অমন ভুবনমোহিনী গানের গলার চেয়েও দুর্লভ আজকালকার যুগে। ফুলদার ছিল একটা মনের মতো মন। যে মন সম্পর্কে পরে বৌদি (‌সন্ধ্যা রায়) সরস্বতীকে‌ বলবেন, ‘‌বুকের মধ্যে অমন একটা নিখাদ সোনার মতো মন। চাইলেই বা তুমি ক’‌টা পাবে?‌’‌

সরস্বতীর জন্য যেসব সম্বন্ধ আসে, ফুলদা বৈষয়িক বিচারে ধারেভারে তার থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। তিনবার ফেল করার কলঙ্ক তো আছেই। পাশাপাশি ফুলদা বোকা। ভোলাভালা। চট করে বিশ্বাস করে নেয় সকলকে। শুধু তাই নয়, তার মনে যা, মুখেও তাই। তাই হাসির খোরাক হতে পারে, সেটা না বুঝেই সরস্বতীর নাচ দেখে কতটা মুগ্ধ হয়েছে, সেটা বলে ফেলে সকলের সামনে।

ফুলদার মতো সোনাবাঁধানো মন যাঁদের, তাঁরা আমাদের সমাজের একটা বিরাট অংশের প্রতিনিধি। যাঁদের বুক ফাটে, তবু মুখ ফোটে না। সোজা কথা সোজাভাবে বলে ফেলার ‘অপরাধে’ যাঁদের ভুল বোঝেন অনেকে। কারও সম্পর্কে মুগ্ধতাপ্রকাশ করে ফেললেই যাঁদের হতে হয় খিল্লির শিকার। দলবাঁধা আক্রমণের মুখে পড়তে পড়তে একটা সময় তাঁরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। তখন তাঁদের নিজেদেরই মনে হতে থাকে,  তাঁদের ছোটছোট অপ্রাপ্তির (‌যা কি না খুবই স্বাভাবিক যে কারও জীবনে)‌ কথা বলে ফেললে আবার মস্করার শিকার হতে হবে না তো?

তাঁরাই ক্রমশ গুটিয়ে যান, নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে। বিচ্ছিন্ন করে নেন নিজেদের। আমরা যারা ‘আহা, আমাদের কী রসবোধ’ প্রমাণ করতে গিয়ে যাঁরা রসিকার নামে ঠুকরে ঠুকরে রক্তাক্ত করি তথাকথিত পিছিয়ে পড়া মানুষগুলোকে, তাঁরা কি ক্রমশ অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়া ফুলদাদের খবর রাখি?

পাঠক, হে প্রিয় পাঠক, বুকে হাত রেখে বলুন তো, অন্তত এই একটা দৃশ্যে কি আপনি অন্তত একবারের জন্যও ফুলদার সঙ্গে ‘‌রিলেট’‌ করে ফেলেন না নিজেকে। কখনও আপনার জীবনে এরকম অন্তত একটা পরিস্থিতি একবারের জন্যও আসেনি, যখন আপনি আপনার বন্ধুদের কাছে কোনও সদ্যপরিচিতার সম্পর্কে আপনার মুগ্ধতার কথা জানাতে চেয়েছেন। আবার এই ভেবে ঢোঁকও গিলে নিয়েছেন, তারা কী ভাববে?‌ পিছনে লাগবে না তো?‌

অভিধান কিংবা গুগল খুঁজেও ‘‌ইনহিবিশন’‌ শব্দটার কোনও লাগসই বাংলা পেলাম না। খুব কাছাকাছি বাংলা বোধহয় জড়তা। এই জড়তা বা ‘‌ইনহিবিশন’‌ আসে সংকোচ থেকে। আর সংকোচের উৎস পাছে লোকে কিছুর বলের ভয়। যে কালিমা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করে, ফুলদার মধ্যে আসলে কোনও ইনহিবিশনই ছিল না। তার অপার সারল্য তাকে শিখিয়েছিল, যা ভাল, তা মুখ ফুটে বলতেই হয়।

এই সারল্যই তাকে শিখিয়েছিল, জীবনের আসল শিক্ষা হল ভাল, সরল মানুষ হওয়া। যে মানুষকে প্রয়োজনে আত্মত্যাগও করতে হতে পারে। বুকে পাথর চাপা দিয়ে হলেও নিজের জায়গা ছাড়তে হতে পারে। ভালবাসার মানুষটার সুখের জন্য, নিশ্চিত ভবিষ্যতের নিজের চরমতম আত্মত্যাগ করার শিক্ষা আয়ত্ত করা, নিজের চেয়েও ভালবাসার নিকটজনের আনন্দকে প্রাধান্য দেওয়া— সেটাই তো আসল শিক্ষা। সেই শিক্ষা যাঁর আছে, তিনিই তো আসল শিক্ষিত, তিনিই তো আসল বিদ্বান। তিনিই তো খাঁটি হিরে!‌

দাদার কীর্তিতে মহুয়া রায়চৌধুরীর চরিত্রটার নাম যে কেন সরস্বতী, তা এতদিনে বুঝলাম। বিদ্যার দেবী সরস্বতী কখনও সত্যিকারের হিরে চিনতে ভুল করেন না। তাই ফুলদাকেই তাঁরা কাছে টেনে নেন নেন।

আজকাল শুনি, সরস্বতীপুজোই নাকি বাঙালির ভ্যালেন্টাইন্স ডে। যদি সেটাই হয়, ডিগ্রি আর ওপরচালাকির বনাম সারল্যের যুদ্ধে সারল্যেরই জয় হোক। বিদ্যা হোক প্রেম— সব ফুলদার সরস্বতীলাভ হোক এবছর। আর সে বিদ্যা অর্জন করতে গিয়ে যেন ‘‌বিদ্যাস্থানেভ্য এবচ’‌ থেকে যেন ভোম্বলদার ভাষায় ‌বিদ্যাস্থানে ‘‌ভয়ে’‌বচ না হয়ে যায়।

সঙ্গে থাকুক এই প্রার্থনা— মা সরস্বতী, আমাকে বিদ্যে দাও মা। আমাকে বুদ্ধি দাও। ডিগ্রির বাজারে যাই হোক না কেন, জীবনের ময়দানে যেন ফুলদার মতো সোনাবাঁধানো সহজসরল একটা মনের মতো মন পাওয়ার শিক্ষাটুকু অর্জন করতে পারি।

তাহলেই হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.