ভারত ‘রত্ন’ হীন! প্রয়াত সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর, দেশজুড়ে বিষাদের সুর!

Home জলসাঘর ভারত ‘রত্ন’ হীন! প্রয়াত সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর, দেশজুড়ে বিষাদের সুর!
ভারত ‘রত্ন’ হীন! প্রয়াত সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর, দেশজুড়ে বিষাদের সুর!

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: তাঁর কন্ঠে ছিল দেবী সরস্বতীর অধিষ্ঠান। আর আজ যেন প্রকৃত অর্থেই সরস্বতীর বিসর্জন। প্রয়াত সঙ্গীত সম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকর। বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। চার সপ্তাহ ধরে শিল্পীকে সুস্থ করে তোলার লড়াই চালিয়েও ব্যর্থ হলেন চিকিৎসকরা। চিকিৎসক প্রতীত সামদানি ও তাঁর টিমের আপ্রাণ চেষ্টা মাঝে অবস্থার উন্নতিও হচ্ছিল। কিন্তু শনিবার থেকেই আচমকা তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। তাঁকে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়। সেখান থেকে আর ফেরানো যায়নি লতাকে। রবিবার সকালে তিনি প্রয়াত হন। সন্ধে সাড়ে ৬টা নাগাদ মুম্বইয়ের শিবাজী পার্কে লতা মঙ্গেশকরের শেষকৃত্যের আয়োজন চলছে। তাঁর আগে দেশবাসীর অন্তিম শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য শিল্পীর মরদেহ শায়িত রাখা হবে।  বাসভবন প্রভুকুঞ্জেও প্রয়াত সুর সম্রাজ্ঞীকে শ্রদ্ধা জানান বিশিষ্টরা। শেষকৃত্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিত থাকার কথা।

কোভিডে আক্রান্ত পর গত ১১ জানুয়ারি শিল্পীকে মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ভরতি করানো হয়। নবতিপর শিল্পী নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসকরা কোনও ঝুঁকি না নিয়ে, প্রথম থেকেই তাঁকে আইসিইউ-তে রাখেন। ৩০ জানুয়ারি শিল্পীর কোভিড নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। কিন্তু বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যার দরুন শেষ পর্যন্ত স্তব্ধ হল ২৬ দিনের লড়াই। এর আগেও একাধিকবার সঙ্কটজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েও অনুরাগীদের চিন্তামুক্ত করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলেন।  এবারও শিল্পীর সুস্থতা কামনা করে বিশেষ যজ্ঞ করেন অযোধ্যার পুরোহিতরা। জপ করা হয় মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র। কিন্তু সব ব্যর্থ হল! এক অপূরণীয় শূন্য়তার সৃষ্টি করে বিদায় নিলেন সরস্বতীর বরপুত্রী।

১৯২৯ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর লতার জন্ম । বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মরাঠি সঙ্গীত জগতের সুবিখ্যাত ধ্রুপদী গায়ক।  বাবার হাত ধরেই অভিনয় এবং সঙ্গীত শেখায় তালিমের শুরু। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান। তারপর ভাইবোনদের জীবন-যুদ্ধের শুরু। সেসময়ই কিশোরী লতার প্রথম বার মরাঠি ছবিতে গান গাওয়া। মাত্র ১৩ বছর বয়সে একটি মরাঠি সিনেমার জন্য প্রথমবার গান রেকর্ড করলেও, তা পরবর্তী সময়ে ছবি থেকে বাদ পড়ে। ১৯৪৫ সালে মুম্বইয়ে পাড়ি দেন তিনি। তারপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। সেখানে উস্তাদ আমান আলি খানের কাছে ধ্রুপদী সঙ্গীতের তালিম নেন। পরের বছর একটি হিন্দি ছবির জন্য প্লেব্যাক করেন।  তখনই বাঙালি প্রযোজক শশধর মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় লতা মঙ্গেশকরের। তাঁর শহিদ’-এ কাজের কাজের সুযোগ এলেও, সেই সুরেলা কণ্ঠকে ‘তীক্ষ্ণ’ বলে বাতিল করে দেন শশধর। এরপর ১৯৪৮ সালে প্রথম হিন্দি ছবিতে গান। ‘মজবুর’ থেকে লতা মঙ্গেশকরের জীবন নতুন মোড় নেয়।পাক্কা জহুরির মতো, খাঁটি হিরেটিকে বেছে নেন সঙ্গীত পরিচালক গুলাম হায়দার। পরবর্তী সময়ে লতা মঙ্গেশকর নিজেও একাদিক সাক্ষাৎকারে জানান, গুলাম হায়দার সত্যিই তাঁর গডফাদার। প্রথমবার যিনি তাঁর মেধার উপর পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন তিনিই হায়দর।

১৯৫০ থেকে ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে যে কোকিলকণ্ঠ গোটা দেশকে মুগ্ধ করে রেখেছিল তা আজ স্তব্ধ হল। অ্যায় মেরে বতন কে লোগো, আয়েগা আনেওয়ালা, প্যার কিয়া তো ডরনা কেয়া, আল্লা তেরো নাম, কঁহি দীপ জ্বলে, এইরকম অসংখ্য পুরনো গান আজও অম্লান। বহু বিখ্যাত সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন সুরসম্রাজ্ঞী। এমনকী লতা মঙ্গেশকরকে ভেবেই গানের সুর তৈরি করেছেন অনেকেই। স্বনামধন্য সংগীত পরিচালক এ আর রহমান নয়ের দশকে ‘দিল সে’ ছবিতে তাঁকে দিয়ে গান গাওয়ান। ‘জিয়া জ্বলে’ গানটিতে আজও একক এবং অদ্বিতীয় লতা মঙ্গেশকর। তাঁর সুরে বুঁদ গোটা দেশ।

জীবনভর সুর সাধনায় নিমজ্জিত লতা বিবাহ বন্ধনেও জড়াননি। এই সাধনাই দেশেের সীমা ছাড়িয়ে লতা মঙ্গেশকর নামটি পৌঁছে দিয়েছিল দেশান্তরে। নিজের দেশ তাঁকে সম্মান জানিয়েছিল ভারত রত্ন পুরস্কারে। সঙ্গে পদ্মবিভূষণ, পদ্মভূষণ, দাদাসাহেব ফালকে, ফিল্মফেয়ার লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট, সিনে অ্যাওয়ার্ড অফ লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্টের মতো সেরার সেরা পুরস্কার।

বছরখানেক ধরে অবশ্য শারীরিক কারণেই জনসমক্ষ থেকে সরে আসছিলেন তিনি।  অসুস্থতার জন্য খুব বেশি কাজ করতে পারতেন না। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার সূত্রে আর পাঁচজনের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ রেখেছিলেন, তেমনই নবীন কোনও শিল্পীর গান শুনে তাঁকে প্রাণভরে আশীর্বাদও করেছেিলেন। এছাড়াও  উরিতে ভারতীয় জওয়ানদের সাফল্য কিংবা পরবর্তী সময়ে দেশে তোলপাড় ফেলে দেওয়া বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ে ছোট করেই দিয়ে গেছেন সুরেলা বার্তা। এবার তাতেও পূর্ণচ্ছেদ পড়ল। শেষ হল দেশের শিল্প-সঙ্গীতের ইতিহাসের এক স্বর্ণখচিত অধ্যায়ের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.