প্রয়াত ওয়ার্নকে (Shane Warne) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা মেলবোর্নের, থাকবেন এড শিরান

Home খেলাধুলো প্রয়াত ওয়ার্নকে (Shane Warne) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা মেলবোর্নের, থাকবেন এড শিরান
প্রয়াত ওয়ার্নকে (Shane Warne) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা মেলবোর্নের, থাকবেন এড শিরান

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক : গত ৪ মার্চ প্রয়াত হয়েছেন ‘স্পিনের জাদুকর’ শেন ওয়ার্ন (Shane Warne)।‌ কিংবদন্তি এই স্পিনারকে সন্মান জানিয়ে এক বিশেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মের্লবোন ক্রিকেট গ্রাউন্ড। ঐতিহ্যবাহী এই ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সার্দান স্ট‍্যান্ডটি শেন ওয়ার্নের নামে নামাঙ্কিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া

আরও জানতে পড়ুন – শেন ওয়ার্ন (Shane Warne): প্রায় একটি উপন্যাসের মতো বর্ণময় যাঁর জীবন

প্রত্যেক খেলোয়াড়ের কিছু বিশেষ পছন্দের মাঠ থাকে। সাধারণত সেই মাঠগুলি তাঁদের ঘরের মাঠই হয়ে থাকে। শচীন তেণ্ডুলকরের (Sachin Tendulkar) যেমন ওয়াংখেড়ে। ইডেন গার্ডেন্স যেমন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (Melbourne Cricket Ground) ঠিক তেমনই ক্রিকেটের ধাত্রীগৃহ ছিল শেন কিথ ওয়ার্নের (Shane Warne)। ক্রিকেট বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন তিনি। শোনা যাচ্ছিল, অস্ট্রেলীয় সরকার প্রয়াত ওয়ার্নকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাবে এমসিজিতে, তাঁর প্রিয় মাঠে। আগামী দু’তিন সপ্তাহের মধ্যে। এবার তার দিনক্ষণও ঘোষণা হয়ে গেল। আগামী ৩০ মার্চ। আগামী ৩০ মার্চ এমসিজিতে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাবে অস্ট্রেলিয়ার স্কট মরিসন সরকার। বুধবার তার সরকারি ঘোষণাও হয়ে গেল।

জানা যাচ্ছে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে থাইল্যান্ডে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন সদ‍্য প্রয়াত কিংবদন্তি স্পিনার শেন ওয়ার্ন (Shane warne)। সেখানেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। শেনের আচমকা মৃত্যুতে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাদের কাছে বিষয়টা স্বাভাবিক মনে হয়নি।একদিকে যখন ওয়ার্নের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে, তখন থাইল্যান্ডের পুলিশ এবিষয়ে মুখ খুলেছে, তাদের তরফে জানানো হয়েছে, শেন ওয়ার্নের মৃত্যুর কারণ তাদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়, তবে প্রাথমিক তদন্তে অস্বাভাবিক কিছু পাওয়া যায়নি। থাইল্যান্ডের কোহ সামুইয়ের একটি ব্যক্তিগত ভিলায় ছিলেন ওয়ার্ন। তারকা ক্রিকেটার ডিনারে না এলে তাঁর বন্ধুরা চলে যায় হোটেল রুমে,সেখানে তাকে অচৈতন্য অবস্থায় আবিষ্কার করেন তাঁরা। এরপর শেষ চেষ্টা করলেও কিছুতেই শেষ রক্ষা করা যায়নি এই কিংবদন্তি স্পিনারকে।

নব্বইয়ের দশকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট জগতে আগমন ওয়ার্নের। স্পিন বোলিংকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যান তিনি। তার বলের ভেল্কিতে নানান সফলতার অধিকারী হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল। এমসিজিতে প্রচুর সুখস্মৃতি রয়েছে প্রয়াত লেগস্পিন জাদুকরের (Leg Spiner)। ১৯৯৪-এর অ্যাসেজে ওয়ার্নের বিখ্যাত হ্যাটট্রিক এই মাঠেই। ২০০৬ সালে ঐতিহাসিক সাতশো উইকেটের মহাকীর্তিও স্পর্শ হয়েছিল এমসিজিতেই। ভিক্টোরিয়ার স্টেট প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল অ্যান্ড্রুজ এ দিন ট্যুইট করে বলেন, ‘ওয়ার্নিকে শেষ বিদায় জানাতে এমসিজির চেয়ে ভাল মঞ্চ আর গোটা বিশ্বে নেই।’ তবে তার আগে ওয়ার্নের পরিবারের পক্ষ থেকে একটা শেষকৃত্য অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে। যা থাকবে একান্ত ব্যক্তিগত। তার পরই জানানো হবে এমসিজিতে রাজকীয় ভাবে শেষ বিদায়।

ওয়ার্নের ম্যানেজার জেমস এরস্কিন এ দিন বলেন যে, কিংবদন্তি লেগস্পিনারের শেষকৃত্যে যোগ দিতে গোটা বিশ্ব উৎসুক। তিনি বলেন, ‘যাঁরা আসতে চান, তাঁরা সশরীরে এমসিজিতে আসবেন। যাঁরা পারবেন না, বার্তা পাঠাবেন। তবে সবাই আসতে চান। যেমন এল্টন জন নিজের একটা শো ওয়ার্নের নামে উৎসর্গ করেছেন। অস্ট্রেলিয়া একটু দূর। নইলে প্রচুর লোক আসতেন।’ জানা যাচ্ছে, এমসিজিতে ওয়ার্নের (Shane Warne) চিরবিদায় অনুষ্ঠানে টিকিটের বন্দোবস্ত করা হতে পারে। যাতে সবাই বসে দেখতে পারেন। তবে কত লোক আসবেন, তা নির্ভর করবে ওয়ার্নের পরিবারের উপর। তাঁদেরই বলা হয়েছে, সেটা ঠিক করতে। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনের উপস্থিত থাকা মোটামুটি নিশ্চিত। বিখ্যাত দুই গায়ক ক্রিস মার্টিন এবং এড শিরানও (Ed Sheeran) ভাবনাচিন্তা শুরু করেছেন ইতিমধ্যে আগামী ৩০ মার্চ অস্ট্রেলিয়া উড়ে আসার। তাঁরাও এমসিজির অনুষ্ঠানে থাকতে ইচ্ছুক বলে জানিয়েছেন।

উইজডেনের বিচারে শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের অন্যতম ওয়ার্ন (Shane Warne) জন্মেছিলেন ১৯৬৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। তাঁর বাবা ছিলেন জার্মান বংশোদ্ভূত। হ্যাম্পটন হাইস্কুলে সপ্তম থেকে নবন শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর মেনটোন গ্রামারে চলে যান স্পোর্টস স্কলারশিপ পেয়ে। স্কুলজীবনে শেষ তিন বছর কাটিয়েছেন মেনটোনেই। ১৯৮৩-৮৪ মরশুমে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে তৎকালীন ভিক্টোরিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অনূর্ধ্ব ১৬ ডাউলিং শিল্ড প্রতিযোগিতায় খেলতে নামেন। লেগস্পিন ও অফস্পিনের মিশেল ঘটাতে পারতেন অনায়াসেই। তাঁর ব্যাটের হাতও ছিল যথেষ্ট ভালো।

পরের মরশুমে সেন্ট কিলডা ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলেন ওয়ার্ন। ধাপে ধাপে হতে থাকে ক্রিকেটীয় উত্থান। ১৯৮৭ সালে ক্রিকেটের অফ-সিজনে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলও খেলেছেন শেন, সেন্ট কিলডা ফুটবল ক্লাবের অনূর্ধ্ব ১৯ দলের হয়ে। তবে ১৯৮৮ সাল থেকে ফুটবল ভুলে ক্রিকেটেই মনঃসংযোগ করেন শেন ওয়ার্ন। ১৯৯০ সালে অ্যাডিলেডে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট আকাডেমিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ আসে। ১৯৯১ সালে ল্যাঙ্কাশায়ার লিগে অ্যাক্রিংটন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশ। প্রথমদিকে ইংল্যান্ডের আবহাওয়ায় অসুবিধা হলেও মরশুমে ৭৩ উইকেট নেন। ব্যাট হাতে করেন ৩২৯। অলরাউন্ডার হিসেবে হতাশ করায় পরের মরশুমে ওয়ার্নকে রাখেনি অ্যাক্রিংটন। ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওয়ার্নের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় ভিক্টোরিয়ার হয়ে, ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে। ওই বছরই সেপ্টেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বি দলের হয়ে জিম্বাবোয়ে সফরে যান। ওই সফরের দ্বিতীয় ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি ৪৯ রানে ৭ উইকেট নিয়ে চমকে দেন। অস্ট্রেলিয়া বি ৯ উইকেটে জেতে।

১৯৯১ সালের ডিসেম্বরেই ওয়ার্ন অস্ট্রেলিয়া এ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে দুই ইনিংসে যথাক্রমে ৩ ও ৪টি করে উইকেট নেন। অস্ট্রেলিয়া সফররত ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম দুটি টেস্টে পিটার টেলরের হতাশাজনক পারফরম্যান্স তৃতীয় টেস্টের প্রথম একাদশে ওয়ার্নের জায়গা সুনিশ্চিত করে দেয়। সিডনিতে খেলেছিলেন অভিষেক টেস্ট, বিদায়ী টেস্ট ২০০৭ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই খেলেন সিডনিতে। ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৫ অবধি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক খেলেছেন ওয়ার্ন। ২০১৩ সালে খেলেছেন শেষ টি ২০ ম্যাচ, বিগ ব্যাশে। আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস দলের হয়েও খেলেছেন ওয়ার্ন। ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের আগে ড্রাগ টেস্টে উত্তীর্ণ হতে না পারায় শেন ওয়ার্নকে নির্বাসিতও করা হয়েছিল। নির্বাসন কাটিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরেন গলে, শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্টে তিনি কামব্যাক করেছিলেন।

১৯৯৩ সালের অ্যাশেজ ওয়ার্নকে (Shane Warne) কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। ওয়ার্নের যে বল মাইক গ্যাটিংকে বোকা বানিয়ে উইকেট ভেঙে দিয়েছিল সেটিকে শতাব্দীর সেরা বল বলা হয়ে থাকে। ২০০৭ সালে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া-শ্রীলঙ্কা টেস্ট সিরিজ ওয়ার্ন-মুরলীধরন ট্রফি নামাঙ্কিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুথাইয়া মুরলীধরন ও রিচার্ড হ্যাডলির পর তিনিই সবচেয়ে বেশি পাঁচ উইকেট নিয়েছেন টেস্টে।
২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন ওয়ার্ন, সেই সময় প্রথম বোলার হিসেবে ৭০০ উইকেট নেওয়ার নজির স্থাপন করেছিলেন তিনি‌। ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ জয়ের অন‍্যতম সেরা কারিগর ছিলেন ওয়ার্ন, সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের “ম‍্যান অফ দ‍্য ম‍্যাচ” নির্বাচিত হন তিনি। দেশের হয়ে তার সংগ্রহের টেস্ট উইকেট সংখ্যা ৭০৮, ওয়ানডেতে নেন ২৯৩ টা উইকেট। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া’কে ১১ টা ওয়ানডে ম‍্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনি, তার মধ্যে হেরেছিলেন মাত্র ১ টি ম‍্যাচে। ২০১৩ সালে সব ধরনের ক্রিকেটকে আলবিদা জানানো ওয়ার্নের বিতর্কিত ও বর্ণময় যাত্রাপথ থমকে গেল তাইল্যান্ডে।

শেন ওয়ার্ন আইপিএলে ২০০৮ থেকে ২০১১ অবধি রাজস্থান রয়্যালসে খেলেছেন, মেন্টরের ভূমিকাও পালন করেছেন। আইপিএলে রাজস্থান তাঁর অধিনায়কত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ২০১৮ সালেও রাজস্থান রয়্যালস ওয়ার্নকে মেন্টর হিসেবে নিযুক্ত করেছিল। ২০১৩ সালে তিনি আইসিসির ক্রিকেট হল অব ফেমে জায়গা করে নেন। তার আগের বছরই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট হল অব ফেমে রেখেছিল ওয়ার্নকে। তাঁর ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণও সমৃদ্ধ করতো ক্রিকেটবিশ্বকে। ভারতীয় দলের পারফরম্যান্সেরও অন্যতম প্রশংসক ছিলেন বিশ্লেষকের ভূমিকায়।

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডের (MCG) বাইরে শেন ওয়ার্নের মূর্তিতে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন তাঁর অনুগামীরা। ক্রিকেটের পাশাপাশি বিয়ার ও সিগারেট ছিল তাঁর প্রিয়। অনুগামীদের অনেকেই তাই লাল ক্রিকেট বলের পাশাপাশি বিয়ারের ক্যান ও সিগারেটের প্যাকেট রেখে আসেন মূর্তির পাশে।অনেকেই আবার অপেক্ষা করে ছিলেন ওয়ার্নের মরদেহ আসার জন্য। শেষবারের জন্য দেখতে চেয়েছিলেন নিথর ওয়ার্নকে। অপেক্ষায় ছিল তাঁর পরিবারও। মেলবোর্ন (Melbourne) তৈরি হচ্ছে। ভিক্টোরিয়া প্রশাসন তৈরি তাঁদের ছেলেকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.