দু’বছর পরেও ন্যায়বিচার পায়নি সিএএ বিরোধী অশান্তিতে নিহত বিলাল আর শাহরোজের পরিবার! কেন?

Home দেশের মাটি দু’বছর পরেও ন্যায়বিচার পায়নি সিএএ বিরোধী অশান্তিতে নিহত বিলাল আর শাহরোজের পরিবার! কেন?
দু’বছর পরেও ন্যায়বিচার পায়নি সিএএ বিরোধী অশান্তিতে নিহত বিলাল আর শাহরোজের পরিবার! কেন?

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ২০১৯ সাল। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রতিবাদে উত্তাল হয়েছিল সারা দেশ। সিএএ বিরোধী আন্দোলনকে রুখে দিতে গুলি চলেছিল নিরীহ মানুষের উপর। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়েছিল কত তরতাজা প্রাণ।রক্তে ভিজেছিল উত্তরপ্রদেশের মাটিও। শুধুমাত্র সেই ডিসেম্বর মাসেই কমপক্ষে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল যোগীরাজ্যে। কিন্তু সেদিন বিনা দোষে যাদের প্রাণ গিয়েছিল, কেমন আছে তাদের পরিবার, কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি। যেমন আজও ছেলের হত্যার ন্যায়বিচার পায়নি সম্ভলের বিলাল আর শাহরোজের পরিবার। শুধু ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বসে আছে দুই বৃদ্ধ দম্পতি।

দু’টি মৃত্যু, দু’টি পরিবার, দু’টো বছর। নেই কোনও সাক্ষী। তাই মেলেনি ন্যায়বিচার। কারণ দায়ের হয়নি কোনও এফআইআর। নির্দিষ্ট অভিযোগের অভাবে গ্রেপ্তারও করা যায়নি কাউকে।

‘দিনটা ছিল ২০ ডিসেম্বর, শুক্রবার। বিলাল পাশা বেরিয়েছিল মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে। রাস্তাতেই উত্তেজিত মানুষের ভিড়ের মধ্যে পড়ে যায় সে। আমার ছেলের উপর গুলি চালানো হয়।’ এখনও সেই দিনের দগদগে স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন বিলালের মা শাকিলা বানু। সময় সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারেনি। শাকিলা বলে চলেন,‘বিলাল ছিল আমার বড় ছেলে। দেখুন ওর তিনটি ফুটফুটে কন্যা। ওরা আজ অনাথ। কী হবে ওদের, কে দেখবে, কে বাচ্চাগুলোকে বড় করবে!’

তাঁর যে ছেলে সাতে-পাঁচে থাকত না, তাকে কে মারল এখনও সেই প্রশ্নের উত্তর হাতড়ে বেড়াচ্ছেন বিলালের বাবা মহম্মদ শরিফ। শরিফ বলছেন, ‘ছেলেকে কে গুলি করল সঠিক করে কেউই কিছু বলেনি। তবে লোকে কানাঘুষো করছিল, পুলিসই ভিড় লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিল। ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও স্পষ্ট লেখা আছে বিলালের শরীর থেকে বুলেট পাওয়া গেছে। গুলি সরাসরি এর চিবুকে লেগেছিল। শ্বাস বন্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় সে।’

এরপর দু’বছর কেটে গেছে। করোনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে। সিএএ বিরোধী আন্দোলনকে ভুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কোল খালি হওয়া মাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে সেই দুঃসহ স্মৃতি। যে ন্যায়বিচারটুকু পেলে বুকের জ্বালা কিছুটা জুড়োত তাও মেলেনি। অসহায় শাকিলা বলছেন, ‘আমার মরা ছেলেটা এখনও কোনও বিচার পেল না।মামলা এতটুকু এগোয় নি।কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। আমরা বুকে পাথর চেপে রেখে শুধুই ওর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি। যেখানেই যাই মনে হয় চারদিকে ও রয়েছে, শুধু দেখতে পাচ্ছি না।’

শাকিলার মতোই একবুক অব্যক্ত যন্ত্রণা নিয়ে বসে আছেন সম্ভলের আরেক অসহায় মা।

‘২০ ডিসেম্বর ছিল ওর জন্মদিন। ২২ বছরে পড়েছিল।গলা জড়িয়ে সেদিন কত আদর আমাকে! বলেছিল আম্মি আমি তোমাকে হজে নিয়ে যাব। বাবা-মাকে কীভাবে ভালো রাখবে সবসময় সেই কথা ভাবত। এখন সব শুধুই স্মৃতি। কার গুলি জন্মদিনের দিন ওকে শেষ করে দিল কে জানে!তরতাজা ছেলেকে হারিয়ে কীভাবে বুকে পাথর নিযে বসে আছি, তা কেউ বুঝবে না।’

২২ বছরের শাহরোজ। সিএএ বিরোধী আন্দোলনকারীদের শায়েস্তা করার অভিপ্রায়ে ২০১৯ সালের ২০ ডিসেম্বর নিরীহ ছেলেটির উপরও গুলি চালানো হয়। অনেকেই প্রকাশ্য রাস্তায় তার উপর গুলি চলতে দেখেছে, কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হয়নি। কেউ এই মামলায় সাক্ষী হতে চাইনি। তাই সুবিচার পাওয়াও হয়ে ওঠেনি নিহত শাহরোজের পরিবারের। কারণ সহজেই অনুমেয়। হত্যার ঘটনার নেপথ্যে রয়ে গেছে এক প্রভাবশালী বিজেপি নেতার নাম।

সেদিনের কথা মনে করলে আজও কুঁকড়ে ওঠেন শাহরোজের বাবা মহম্মদ ইয়ামিন। বলতে থাকেন, ‘শঙ্কর চৌরাহায় সিএএ-র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হচ্ছিল।শান্তিপূর্ণ অবস্থান হঠাৎই হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। ইটবৃষ্টি শুরু হয়। এরপর আন্দোলনকারীদের হটাতে গুলি চলতে শুরু করে। একটা গুলি শাহরোজের পেটে এসে লাগে। পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে লেখা আছে, বুলেট ওর শরীর এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়।’

ইয়ামিন বলতে থাকেন, ‘যে ছেলেটি গুলিবিদ্ধ শাহরোজকে হাসপাতালে নিয়ে যায়, পরে তারও আর দেখা মেলেনি। শাহরোজকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েই সে গায়েব হয়ে যায়। অনেকে শাহরোজের উপর গুলি চালাতে দেখলেও, সাহস করে সামনে এসে বলেনি, কার গুলি আমার ছেলের প্রাণটা কেড়ে নিল! আমি সামান্য একজন মানুষ। কোথা থেকে সাক্ষী জোগাড় করব, আর কোন উকিলকে বলব আমাদের হয়ে লড়তে। মানুষ ভয়ে মুখ খুলছে না।যদি সত্যি কথা বললে পুলিস পাল্টা অত্যাচার করে!’

২০ ডিসেম্বর গুলি চলার দিন তিনেক পর, সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে সন্তোষ গুপ্ত নামে স্থানীয় এক বিজেপি নেতাকে গুলি চালাতে দেখা যায় বলে অভিযোগ। যদিও সেই অভিযোগ ফুৎকারে উড়িয়ে দেন ওই নেতা।

একটি জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টার ফোন করে, ভাইরাল ভিডিওতে তাঁর মতো কাউকে গুলি চালাতে দেখা বলে যে অভিযোগ উঠেছে সে ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানতে চান। যাবতীয় অভিযোগ নস্যাৎ করে সন্তোষ গুপ্ত দাবি করেন, ‘আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটা শত্রুদের কাজ। তারা আমার বিরুদ্ধে মানুষকে লেলিয়ে দিতে চায়। ওই ঘটনায় আমার কোনও হাত ছিল না। সম্ভলের মানুষ আমাকে চেনে, সম্মান করে। সেদিন পুলিসের সঙ্গে ঝামেলা হয়। পুলিসই লাঠি চার্জ করে। আমি তো ঘটনাস্থলে ছিলামই না। আমার তো নামই নেই, তো পুলিস কেন আমায় জেরা করবে!’

তবে ফোনের বদলে তাঁর সাক্ষাৎকারের ভিডিও রেকর্ডিং করতে চাইলে, সরাসরি সাংবাদিককে টাকার প্রস্তাব দিয়ে বসেন অভিযুক্ত বিজেপি নেতা। বলে বসেন, ‘সম্ভল আসুন কথা হবে।’

দু’বছর কেটে যাওয়ার পরও কেন কেউ গ্রেপ্তার হল না, এ প্রশ্নের উত্তরে সম্ভলের এসপি চক্রেশ মিশ্রর দাবি, ‘আমরা দু’টি ঘটনারই চূড়ান্ত রিপোর্ট আদালতে পেশ করেছি। আমরা কোনও প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান পাইনি। কোনও সাক্ষী পেলে হয়ত চার্জশিট পেশ করতে পারতাম। কীভাবে অঘটন ঘটেছে তা নিয়ে তদন্ত চালু আছে।’

‘দুটি নিরীহ মানুষের হত্যার তদন্ত প্রহসনে পরিণত হয়েছে। দু’বছরেও কোনও অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেল না, এখনও তদন্ত চলেই যাচ্ছে? এটা কি মশকরা হচ্ছে?’ সব কিছু দেখে শুনে রীতিমতো ক্ষুব্ধ আইনজীবী মহম্মদ খান মিক্কি।

ন্যায়বিচার তো দূর, সরকারি তরফে ক্ষতিপূরণটুকুও জোটেনি বিলাল আর শাহরোজের পরিবারের। সমাজবাদী পার্টির তরফ থেকে দেওয়া ৫ লক্ষ টাকাই  পেট চালানোর জন্য তাদের সারাজীবনের সম্বল। কিন্তু বিলালের মায়ের কাছে জীবনধারণের জন্য অর্থও তুচ্ছ। শাকিলা বানু শুধু চান, তাঁর মৃত ছেলে আর তিনটি অসহায় শিশু যেন ন্যায়বিচার পায়।

কিন্তু কে পাইয়ে দেবে বিলাল আর শাহরোজের পরিবারকে ন্যায়বিচার? কে মারল বিলাল আর শাহরোজকে? সেই অমোঘ প্রশ্নের উত্তরই যে এখনও অধরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.