দক্ষিণ কোরিয়ায় অবাধ ট্রোলিং! মানসিক যন্ত্রণায় মধ্য কুড়িতেই একের পর এক তারকার আত্মহত্যা

Home বিদেশ-বিভূঁই দক্ষিণ কোরিয়ায় অবাধ ট্রোলিং! মানসিক যন্ত্রণায় মধ্য কুড়িতেই একের পর এক তারকার আত্মহত্যা
দক্ষিণ কোরিয়ায় অবাধ ট্রোলিং! মানসিক যন্ত্রণায় মধ্য কুড়িতেই একের পর এক তারকার আত্মহত্যা

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: মনে পড়ে যায় ফরাসী দার্শনিক ও লেখক অলবের কাম্যুর সেই বিখ্যাত উক্তি, বাট ইন দ্য এন্ড ওয়ান নিডস মোর কারেজ টু লিভ দ্যান টু কিল হিমসেলফ। বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়ায়, ‘সবশেষে কিন্তু নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চেয়েও বেশি সাহসের প্রয়োজন হয় নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে।’    

এই কথাগুলোই যেন আত্মহননের সংজ্ঞাকে স্পষ্ট করে দেয়। কোন মানসিক অবস্থায় গেলে নিজেকে শেষ করে দেওয়ার মতো সাহস সঞ্চার করতে পারে কেউ, তা হয়ত স্বাভাবিক বোধবুদ্ধিতে নির্ধারণ সম্ভব নয়। অনেকক্ষেত্রেই কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকায় তা রহস্যমৃত্যুর মোড়কেই থেকে যায়।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে সেলেব্রিটিদের আত্মহত্যা আবারও সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি এনে দাঁড় করাল।

দক্ষিণ কোরিয়ায় সম্প্রতি কয়েকদিনের ব্যবধানে আত্মহত্যা করেছেন একজন ভলিবল খেলোয়াড় এবং একজন পপ তারকা। সিওলের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার হয়েছে, ২৬ বছরের অভিনেত্রী সং য়ু জুংয়ের দেহ। দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন দুনিয়ায় একালের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এখনও জানা যায়নি জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও কী এমন কারণের জন্য অভিনেত্রীর জীবনে এই পরিণতি নেমে এল! তবে জুংয়ের আচমকা মৃত্যু কিন্তু মনে করিয়ে দিল, কোরিয়ান পপ সঙ্গীতের দুনিয়ায় কীভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছায়া ফেলেছে আত্মহত্যার অভিশাপ। অর্থ-যশ-খ্যাতির মোহ ত্যাগ করে একাধিক পপস্টার আত্মহ্ত্যাতেই কেন মুক্তির পথ বেছে নিচ্ছেন। 

ইদানীং একটা ঘটনা স্পষ্ট হচ্ছে। অনেকগুলি অঘটনের আড়ালেই যে সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রোলিং দায়ী তা বলার অপেক্ষা রাখছে না। একইসঙ্গে প্রশ্ন কেন এত ঘৃণা? আর যাদের বিরুদ্ধে নখদন্ত বার করে সোশ্যাল মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ছে তাদের অবর্ণনীয় মানসিক অবস্থার কথা বোঝার চেষ্টা বা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, কোনওটাই নেই। অন্যকে অসম্মানের এই অবাধ স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের উপায় কি কিছুই নেই!

ফিরে যাওয়া যাক, ২০১৯ সালের জুন মাসে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত পপস্টার সুল্লি একটি টিভি শোয়ে অংশ নেন। শোয়ের ফরম্যাট ছিল একটু ব্যতিক্রমী। লাইভ শো-এ বসে গেস্ট নিজের সম্পর্কে বিভিন্ন কমেন্টস পড়ে, তখনই দর্শকদের উত্তর দিতেন। সেদিন সুল্লিও তাই করছিলেন। কিন্তু শো চলাকালীনই অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি। সঞ্চালককে বলতে শুরু করেন, ‘আমার সবসময় ভীষণ একা লাগে। মনে হয় জীবনে আর কিছু নেই। মনে হয় যেন খুশি থাকার মুখোশ পরে রয়েছি। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছি, পরামর্শ চেয়েছি, কিন্তু সকলেই বলেছে, এরকম নাকি হয়েই থাকে। এটা কোনও বড় ব্যাপার নয়। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন দুনিয়ার দস্তুর, কোনও তারকা যদি মানসিক অবসাদের শিকার হন, তাহলে তখনই তাঁর কেরিয়ার শেষ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। তাই পপগানের দুনিয়ায় নিজের কেরিয়ার টিকিয়ে রাখার অন্যতম শর্ত হিসেবে, সুল্লিও সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের হাসিখুশি ছবি পোস্ট করে বোঝাতে চাইতেন, সব কিছু ঠিকঠাকই চলছে।                                      

নারীবাদ নিয়ে বরাবরই মুখর ছিলেন সুল্লি। তাই নিয়েও অনেক ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছেন তিনি। কিন্তু টিভি শোয়ে যখন তিনি নিজের শূন্যতার কথা বলেছিলেন, তখন তা কেউ বোঝেনি, বা বোঝার  পরোয়াও করেনি। এর ঠিক তিন মাস পর নিজের অ্যাপার্টমেন্টে সুল্লিকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বয়স হয়েছিল বড় জোর ২৫। ১১ বছর বয়সে কেরিয়ার শুরু করা গায়িকাটির জনপ্রিয়তা তখন মধ্য গগনে। ঘনিষ্ঠরা বলেছিলেন, নেট দুনিয়ার অসম্মান এবং তাঁকে নিয়ে লাগাতার অপপ্রচার আর রটনা সুল্লিকে মানসিকভাবে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছিল।  

সুল্লির অপমৃত্যু দক্ষিণ কোরিয়ার পপ তারকাদের আত্মহত্যার প্রথম বা শেষ ঘটনা ছিল না। ২০১৯ এর নভেম্বর মাসে নিজের ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়, সুল্লির ঘনিষ্ঠ আরেক পপ তারকা গো হারার দেহ। আত্মহত্যার একদিন আগে গো হারা ইনস্টাগ্রামে শেষবারের মতো পোস্ট করে লেখেন ‘গুডবাই’।     

সে বছর মে মাসে গো হারা আরও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, কিন্তু তখন তাঁকে বাঁচিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। অবসাদ থেকে বেরোতে জাপানে একাধিক শো করে বেড়ান। তাঁর পারফরম্যান্স দেখে মনে হত, অপ্রিয় অতীতকে পিছনেই রেখে এসেছেন। কিন্তু না, কিছুই ঠিক ছিল না। মাত্র ২৮ বছর বয়সে নিজেকে শেষ করে দেন খ্যাতির চূড়ায় বসে থাকা এই পপতারকা।

দু’টি হাই প্রোফাইল আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ঝড় তোলে। কারও মানহানি করতে নেটদুনিয়ার এই অবাধ স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে কড়া আইনের দাবি উঠতে থাকে। অনলাইন পিটিশনে ট্যালেন্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সিগুলিকে দায়বদ্ধ করার দাবিও তোলা হয়। প্রতিবাদ আর দাবিতেই শেষ। কাজের কাছ কিছু হয়নি। দু’বছর পর আবারও ঠিক একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দক্ষিণ কোরিয়া। ইস্যু সেই এক, শুধু বদলে গিয়েছে চরিত্রগুলো। আবারও অনলাইন বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনের দাবিতে লাখ লাখ পিটিশন। 

৪ ফেব্রুয়ারি কিম ইন হ্যু নামে এক জনপ্রিয় ভলিবল খেলোয়াড় আত্মহত্যা করেন। কিমের আবভাব দেখে সোশ্যাল সাইটে প্রায়শই তাঁকে নিয়ে রটনা উপভোগ্য ছিল একাংশের। সমকামী থেকে নিজের আসল চেহারা মেকআপের নিচে ঢেকে রাখার মতো অজস্র মানুষের মনগড়া ধারণা ভাঙাতে, বহুবার ইনস্টাগ্রামে সত্যিটা বলার চেষ্টা করেছিলেন কিম। একবার বাধ্য হয়ে লিখেছিলেন, ‘আমি মেকআপ করিনা। পুরুষ বন্ধু পছন্দ নয়। আমার একজন বান্ধবী আছেন। কোনওদিন প্রাপ্তবয়স্কদের ছবিতে কাজও করিনি। যাঁরা আমার সম্পর্কে জানেন না তারাই অশালীন মেসেজ এবং অভব্য কমেন্ট করতে থাকে। এই মানসিক চাপ সহ্য করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। দয়া করে এবার থামুন। আমাকে রেহাই দিন।’ এরপরও কিন্তু ট্রোলিং শেষ হয় না। অবশেষে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে নিজেকে শেষ করে দিল কিম। ওর বয়স হয়েছিল মাত্র ২৮। কিমের মৃত্যুতেই শেষ নয়। একদিন পরেই দেহ উদ্ধার হয় ইউটিউব স্টার উইজে জম্মীর। ২০১৯ সালে জম্মীর একটি ভিডিও দেখে তাঁকে পুরুষ বিরোধী তকমা দেওয়া হয়। এরপর থেকে জম্মীর য়ে কোনও ভিডিওতেই অশালীন মন্তব্য উড়ে আসতে থাকে। মাঝে অশ্রাব্য কথা বার্তা এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে লাইভ স্ট্রিমিং বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সে। এই সব কমেন্টস তাঁর মায়ের চোখেও পড়ত। অপমানে তিনি ২০২০ সালে আত্মহত্যা করেন। মায়ের মৃত্যুতে মুহ্যমান জম্মী, দর্শকদের কাছে আবেদন জানায়, এবার তাঁরা চুপ হোন, আর তাঁকে যেন অতিষ্ঠ না করা হয়। কিন্তু তার মানসিক যন্ত্রণার কেউই পরোয়া করেনি। তাই কী অবশেষে ২৭ বছরের জম্মীকে আত্মহননের পথে নিয়ে গেল ? প্রশ্নের শেষ নেই।

 দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯০ শতাংশ মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন আর ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে। ফলে নেটদুনিয়া যত বড়, নেট নাগরিকদের চরিত্রও তত ভিন্ন। কোনও কিছুর গভীরে না গিয়ে আলটপকা মন্তব্য ছুঁড়ে দেওয়া অভ্যাসে পরিণত। আর নেটদুনিয়ায় সেলেব্রিটিদর মানহানি যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার উদাহরণ কয়েকটি প্রতিভার অকাল মৃত্যু। সদা সর্বদা লাইমলাইটে থাকার চাপের সঙ্গে ট্রোলিংয়ের নির্মমতা আত্নহননের অন্যতম কারণতো বটেই। আর এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়েই দক্ষিণ কোরিয়ায় কড়া সাইবার আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।   

Leave a Reply

Your email address will not be published.