চিয়ার লিডার্স বিতর্ক থেকে ম্যাচ গড়াপেটা, জানুন আইপিএলের (IPL) অন্ধকার দিক

চিয়ার লিডার্স বিতর্ক থেকে ম্যাচ গড়াপেটা, জানুন আইপিএলের (IPL) অন্ধকার দিক

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: মনে আছে আইপিএলের (IPL) অন্যতম আকর্ষণ চিয়ার লিডার্সদের? একসময় প্রায় প্রত্যেকটি বাউন্ডারির সঙ্গেই হাতে পমপম নিয়ে নাচতে দেখা যেত তাঁদের। কিন্তু জানেন কি, এই চিয়ার লিডার্সদের ঘিরে বারেবারেই আইপিএলে তৈরি হয়েছে নানান বিতর্ক। শুধু চিয়ার লিডার্স নয়, পুরো আইপিএল জুড়েই রয়েছে একাধিক বিতর্কের ছায়া।

চিয়ার লিডার্স বিতর্ক –

গ্যাব্রিয়েল্লা পাসকুইলটো নামে দক্ষিণ আফ্রিকার এক চিয়ার লিডার্স আইপিএল (IPL) সম্পর্কে একাধিক অভিযোগ আনেন। তিনি ২০১১ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ানস (Mumbai Indians) দলের চিয়ার লিডার্স ছিলেন। গ্যাব্রিয়েল্লা তাঁর ব্লগে লেখেন ম্যাচের পরের পার্টিতে খেলোয়াড় এবং বিশেষ অতিথিদের খুশি করার জন্য পণ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত চিয়ার লিডার্সদের। অনেক খেলোয়াড়ই নেশা করে চিয়ার লিডার্সদের সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করতেন। এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পরই গ্যাব্রিয়েল্লাকে আইপিএল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু মুম্বাই ইন্ডিয়ানস-এর তরফ থেকে এই বিষয়ে কোনও বিবৃতি দেওয়া হয় নি।

ফেক আইপিএল প্লেয়ার –

২০০৯ সালে আইপিএল চলাকালীন ‘ফেক আইপিএল প্লেয়ার’ নামে একটি ব্লগ ভাইরাল হয়। এই ব্লগে আইপিএল সংক্রান্ত অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করা হয়। এই ব্লগের মূল লক্ষ্যই ছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। এতটুকু ঠিক ছিল। কিন্তু একটি ম্যাচ সম্পর্কে এই ব্লগের করা ভবিষ্যতবাণী হবহু মিলে গেলে টনক নড়ে আইপিএল কতৃপক্ষের। সন্দেহ গিয়ে পড়ে আকাশ চোপড়া এবং সঞ্জয় বাঙ্গারের উপর। কারন দুজনকেই নাকি আইপিএল চলাকালীন ল্যাপটপে দীর্ঘক্ষণ ব্যস্ত থাকতে দেখা গিয়েছিল। এই ঘটনার পরই দুজনকে বরখাস্ত করে টুর্নামেন্টের মধ্যেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে ২০১০ সালে ফেক আইপিএল প্লেয়ারের রহস্যের সমাধান হয়। অনুপম মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি নিজেকে এই ব্লগের মালিক হিসাবে মিডিয়াতে আত্মপ্রকাশ করেন।

বাণিজ্যিকীকরণ –

আইপিএল (IPL) শুরু হয়েছিল স্থানীয় খেলোয়াড়দের আরও বেশি সুযোগ দিতে। স্থানীয় প্লেয়াররা আন্তর্জাতিক প্লেয়ারদের সঙ্গে ড্রেসিংরুম শেয়ার করলে তাঁদের অভিজ্ঞতা আরও বাড়বে। এটা ঠিক আইপিএলের কারণে অনেক খেলোয়াড়ের সামনেই আন্তর্জাতিক দলের দরজা খুলে যায়। তবে, তার সঙ্গে এটাও বলা যায় এই মুহূর্তে আইপিএলের মূল লক্ষ্য কিন্তু টাকা রোজগার করা। স্থানীয় খেলোয়াড়রা দল পেলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাঠের বাইরে বসে থাকতে হয় তাঁদের। নূন্যতম মূল্যে দল পান তাঁরা। শুধু তাই নয়, স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউটের নাম করে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে টাকা রোজগার করাও আইপিএলের দীর্ঘদিনের এক পরিকল্পনা।

ম্যাচের পরের পার্টি নিয়ে বিতর্ক –

আইপিএল-এর নাইট পার্টি বা আফটার ম্যাচ পার্টি নিয়ে একাধিক বিতর্ক সামনে এসেছে বহুবার। শোনা যায়, এই পার্টিগুলিতে ঢালাও মদ ও ড্রাগস খুবই সাধারণ বিষয়। সঙ্গে থাকে উদ্দাম যৌনতা। এই পার্টিগুলির আপত্তিকর অনেক ছবিই সামনে এসেছে বহুবার। ২০১২ সালে পুনে ওয়ারিয়র্স (Pune Warriors India) -এর দুই খেলোয়াড় ওয়েন পারনেল ও রাহুল শর্মা ড্রাগস নেওয়ার অভিযোগে গ্রেফতার হন।  রাহুল দাবি করেন তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি ড্রাগস নিয়েছেন এমন রিপোর্ট এলে তিনি ক্রিকেট খেলাই ছেড়ে দেবেন। যদিও রাহুল শর্মার ড্রাগস রিপোর্ট কিন্তু পজিটিভই আসে।

ম্যাচ গড়াপেটা –

আইপিএলে (IPL) ম্যাচ গড়াপেটার একাধিক অভিযোগ উঠে এসেছে বারবার। ২০১৩ সালে চেন্নাই সুপার কিংস এবং রাজস্থান রয়্যালসকে (Rajasthan Royals) গড়াপেটার দায়ে আইপিএল থেকে দু’বছরের জন্য নির্বাসিতও করা হয়। রাজস্থান রয়্যালসের তিন ক্রিকেটার শ্রীসান্থ, অজিত চান্দেলা এবং অঙ্কিত চবন-কে স্পট ফিক্সিং-এর অপরাধে সব ধরনের  ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত করে বিসিসিআই। চেন্নাই দলের অধিকর্তা মাইয়াপ্পা গুরুনাথকেও বহিষ্কার করা হয় আইপিএল থেকে। এরপর আর বড়ো কোনও ম্যাচ ফিক্সিং-এর অভিযোগ না উঠলেও, আইপিএলে ম্যাচ ফিক্সিং হয় না একথা জোর দিয়ে বলা যায় না।

টস ফিক্সিং –

ম্যাচ ফিক্সিং-এর পাশাপাশি টস ফিক্সিং-এও নাম জড়িয়েছে আইপিএলের। কলকাতা নাইট রাইডার্স (KKR) বিরুদ্ধে পাঞ্জাব কিংসের এক ম্যাচে টস ফিক্সড হয়েছে বলে অভিযোগ হঠে।। যদিও এই ঘটনার উপযুক্ত কোনও তথ্য প্রমান বিসিসিআই -এর কাছে নেই।

অতিরিক্ত পারিশ্রমিক-

ম্যাচ গড়াপেটা ছাড়াও আরও এক ভয়ঙ্কর অভিযোগ ওঠে আইপিএলের (IPL) বিরুদ্ধে। নিলামে যে মূল্য ওঠে তার থেকে নাকি বেআইনি ভাবে খেলোয়াড়দের অনেক বেশি টাকা দেওয়া হয়। এই বিষয়ে প্রথম মুখ খোলেন মোহনীশ মিশ্র। ‘অপারেশন আইপিএল’ নামে এক স্ট্রিং অপারেশনে বেশি টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন তিনি।

মানি লন্ডারিং –

মনে পড়ে আইপিএলের মাস্টার মাইন্ডকে? কার হাতে সৃষ্টি এই আইপিএল-এর? তাঁকে ভুলে গেছেন অনেকেই। তাঁর নাম লোলিত মোদি। হ্যাঁ সেই ললিত মোদি যাকে আইপিএল থেকে টাকা তছরুপের অভিযোগে বহিষ্কার করা হয়।জানেন কী করেছিলেন তিনি? আসুন জেনে নেয়া যাক ললিত মোদির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। আমেরিকাতে পড়াশুনো করার সময় সেখানকার স্পোর্টস কালচার দেখে তাঁর মাথায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পরিকল্পনা আসে। কিছু সময় পর তিনি বিসিসিআই-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এবং ২০০৮ সালে আইপিএল লঞ্চ করেন। কিন্তু তাঁর অপরাধ ছিল সময়ে সময়ে তিনি এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেন যা ভারতীয় ক্রীকেট বোর্ডের নীতিবিরুদ্ধ ছিল। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন দলের অংশিদারি তিনি কিনে রাখেন নিজের পরিবারের সদস্যদের নামে। অবশেষে বিসিসিআই-এর টনক নড়ে। শুরু হয় তদন্ত। অবস্থা বেগতিক দেখে লণ্ডন পালান ললিত মোদি।  সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি করেছিলেন ললিত মোদি।

বেটিং অ্যাপস –

কোনও এক অপরিচিত ব্যক্তি মেট্রোতে উঠে নাচছেন। তাঁকে দেখে রিষভ পান্থ বলছেন, ‘ইয়ে ম্যায় কর লেতা হুঁ, আপ ড্রিম ইলেভেন পে টিম বানাও।’ মনে পড়ছে এই বিজ্ঞাপনটির কথা। আপনি যদি আইপিএলের (IPL) একটিও ম্যাচ দেখে থাকেন, তাহলে এই বিজ্ঞাপনটি নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়বে। সমস্ত আইপিএল তারকারা মিলে ড্রিম ইলেভেন, মাই টিম ইলেভেন, এম পি এল-এর মতো অ্যাপসগুলোর প্রচার করছেন চুটিয়ে। কিন্তু জানেন কি এগুলো কিসের অ্যাপস? এগুলি প্রত্যেকটিই হলো এক-একটি ফ্যান্টাসি ক্রিকেট অ্যাপস। আইপিএলের দৌলতে এখন খুবই জনপ্রিয় এগুলি। আপনার আমার মাধ্যমে এই অ্যাপসগুলি  থেকে কোটি কোটি টাকা রোজগার করছে এই অ্যাপস মালিকরা। কিন্তু অনেক মানুষ এই অ্যাপসগুলি টাকা লাগিয়ে সর্বশান্ত হয়ে গেছে।

স্বজনপোষণ –

আইপিএল সৃষ্টির সময় বলা হয় স্থানীয় খেলোয়াড়দের অনেক বেশি সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে কি তা হয়? কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি, আশা করি ছবিটা পরিষ্কার হবে। আশুতোষ আমনকে চেনেন? উত্তর না হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিহারের এক অখ্যাত বোলার। অখ্যাত হলেও তাঁর বোলিং রেকর্ড মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মত। বিষেণ সিং বেদির একটা রঞ্জি মরশুমে ৬৮ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড ভেঙেছেন আশুতোষ। ২০২১ সালের সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে ৬ ম্যাচে ১৬ উইকেট তাঁর দখলে। তারপরেও আইপিএলে কোনও দল পাওয়া তো দূরের কথা, নিলামের জন্য যে ২৯২ জন খেলোয়াড়ের নাম বিসিসিআই নথিভুক্ত করেছিল তাতে নামই নেই আশুতোষের।

আর এক জন ক্রিকেটারের নাম করা যাক। মেঘালয়ের ক্রিকেটার পুনিত বিস্ত। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে প্রায় ৫০০০ রান থাকলেও আইপিএলের নিলামের দরজা কিন্তু বন্ধই।

শুধুই কি তাই, কলকাতা নাইট রাইডার্সে কি বাঙালি খেলোয়াড়দের সঙ্গে বঞ্চনা করা হয় না? মনোজ তিওয়ারি, ঋদ্ধিমান সাহা, শ্রীবৎস গোস্বামী, ঈশান পোড়েলের মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা সুযোগ পায় না তাঁদের ঘরের টিমেও। তবুও কি বলা যায় যে আইপিএলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের আগে সুযোগ দেওয়া হবে?

আইপিএল যতই মানুষকে আনন্দ দিক, যতই নতুন খেলোয়াড়দের সামনে আন্তর্জাতিক দলের দরজা খুলে দিক, এর কালো দিকগুলি কখনোই অস্বীকার করা যায়। আইপিএলের কারনেই শেষ হয়ে গেছে বহু উঠতি ক্রিকেটারের জীবন। অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড়কেও অধিকাংশ সময় বসে থাকতে হয় রিজার্ভ বেঞ্চে। এছাড়া অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞই মনে করেন আইপিএলের রমরমার জন্য নতুন ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলতে অনীহা দেখাচ্ছেন। যার প্রভাব কিন্তু আমরা হামেশাই দেখতে পাচ্ছি। যেহেতু জনপ্রিয় এই ক্রিকেট লিগের সঙ্গে ‘ইন্ডিয়ান’ নামটি জড়িয়ে আছে, সেহেতু এই লীগের আরও একটু স্বচ্ছ হওয়া দরকার বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকমহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published.