অবশেষে স্বস্তি! চাকরি পেলেন ‘ শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ বিজ্ঞাপন খ্যাত কবির

Home বিদেশ-বিভূঁই অবশেষে স্বস্তি! চাকরি পেলেন ‘ শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ বিজ্ঞাপন খ্যাত কবির
অবশেষে স্বস্তি! চাকরি পেলেন ‘ শুধুমাত্র দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে পড়াতে চাই’ বিজ্ঞাপন খ্যাত কবির

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: কয়েকদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে ভাইরাল হয়েছিল বগুড়ার মোঃ আলমগীর কবিরের নাম। গৃহশিক্ষকতার জন্য বগুড়া ও তার আশেপাশে বিভিন্ন দেওয়ালে, ইলেকট্রিক খুঁটিতে সাদা এ-ফোর সাইজের কালো কালিতে ছাপা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। তবে বিজ্ঞাপনের বয়ানটি ছিল অভিনব। তাতে লেখা ছিল, প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের গণিত বাদে সকল বিষয়ই পড়াবেন তিনি, তবে অর্থের বিনিময়ে নয়। সকাল ও দুপুর দু’বেলা ভাতের বিনিময়ে গৃহশিক্ষকতা করবেন তিনি।

তাঁর এই বিজ্ঞাপন দেখে অবাক হয়েছিলেন অনেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপনটি ভাইরাল হতেই একের পর এক ফোন আসতে থাকে তাঁর কাছে। অবশেষে স্থানীয় পুলিসের উদ্যোগে একটি বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান চাকরি দিয়েছে আলমগীরকে। বগুড়ার পুলিস কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, স্নাতকোত্তর পাস করেও চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকেই এই ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন আলমগীর। তাঁরা আলমগীরের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। আলমগীরের কোনও অপরাধ করার রেকর্ডও নেই। সেই কারণেই পুলিসের তরফ থেকেই তাঁকে চাকরি দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

জানা গিয়েছে, আলমগীরকে থানায় ডেকে বগুড়ার পুলিস কর্মকর্তারা এদিন সকাল দশটা থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। পরে বগুড়া জেলার পুলিস সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, তাঁরা আলমগীরের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন স্নাতকোত্তর পাস করার পরও সম্মানজনক কোনও চাকরি না পাওয়ার হতাশা এবং দু’বেলা পেট ভরে খেতে না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকেই এই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন আলমগীর কবির। এই বিজ্ঞাপন দেওয়ার পিছনে কোনও প্ররোচনা কিংবা ইন্ধন কাজ করেছে কি না, তাও পুলিস কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসা করেন আলমগীরকে। তবে তাঁর থেকে সন্তোষজনক উত্তরই পেয়েছেন পুলিসকর্তারা। বগুড়া পুলিসের তরফ থেকে তাঁর অতীত কর্মকাণ্ডও খতিয়ে দেখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে আলমগীরের কোনওরকম অপরাধের নজির পাওয়া যায়নি। এই বিষয়টি দেখার পরই বগুড়া পুলিসের তরফ থেকে তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করা হয়। ‘আমরা মনে করেছি সম্মানজনক একটা চাকরি পেলে তাঁর এই হতাশা এবং মানসিক অবসাদ দূর হবে’, বলেছেন বগুড়ার পুলিস সুপার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।

বগুড়া পুলিস জানিয়েছে, এসিআই শিল্প প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা এদিন বগুড়ায় ছিলেন। তিনি একটি ব্যক্তিগত কাজে বগুড়া থানায় এসেছিলেন। সেইসময়ই পুলিস সুপার তাঁকে আলমগীরের বিষয়ে জানিয়েছিলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই থানার মধ্যেই আলমগীরের যোগ্যতা যাচাইতের জন্য একটি পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। এদিন বিকেলেই পরীক্ষা দেন আলমগীর এবং সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষার ফলপ্রকাশের পরই আলমগীরের হাতে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। তাঁকে ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। এমতাবস্থায় নিজেদের অন্নসংস্থানের জন্য বিভিন্নরকম কাজে ঢুকতে হচ্ছে বাংলাদেশের যুবক-যুবতীদের। শিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতীদের কাছে এই সময়ে গৃহশিক্ষকতাই উপার্জনের একমাত্র উপায়। কিন্তু গত দু’বছর ধরে করোনাভাইরাসের বাড়বাড়ন্তের কারণে সেই পেশাতেও এখন ভাঁটার টান। কোভিডের প্রকোপে স্কুল-কলেজ দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে যেখানে পড়াশোনা বিষয়টিই অবহেলিত, সেখানে টিউশান বিষয়টিই বিলাসিতা বলে মনে করছেন অনেক অভিভাবক-অভিভাবিকা। তাছাড়া লকডাউনের জেরে সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের আয় কমেছে, সেই কারণে সন্তানদের জন্য বেতন দিয়ে গৃহশিক্ষক-গৃহশিক্ষিকা রাখতে পারছেন না অনেকেই। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম ইতিমধ্যেই ২০২২ সালে প্রকাশিত তাদের গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্টে বলেছে, এই বছর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো কর্মসংস্থান ও জীবিকার সংকট। যদিও বাংলাদেশে এই মুহূর্তে কর্মহীন বেকার যুবক-যুবতীর সংখ্যা কত, সেই পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই।

প্রসঙ্গত, জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম আলমগীরের। তাঁর বাবার নাম মোঃ কফিলউদ্দিন এবং মায়ের নাম আম্বিয়া বেগম। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট তিনি। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। তাঁর বড় ভাই রুহুল আমিন শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী। স্নাতকোত্তর পাস করেছেন ২০২০ সালে। এরপর থেকে হন্যে হয়ে চাকরির জন্য ঘুরলেও এখনও পর্যন্ত প্রত্যাশামাফিক চাকরি জোটেনি তাঁর। বাধ্য হয়েই পেট ভরানোর জন্য এই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। কয়েকদিন আগে পর্যন্ত থাকার জায়গাও ছিল না তাঁর। ঢাকায় একটি মেসে কোনওরকমে থাকলেও টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। সেই সময় চাকরির কোচিং করাতেন তিনি। তাঁর এক ছাত্রীর বাবা তাঁদের বাড়িতে আলমগীরের থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। সেখানেই এখন থাকেন তিনি। মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা হলেও এখনও দু’বেলা অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা হয়নি তাঁর। সেই কারণেই এই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন তিনি। যদিও বর্তমানে বেকারত্ব ঘুচেছে আলমগীরের। যদিও চাকরি পাওয়ার পর আলমগীর কবিরের তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.