চাকরিতে ইস্তফা, পৈতৃক জমি বিক্রয়! দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়ে অন্যদের ভাগ্য আগলাচ্ছেন যাঁরা

Home অ‘‌সাধারণ’ চাকরিতে ইস্তফা, পৈতৃক জমি বিক্রয়! দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়ে অন্যদের ভাগ্য আগলাচ্ছেন যাঁরা
চাকরিতে ইস্তফা, পৈতৃক জমি বিক্রয়! দুর্ঘটনায় প্রিয়জনকে হারিয়ে অন্যদের ভাগ্য আগলাচ্ছেন যাঁরা

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: ক্রুসেডর। বাংলায় এই শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘ধর্মযোদ্ধা’। আমাদের এই দেশেই রয়েছেন এমন কয়েকজন ‘ধর্মযোদ্ধা’, যাঁরা সাধারণ মুখের ভিড়ের মধ্যে মিশে থাকলেও হয়ে উঠেছেন অসাধারণ। জীবন বাঁচানোর ব্রত নিয়ে ধর্মযুদ্ধে নেমেছেন এঁরা সকলে। যার জন্য কেউ ছেড়েছেন লোভনীয় মাইনের চাকরি আবার কেউ বা জয় করেছেন নিজের শারীরিক অক্ষমতাকে। বেপরোয়া গতি যাতে কোনও প্রাণ কাড়তে না পারে তার জন্য নিরলস লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বিহারের রাঘবেন্দ্র কুমার, পঞ্জাবের হরমন সিং সিধু আর দীপক শর্মা বা মধ্যপ্রদেশের রঞ্জিত সিং। পথ দুর্ঘটনায় একেকটি মৃত্যু বা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা এঁদের সকলকে বাধ্য করেছে এক মহান কর্মযজ্ঞে সামিল হতে।

বিহারের মধুবনির বাসিন্দা রাঘবেন্দ্র কুমার পরিচিত ‘হেলমেট ম্যান অফ ইন্ডিয়া’ নামে। কিন্তু এই বিশেষ পরিচিতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক দীর্ঘ কাহিনি। রাঘবেন্দ্র নিজের পৈতৃক জমি বিক্রির টাকা থেকে, এ পর্যন্ত ৫০ হাজার হেলমেট বিনা পয়সায় বিতরণ করেছেন, হেলমেটবিহীন দু-চাকা যানের আরোহীদের মধ্যে। কেন এ ধরনের ব্যতিক্রমী ভাবনা?

‘২০১৪ সালের এক পথ দুর্ঘটনায় প্রিয় বন্ধু কৃষ্ণকে হারাই। সেদিন ও হেলমেট  ছাড়াই গ্রেটার নয়ডা এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে বাইক চালিয়ে আসছিল। তারপর একটা মুহূর্তেই সব শেষ!’ কৃষ্ণর মর্মান্তিক মৃত্যুর পরই রাঘবেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, আর কাউকে জীবনের ঝুঁকি নিতে দেবেন না। শুধুমাত্র যথাযথ নিরাপত্তা না নেওয়ায়, বন্ধুর মতো অকালে আর কারও যেন মৃত্যু না হয়!

রাঘবেন্দ্র বলতে থাকেন, ‘সত্যিই সেদিনের আগে পর্যন্ত হেলমেট পরা নিয়ে আমার কোনও হেলদোল ছিল না এবং আমি নিশ্চিত এ ব্যাপারে অনেকেই একইরকম উদাসীন। কিন্তু সকলেরই একদিন চোখ খোলে যেদিন হঠাৎ করে কোনও প্রিয়জন পথের বলি হন। সেদিনই ঠিক করি হেলমেটের উপকারিতা নিয়ে সচেতনতা কর্মসূচি শুরু করব। যাতে অন্তত কিছু মানুষকে এই নির্মম বাস্তব সম্পর্কে সতর্ক করতে পারি। ঠিক যেভাবে আমি নিজের জীবনের এক মস্ত শিক্ষা পেয়েছি।’

রাঘবেন্দ্রর সেই সচেতনতা কর্মসূচি ক্রমশ এক আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। ৫০ হাজার হেলমেট বিতরণ করে মধুবনির রাঘবেন্দ্র কুমার আজ ‘ভারতের হেলমেট ম্যান’। তবে এই বিশাল খরচ সামলানো তো মুখে কথা নয়! কীভাবে হল এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগাড় ? রাঘবেন্দ্র জানালেন, ‘প্রথমবার হেলমেট কিনতে আমি পরিবারের কিছু গয়না বিক্রি করি। কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। এরপর টিক করে ফেলি, সব পৈতৃক জমি বেচে দেব।’ এরপর লক্ষ্যপূরণের দিকে এগিয়ে যেতে অর্থ বাধা না হলেও, আমজনতার মানিসকতা, রাঘবেন্দ্রর লড়াইয়ের পথে বড় বাধা।

রাঘবেন্দ্রর মতোই রয়েছেন আরও কয়েকজন। যাঁরা ব্যক্তিগত জীবনের মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন সমাজের আর পাঁচজনকে সুরক্ষিত রাখতে। তাঁদেরই একজন চণ্ডীগড়ের হরমন সিং সিধু এবং ফিরোজপুরের দীপক শর্মা।

আজ থেকে পাঁচবছর আগে এক মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় হারিয়েছিলেন পুত্র মায়াঙ্ককে। ১৬ বছরের তরতাজা একটি কিশোরের তো এভাবে চলে যাওয়ার কথা ছিলনা! সেই দুঃসহ স্মৃতির বোঝা বয়ে বেড়ানো দীপক শর্মা আজও আক্ষেপ করে ওঠেন, ‘সেদিন আমার ওকে আটকানো উচিত ছিল।’ ছেলের মৃতদেহ ছুঁয়েই দীপক ঠিক করে ফেলেন এবার অধ্যাপনা ছেড়ে অন্য একটা কাজে ঝাঁপাতে হবে। তাঁর মতো আর কারও কোল যাতে খালি না হয়, তার জন্য তিনি বাবা-মায়েদের সতর্ক  করবেন, যাতে নির্দিষ্ট বয়সের আগে যেন কোনওভাবেই তাঁদের সন্তানদের গাড়ি-বাইক চালানোর অনুমতি না দেন। দীপক শর্মা নিজের দুঃস্বপ্নের স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকেন, ‘আমার ওকে আটকানো উচিত ছিল এবং সারাজীবন এই আক্ষেপ আমাকে তাড়া করবে। তখন থেকে আমি বাবা-মায়েদের জন্য সচেতনতা প্রচার শুরু করি। যাতে কোনওদিন তাঁদের হাত কামড়াতে না হয়, কেন সময়মতো ছেলেকে আটকাননি বা সন্তানকে বলতে পারেননি যে বয়সের আগেই লাইসেন্স ছাড়া স্টিয়ারিং ধরা উচিত নয়।’

আসা যাক চণ্ডীগড়ের হরমন সিং সিধুর কথায়। ১৯৯৬ সালের একটি দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে এই মানুষটার চলাফেরার শক্তি। প্রায় ৫০ফুট নিচে পড়ে গিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান বটে কিন্তু ঘাড়ের নিচ থেকে নড়াচড়ার সমস্ত শক্তি হারিয়ে ফেলেন। হুইল চেয়ার এখন তাঁর নিত্যসঙ্গী।

এরপর পথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি পঞ্জাব-হরিয়ানা হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা রুজু করেন। যে মামলার প্রথম আবেদন ছিল, সমস্ত জাতীয় ও রাজ্য সড়কের  পাশে মদ বিক্রি বন্ধ হোক। কারণ এই দোকানগুলোই একাধিক দুর্ঘটনার পরোক্ষ কারণ। মদ্যপ অবস্থায় ড্রাইভিং সিটে বসাই প্রচুর প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ। দীর্ঘদিন আইনি লড়াই ও পথে প্রচারের পর অবশেষে সিধুর জয় আসে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ঝাঁপ বন্ধ হাইওয়ের ধারে থাকা সব মদের দোকানের।

তবে এখানে আরও একজনের কথা না বললেই নয়। তিনি ইন্দোরের রঞ্জিত সিং। পেশায় ট্র্যাফিক পুলিস কনস্টেবল। তাঁকে ইন্দোরবাসী একডাকে চেনেন কারণ ট্র্যাফিক নিয়ন্ত্রণে তাঁর অসাধারণ ভঙ্গি। ১৭ বছর ধরে ডিউটির সময় কিংবদন্তী পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসনের মতো মুন ওয়াক করে চলেছেন রঞ্জিত, যার শুরু হয়েছিল একটি দুর্ঘটনা দিয়েই।

‘ আমি তখন ডিউটিতে ছিলাম। হঠাৎই মেসেজে একটি দুর্ঘটনার খবর এল। স্পটে গিয়ে ভিড় সরিয়ে দেখি চারদিকে রক্তের বন্যা বইছে, আর তার মাঝে পড়ে রয়েছে আমার বন্ধুর নিথর দেহ। সেদিনই ভেবে নিই মানুষ যাতে পথ সুরক্ষা বিধি মেনে চলে, ট্র্যাফিক লাইটের তোয়াক্কা না করে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে সে সব নিশ্চিত করতে হবে। তাই চালকদের নজর কাড়তে মুন ওয়াক শুরু করি। অবাক লাগলেও এটা অনেক কাজে এসেছে। সবাই কিছুটা হলেও বুঝছেন এই তাগিদ তাঁদের স্বার্থেই।’

রঞ্জিত তাঁর এই কাজের জন্য শুধু পুলিস মহলেরই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে সুখ্যাতি আদায় করেছেন। এখন কোথাও অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণের দরকার হলেই ডাক পড়ে রঞ্জিতের। যেখানে ম্যাজিকের মতো কাজ দেয় তাঁর মুন ওয়াক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.