‘আপনি ছোট দোকানদার আর কৃষকদের শুভাকাঙ্ক্ষী নন!’ মোদিকে দায়ী করে লাইভে আত্মহত্যার চেষ্টা বিজেপি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর!

Home দেশের মাটি ‘আপনি ছোট দোকানদার আর কৃষকদের শুভাকাঙ্ক্ষী নন!’ মোদিকে দায়ী করে লাইভে আত্মহত্যার চেষ্টা বিজেপি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর!
‘আপনি ছোট দোকানদার আর কৃষকদের শুভাকাঙ্ক্ষী নন!’ মোদিকে দায়ী করে লাইভে আত্মহত্যার চেষ্টা বিজেপি ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীর!

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: আনখশির দেনায় ডুবে গেছেন তিনি। এই জর্জরিত অবস্থা থেকে মুক্তির আর কোনও উপায় নেই। অগত্যা আত্মহত্যারই সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু বন্ধ ঘরে, সকলের অজান্তে নয়। একেবারে ফেসবুক লাইভে এসে বিষ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা উত্তরপ্রদেশের ছোট ব্যবসায়ী, জুতোর কারবারি রাজীব তোমরের। বাগপতে একটা ছোট দোকান রয়েছে তাঁর। বিষ খেলেন তাঁর স্ত্রীও। তাঁকে বাঁচানো যায়নি। রাজীব এখন জীবন-মৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে। উত্তরপ্রদেশে ভোটের ঠিক আগে বাগপতের এই ঘটনা রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। আর এই পরিণতির জন্য নরেন্দ্র মোদিকেই দায়ী করেছেন তোমর।

নিজের দোকানে বসে রাজীবের ফেসবুক লাইভের এই ক্লিপটি দারুন ভাইরাল হয়। ফেসবুক লাইভে এসে প্রথম কয়েকমিনিট নিজেকে রহস্যে মুড়ে রাখেন ৪২ বছরের রাজীব। হিন্দিতে নিজের স্ত্রীকে বলেন, ‘সরকার যদি আমার কথা না শোনে, তুমি তো অন্তত শুনতে পারতে!’ এরপর মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর অভিব্যক্তি একেবারে বদলে যায়। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, রাজীব একটি প্যাকেট কেটে তার ভিতরের জিনিস মুখে ঢেলে দিলেন। তাঁর স্ত্রী এসে আটকানোর চেষ্টা করেন। এমনকী তাঁকে মুখ থেকে ওই জিনিস ফেলে দিতেও বলেন। লাভ হয়নি। রাজীবের স্ত্রী পুনমও সেই একই জিনিস খান।

এরপরই রাজীব বলেন, ‘মনে হয়, আমার কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। মরে গেলেও, যত দেনা আছে আমি সব মিটিয়ে দেব। আমি অনুরোধ করছি, দয়া করে এই ভিডিওটি যতটা পারবেন শেয়ার করুন। আমি দেশবিরোধী নই। এই দেশকে ভালবাসি।’ এরপর হিন্দিতে বলে ওঠেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবে মোদি।‌’ এই ঠান্ডায়ও ঘামতে থাকা রাজীব বলে চলেন, ‘কিন্তু আমি মোদিজিকে একটা কথা বলতে চাই যে, আপনি ছোট দোকানদার আর কৃষকদের শুভাকাঙ্ক্ষী নন। আপনার নীতি বদল করুন।‌’  জিএসটিকে দায়ী করে, রাজীবের অভিযোগ, এই নীতির কারণেই তাঁর ব্যবসা বিপুল লোকসানের মুখে পড়েছে।

ভিডিওটি যাঁরা দেখেছিলেন তাঁরাই পুলিসে খবর দেন। পুলিস গিয়ে রাজীব এবং তাঁর স্ত্রীকে উদ্ধার করে। দম্পতিকে বারাউতের মেডিসিটি হাসপাতালে ভরতি করা হলেও পুনমকে বাঁচানো যায়নি। রাজীব আইসিইউ-তে।তাঁদের ১৪ এবং ১২ বছরের দু’টি পুত্রসন্তান রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার তিক্ততা তাঁর গলা থেকে ঝরে পড়ে বলে জানান এলাকারই এক ব্যবসায়ী। রাজীবের দোকানের পাশেই রয়েছে তাঁরও দোকান। তিনিই রাজীবকে বলতে শোনেন, ‘এখানে আর কিছু বাকি নেই, সব শেষ হয়ে গেছে। সবাই শুধু বড় বড় ভাষণ দিয়েই খালাস। কারও ভালো হবে না।’

প্রকাশ্যে এইভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা বাকরোধ করার মতোই ঘটনা বটে। কিন্তু রাজীব তোমরের এই প্রবণতার একটা নিম্নাভিমুখ সমাজের জন্য একটা অশনি সঙ্কেত, যা এড়ানো যায় না।

জানা যাচ্ছে, গত ৭ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে আরও একটি ভিডিও পোস্ট করে নিজের দুর্দশার কথা সকলকে জানাতে চেয়েছিলেন তোমর। বলেছিলেন কয়েকমাস যাবৎ তাঁর ব্যবসা একেবারে মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভিডিওতে তিনি বলেন, ‘এরা ক্ষুদ্রচাষি, ছোট দোকানদার আর ব্যবসায়ীদের কথা মনে রাখেনি। তাদের দুরাবস্থাও আজকাল ভোটের কোনও ইস্যুও হয় না। আমি সর্বস্বান্ত হয়ে মুখ খুলতে বাধ্য হচ্ছি।’

ভিডিও পোস্টেই তোমর দাবি করেন, ‘লকডাউনের সময় দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ থাকার দরুন দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকার জুতো নষ্ট হয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন যে নামমাত্র বেচাকেনাও হচ্ছে না, তবুও জিএসটি-তে ছাড় নেই। অ্যাকাউন্ট্যান্ট আমাকে শুনিয়ে দেন, জিএসটি ফাইল করতেই হবে, নইলে উপরমহলের তদন্তের হাত থেকে নিস্তার নেই।’

এ পর্যন্ত ছিল তিক্ত প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। কিন্তু তখনই শুনে চমকে যেতে হয়, যে মানুষটা এইভাবে মোদি সরকারের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন, তিনিই কিন্তু এতদিন ছিলেন কট্টর বিজেপি সমর্থক।

রাজীব তোমরের ফেসবুক পেজ দেখাচ্ছে, ২০১৩ সালে বিজেপির সদস্য হন তিনি। বাগপতের কাসিমপুর খেরির এই ব্যবসায়ীর সঙ্গে একই ফ্রেমে রাজ্যের বিজেপি নেতাদের ছবিও জ্বলজ্বল করছে এই পেজেই। যার মধ্যে বেশিরভাগই বাগপতের সাংসদ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সত্যপাল সিংয়ের সঙ্গে। এমনকী ২০১৬ সালে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি হিসেবে দ্বিতীয়বার অমিত শাহের মনোনয়নে, শুভেচ্ছা জানিয়ে হোর্ডিং তৈরি করান রাজীব, যেখানে তাঁরও ছবি ছিল। তোমরের টাইমলাইন ঘাঁটলে দেখা যায়, মাঝে মাঝে দলের নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেও, সেখানে আনুগত্যের কোনও অভাব ছিল না।

তবে হঠাৎ কী কারণ ঘটতে পারে? কাসিমপুর খেরির বাসিন্দা পেশায় কৃষিজীবী, উদয়বীর সিংয়ের কথায়, ‘ওনার যথেষ্ট রাজনৈতিক প্রভাব ছিল। এই এলাকাও হাতের তালুর মতো চিনতেন। গুজরাটের বরোদার এমএস ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ই বিজেপির সংস্পর্শে আসেন। আমরা বুঝতেই পারিনি দলের বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তিনি এতটা বিরূপ ছিলেন। কারণ ভোটের আগে সব রাজনৈতিক বিতর্কেই বিজেপির হয়েই গলা ফাটিয়েছিলেন তিনি।’

তবে তাঁর পরিবারের দাবি জিএসটি এবং লকডাউনের পর ছোট ব্যবসায়ীদের যা হাল হয়েছে, তা নিয়ে ক্ষোভ পুষে রেখেছিলেন। তোমরের কাকা বিজয়পাল সিংয়ের কথায়, ‘আমরা জানতাম জিএসটি নিয়ে একটা সমস্যা চলছিল। তা ছাড়া ব্যবসা পত্তরের অবস্থাও ভালো নয়। অন্য কোনও উপায়ে রোজগারের ব্যবস্থা করছিল। বরাবরই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিল। কিন্তু ইদানীং দেখতাম বিজেপির কথা ও কাজের মধ্যে এত ফারাক ওকে কষ্ট দিত।’

বিজয়পালের কাছ থেকেই জানা গেল, রাজীবের ঘটনার পর বেজায় অস্বস্তিতে পড়ে ঘটনাটা এড়িয়ে যেতে চাইছে বিজেপি। অন্য দলের স্থানীয় নেতারা এলেও, বিজেপির কোনও নেতার দেখা বা বার্তাও মেলেনি। সাংসদ সত্যপাল সিং-কে ফোন করা হলে, তাঁর আপ্ত সহায়ক জানিয়ে দেন, ‘যা বলার কাল বলা হবে।’

উল্লেখ্য প্রথম জীবনে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তোমর। ২০১২ সালে ব্যবসায় হাতেখড়ি। প্রধানমন্ত্রীর মেক ইন ইন্ডিয়া স্লোগানে উদ্বুদ্ধ হয়ে, ২০১৯ সালে জুতোর শোরুম খুলে আর পাঁচজনকে রোজগারের পথ দেখান। অযোধ্যার রাম জন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণে নিজে যেমন দান করেন তেমনই গতবছর ফেসবুকে অন্যদেরও মন্দির নির্মাণ তহবিলে অর্থ সাহায্যের অনুরোধ করেন।     

সেই তোমরই যখন ই-কমার্সকে ব্রিটিশ জমানার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তুলনা করেন তখন প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। একবার লাইভ ভিডিও-য় তোমার অভিযোগ করেন, ‘আমি যে জুতো ৮০ টাকায় বিক্রি করি, জিও মার্ট সেই জুতোই ৬৫ টাকায় বিক্রি করে। ছোট ব্যবসায়ীরা যাবে কোথায়?’

রাজীবের প্রতিবেশী কৃষিজীবী যোগেন্দর সিংয়ের কথায়, ‘সকলেই তো জীবনে এগোতে চায়, ধারদেনাও করে। একজন বুদ্ধিমান লোক, কোন অবস্থায় গেলে নিজেকে শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয় তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বিনামূল্যে রেশন দিলেই কী সব প্রয়োজন মিটে যায়। লকডাউনের পর থেকে কী কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা যে যাচ্ছি, তা কাকে বলব আর কেই বা শুনবে!’

তবে সবাই যে তোমরের সমব্যথী তেমন নয়। আত্মীয় পরিজনদের অনেকেই বলেছেন, নতুন শোরুমের জন্য ধার নিয়ে শোধ করতে না পেরে সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপানো ঠিক নয়। বিজেপির কৃষক সংগঠনের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ ধরমবীর সিংয়র সাফ কথা, ‘নিজের জালে নিজেই যখন জড়িয়েছে, তখন অযথা সরকারের নিন্দেমন্দ করে লাভ কী! অল্পবয়সীদের জীবনে নানারকম আশা থাকে, যা পূরণ না হলেই হতাশা থেকে এইরকম চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে বসে।’ প্রায় একই সুর রাজীবের অপর প্রতিবেশী স্বরাজ সিংয়ের গলাতেও।

তবে ঘটনা যাই হোক, এসব দেখেশুনে কী চোখ খুলবে দিল্লি অধিপতির? প্রশ্ন তো রয়েই যায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published.