অতিমারীর প্রথম ঢেউয়ের অভিশাপ! আত্মঘাতী ৩ হাজারের বেশি কৃষক ও কর্মচ্যুত

Home দেশের মাটি অতিমারীর প্রথম ঢেউয়ের অভিশাপ! আত্মঘাতী ৩ হাজারের বেশি কৃষক ও কর্মচ্যুত
অতিমারীর প্রথম ঢেউয়ের অভিশাপ! আত্মঘাতী ৩ হাজারের বেশি কৃষক ও কর্মচ্যুত

বঙ্গভূমি লাইভ ডেস্ক: হঠাৎ করেই জীবনটা স্থবির হয়ে গিয়েছিল! লকডাউন। অপরিচিত একটি শব্দ জীবনটাকে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি করে দিয়েছিল। বহু মানুষ কাজ হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছিলেন। আর্থিক কষ্ট, ঘরবন্দি অবস্থায় তীব্র মানসিক অবসাদে বেড়ে যায় গার্হস্থ্য হিংসাও। আচমকা বদলে যাওয়া জীবনের ভার বইতে না পেরে বহু মানুষ বেছে নেন আত্মহত্যার পথ। করোনা অতিমারী এবং লকডাউনের জেরে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা চমকে দেওয়ার মতো। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তথ্য বলছে, ২০২০ সাল, অর্থাৎ করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময়, বেকারত্বের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে, তিন হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মঘাতী হয়েছেন। করোনাকালে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান, অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেল। রাজ্যসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে, ন্যাশানল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর, এই তথ্য তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যনন্দ রাই।

জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে এক বছরে আত্মহত্যার প্রবণতা হু হু করে বেড়েছে। ২০১৯ সালে নিজের হাতে জীবন শেষ করে দিয়েছেন, এমন মানুষের সংখ্যা ছিল ১.৫৩ লক্ষ। ২০১৯ সালে এই পরিসংখ্যান ১.৩৯ লক্ষ। দেউলিয়া হয়ে যাওয়া বা ঋণখেলাপির কারণে ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্য আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৬,০৯১টি। যারমধ্যে ২০১৮ সালে ৪,৯৭০, ২০১৯ সালে ৫,৯০৮ এবং ২০২০ সালে ৫,২১৩ জন আত্মহননের পথ বেছে নেন।

এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট করোনাকালের ভাইরাস ভীতিই একমাত্র কারণ নয়। আত্মহত্যার প্রবণতার পিছনে আরো নানান কারণ রয়েছে। যার প্রথম ও প্রধান কারণ নিদারুন অভাব এবং বেকারত্বের তীব্র যন্ত্রণা থেকে জন্ম নেওয়া অবসাদ। ঘরবন্দি জীবনে এই মানসিক চাপ চরমে ওঠে। খোলামেলা পরিবেশ যে প্রলেপটুকু দিতে পারত, তাও পাওয়া সম্ভব ছিল না। যার প্রভাবে ভেঙে পড়ে মানসিক স্বাস্থ্য। বহু মানুষ অনিদ্রা, অবসাদ, অতিরিক্ত উত্তেজনা আর উদ্বেগের শিকার হন। অনেককে আবার গ্রাস করে প্রবল একাকীত্ব। নিজের উপর চলে আসে বিরক্তি। যার থেকে মুক্তি পেতে আত্মহত্যাই একমাত্র রাস্তা বলে মনে করেছেন অনেকে।

লকডাউনের সময় চাকরি খুইয়ে আত্মঘাতী হওয়ার সংখ্যাই বেশি। বিশেষ করে দিন আনি দিন খাই মানুষজন, অর্থাৎ দিনমজুর ও পরিযায়ী শ্রমিকদের অনেকেই সেই অভিশপ্ত সময়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। পেটের তাগিদে দেশের অন্য বড়  শহরগুলিতে কাজের খোঁজে যাওয়া এই মানুষগুলোকে বাড়ি ফিরে আসতে হয় রাতারাতি, চড়া রোদ মাথায় করে, দিনরাত মাইলের পর মাইল হেঁটে, এ রাজ্য, সে রাজ্য পেরিয়ে নিজের ঘরের দাওয়ায় যখন পৌঁছন তখন অনেকেরই মৃতপ্রায় দশা। আর যারা বাড়ি ফিরতে পারেননি তাদের অবস্থা ছিল আরও করুণ। গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনও কাজও ছিল না তাঁদের হাতে। খালি হাত আর খালি পেটের জ্বালা এদের অনেককেই আত্মহ্ত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে গবেষণা বলছে, শুধু করোনাকালই নয়, ভারতের মানুষের আত্মহত্যার প্রবণতা বরাবরই বেশি। অতিমারীর আগেও কিন্তু আত্মঘাতী মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কেন্দ্রে ক্ষমতার পালাবদল, অর্থাৎ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার আসার পর মানুষের জীবনধারায় যে আমূল পরিবর্তন ঘটেনি, তা আত্মহত্যার ঘটনা থেকেই স্পষ্ট। করোনাকালকে হিসেবের বাইরে রেখে, ২০১৪ থেকে ২০২০ সালকে ধরলে দেখা যাচ্ছে, এই সময়কালে মোট ১৮,৭৭২ জন আত্মহত্যা করেছেন। ৬ বছরের গড় ধরলে সংখ্যাটা দাঁড়ায় ২,৬৮১। বাৎসরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ২,২০৭, ২০১৫ সালে ২,৭২৩, ২০১৬ সালে ২,২৯৮, ২০১৭ সালে ২,৪০৪, ২০১৮ সালে ২,৭৪১ এবং ২০১৯ সালে ২,৮৫১।

বিভিন্ন রাজ্যে আত্মহত্যার নিরিখে সবচেয়ে উপরে রয়েছে কর্নাটক। সংখ্যা ৭২০। এরপর রয়েছে মহারাষ্ট্র। সংখ্যা ৬২৫। তারপর তামিলনাডু। সংখ্যা ৩৩৬। তালিকায় চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে  অসম এবং উত্তরপ্রদেশ। সংখ্যা যথাক্রমে ২৩৪ এবং ২২৭।

অন্যদিকে ফসলের ঠিকঠাক দাম না পাওয়া, অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির জের, সবমিলিয়ে কৃষকদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা বড় কম নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিম ভারতে কৃষকদের আত্মহত্যার প্রবণতা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আর এ ক্ষেত্রে প্রথম নাম করতে হয় মহারাষ্ট্রের। ২০২০ সালে বিদর্ভে সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১,৩৪১ জন কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। এরপর রয়েছে কর্নাটক।সে রাজ্যে কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা ১,০২৫। এরপর তেলঙ্গানায় ৯৪৭, অন্ধ্র প্রদেশে ৭৮২ এবং তামিলনাডুতে ৫২৪।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মুখ থেকে এই পরিসংখ্যানের পর বিজেপি বিরোধীরা  রাজনৈতিক অস্ত্রে শান দিতে শুরু করেছে। তাঁদের অভিযোগ, দেশের এই ভয়াবহ সমস্যার কথা জেনেও সরকারের এব্যাপারে কোনও হুঁশই নেই।এমনকী বাজেটেও এর কোনও প্রতিফলন পড়েনি। তবে সমালোচনা এড়িয়ে সরকারের বক্তব্য, লকডাউন ও করোনাকালের অবসাদ কাটিয়ে আমজনতার মানসিক স্বাস্থ্য ফেরাতে একাধিক প্রকল্প চালু করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, ন্যাশানল মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম। জাতীয় স্তরের এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ডিস্ট্রিক্ট মেন্টাল হেলথ প্রোগ্রাম শীর্ষক জেলাওয়াড়ি কর্মসূচি এবং আরও কয়েকটি। নিত্যানন্দ রাইয়ের কথায়, এই সকল কর্মসূচির আওতায়, আত্মহত্যার প্রবণতা কমানো, কর্মক্ষেত্রে চাপমুক্তির উপায় এবং স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.